টোরি পেনসো থেকে কাতিয়া গার্সিয়া, বিশ্বকাপে আলো ছড়াচ্ছেন নারী রেফারিরা
পুরুষদের বিশ্বকাপে নারীদের উপস্থিতি এবার আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের টোরি পেনসো ও মেক্সিকোর কাতিয়া গার্সিয়ার নেতৃত্বে ছয়জন নারী রেফারি মাঠে দায়িত্ব পালন করছেন। সংখ্যায় তারা এখনও কম হলেও, বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে তাদের অংশগ্রহণ নারীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। কাতার বিশ্বকাপে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।
এবারের বিশ্বকাপে ফিফা মোট ১৭০ জন ম্যাচ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ৫২ জন প্রধান রেফারি, ৮৮ জন সহকারী রেফারি এবং ৩০ জন ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) কর্মকর্তা। এই তালিকায় ছয়জন নারী রয়েছেন। সংখ্যাটি মোট কর্মকর্তার চার শতাংশেরও কম হলেও, পুরুষদের বিশ্বকাপে নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সের স্তেফানি ফ্রাপার্ট প্রথম নারী হিসেবে পুরুষদের বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনা করে ইতিহাস গড়েছিলেন। এবার সেই পথ আরও প্রশস্ত করেছেন ছয় নারী কর্মকর্তা।
টোরি পেনসো
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ৩৯ বছর বয়সী টোরি পেনসো ১৮ জুন চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ পরিচালনা করে পুরুষদের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনাকারী দ্বিতীয় নারী রেফারি হন। ম্যাচজুড়ে তিনি আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ইকুয়েডর ও জার্মানির মধ্যকার আলোচিত ম্যাচেও তিনিই প্রধান রেফারির দায়িত্বে ছিলেন। জার্মানির পক্ষে একটি পেনাল্টি প্রথমে দিলেও পরে ভিএআরের সহায়তায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। ইকুয়েডরের প্রথম গোলের আগে ফাউলের দাবি উঠলেও পুরো ম্যাচ তিনি দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন।
পেনসো ২০২০ সালে দুই দশকেরও বেশি সময় পর প্রথম নারী হিসেবে মেজর লিগ সকার (এমএলএস)-এর ম্যাচ পরিচালনা করেন। ২০২১ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপের ফাইনাল পরিচালনা ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় অর্জন। গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তিনি ইতোমধ্যে ১০০টির বেশি ম্যাচ পরিচালনা করেছেন।
শৈশবে তার মা আঘাতের আশঙ্কায় তাকে ফুটবল খেলতে দিতেন না। কিন্তু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তাকে রেফারিংয়ে নিয়ে আসে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় ও অপেশাদার লিগে রেফারিং শুরু করেন। প্রথমে নিজের গাড়ি কেনার জন্য অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যেই এই কাজ করেছিলেন।
২০১৩ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনে যোগ দেন। নারী ফুটবলের ম্যাচ পরিচালনার মধ্য দিয়ে তার পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু হয়। পরে এমএলএসে সুযোগ পান।
২০০৮ সালে ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ডিজিটাল মার্কেটিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর কোকা-কোলা ও রেড বুলের মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তখনও পেশাদার রেফারি হওয়ার কথা ভাবেননি। তবে ২০১৯ নারী বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের পর তার জীবন বদলে যায়। চাকরি, রেফারিং ও পারিবারিক জীবন একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ায় তিনি পুরোপুরি রেফারিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তার স্বামী ক্রিস পেনসোও একজন রেফারি। তাদের তিনটি মেয়ে রয়েছে।
কাতিয়া গার্সিয়া
মেক্সিকোর ৩৩ বছর বয়সী কাতিয়া গার্সিয়া পুরুষদের বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম লাতিন আমেরিকান নারী এবং ইতিহাসের তৃতীয় নারী রেফারি। নেদারল্যান্ডস ও তিউনিসিয়ার ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি এই কীর্তি গড়েন।
তার ক্যারিয়ারে রয়েছে একের পর এক ইতিহাস। তিনি প্রথম নারী হিসেবে কনকাকাফ গোল্ড কাপে ম্যাচ পরিচালনা করেন। ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম মেক্সিকান নারী রেফারিও তিনি। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি মেক্সিকোর শীর্ষ ফুটবল লিগ লিগা এমএক্সে ম্যাচ পরিচালনাকারী দ্বিতীয় নারী তিনি।
মেক্সিকো সিটিতে জন্ম নেওয়া গার্সিয়া সংগীতশিল্পী পরিবারে বেড়ে ওঠেন। ২০০৪ সালে অপেশাদার ফুটবল খেলতে শুরু করেন। কিন্তু মেক্সিকোতে নারী ফুটবল লিগ ২০১৭ সালে চালু হওয়ায় পেশাদার ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এরপর তিনি রেফারিংকে নিজের ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন।
২০১৫ সালে রেফারিং শুরু করে খুব দ্রুত বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, নারী লিগ, দ্বিতীয় বিভাগ এবং পরে প্রথম বিভাগে উন্নীত হন। ২০১৯ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারির স্বীকৃতি পান।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে গার্সিয়া বলেন, 'ফুটবলে যত এগিয়ে যাই, ততই বুঝতে পারি সমাজ হিসেবে আমাদের আরও অনেক দূর এগোতে হবে এবং পরিবর্তিত হতে হবে।'
নারী রেফারিদের জন্য আরও বড় পরিসর তৈরি করার প্রত্যয়ও জানিয়েছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আমি সেই পথের প্রতিনিধিত্ব করছি, যা আমাদের আগের অনেক নারী রেফারি তৈরি করে দিয়েছেন। আমি চাই, আমার পর যারা আসবে, তাদের জন্য এই পথ আরও প্রশস্ত হোক।'
মাঠের বাইরেও তিনি সমান সফল। মেক্সিকোর ন্যাশনাল অটোনোমাস ইউনিভার্সিটি (ইউএনএএম) থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও জনপ্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এবারের বিশ্বকাপে তিনি চতুর্থ রেফারির দায়িত্বও পালন করেছেন।
সান্দ্রা রামিরেজ
মেক্সিকোর ৩৭ বছর বয়সী সান্দ্রা রামিরেজ নেদারল্যান্ডস ও তিউনিসিয়ার ম্যাচে কাতিয়া গার্সিয়ার প্রথম সহকারী রেফারি ছিলেন। ২০১০ সালে পেশাদার রেফারিং শুরু করেন। ২০১৯ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক লাইসেন্স পান। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতা, মেক্সিকোর দ্বিতীয় বিভাগ, লিগা এমএক্স এবং নারী বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।
ব্রুক মেয়ো
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ বছর বয়সী সহকারী রেফারি ব্রুক মেয়ো ২০১৮ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক লাইসেন্স পান। চেক প্রজাতন্ত্র-দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইকুয়েডর-জার্মানি ম্যাচে তিনি টোরি পেনসোর সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
এমএলএস, ক্লাব বিশ্বকাপ, ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক এবং ২০২৩ নারী বিশ্বকাপেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেরা নারী রেফারির পুরস্কারও জিতেছেন।
ক্যাথরিন নেসবিট
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮ বছর বয়সী ক্যাথরিন নেসবিট ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে চেক প্রজাতন্ত্র ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে তিনি সহকারী রেফারির দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সালে ফিফার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই তিনি ভিএআরে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। ২০২৬ বিশ্বকাপ তার দ্বিতীয় পুরুষদের বিশ্বকাপ। এর আগে কাতার ২০২২ বিশ্বকাপেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তাতিয়ানা গুজমান
নিকারাগুয়ার ৩৮ বছর বয়সী তাতিয়ানা গুজমান নিজের দেশের প্রথম বিভাগে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম নারী রেফারি। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপে ভিএআর কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি প্রথম নিকারাগুইয়ান নারী হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে তিনি প্রথমবারের মতো পুরুষদের বিশ্বকাপে সহকারী ভিএআর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। রেফারি হওয়ার আগে তিনি ফুটবল খেলতেন। বর্তমানে মধ্য আমেরিকার অন্যতম পরিচিত নারী রেফারি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।