২৪ জুন ২০২৬, ১৬:২৭

সাবঅল্টার্নদের পছন্দ রোনালদো, এলিটদের মেসি

লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো  © সংগৃহীত

মেসি বনাম রোনালদো—ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও অন্তহীন এই দ্বৈরথ কি শুধুই মাঠের পারফরম্যান্সের হিসাব-নিকাশ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানুষের অবচেতন মনের রাজনৈতিক আদর্শ ও মনস্তাত্ত্বিক দর্শন? সম্প্রতি সিঙ্গাপুরের নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির  একটি চমকপ্রদ গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক ভিন্নধর্মী ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।

বিশ্বের ২৬টি দেশের ১০ হাজার ৬৬১ জন ফুটবলপ্রেমীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে পছন্দের পেছনে সমর্থকদের রাজনৈতিক মতাদর্শ ও ব্যক্তিগত মূল্যবোধের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ রয়েছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, যারা নিজেদের সমাজ ও রাজনীতিতে উদারপন্থী (লিবারেল) হিসেবে বিবেচনা করেন, তাদের বড় একটি অংশের পছন্দ আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। অর্থাৎ সমাজের এলিটরা পছন্দ করেন মেসিকে। অন্যদিকে, রক্ষণশীল (কনজারভেটিভ) মতাদর্শে বিশ্বাসীদের মাঝে পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। মানেটা দাঁড়ায় রোনালদোকে বেশি পছন্দ করেন সাবঅল্টার্নরা।

গবেষকদের মতে, দুই ফুটবলারের জনমানসে গড়ে ওঠা বিপরীতধর্মী ভাবমূর্তি বা ‘পাবলিক ইমেজ’ মানুষের নিজস্ব সামাজিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে যায় বলেই এমনটি ঘটে। লিওনেল মেসি সাধারণত শান্ত, পরিমিতিবোধসম্পন্ন, বিনয়ী এবং ব্যক্তি-অর্জনের চেয়ে দলগত সাফল্যকে প্রাধান্য দেওয়া এক চরিত্র। উদারপন্থীরা সাধারণত এই ধরনের সমষ্টিকেন্দ্রিক ও বিনয়ী ভাবমূর্তির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। বিপরীতে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো চরম আত্মবিশ্বাসী, উচ্চাভিলাষী, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাসী এবং নিজের সাফল্যকে প্রকাশ্য ও দৃশ্যমানভাবে উদযাপনকারী। রক্ষণশীল ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিরা রোনালদোর এই লড়াকু ও ডমিনেটিং মানসিকতার সাথে নিজেদের দ্রুত মেলাতে পারেন।

গবেষণায় ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতেও দুই তারকার জনপ্রিয়তার একটি নিখুঁত চিত্র উঠে এসেছে। ফ্রান্স ও চীনসহ ১১টি দেশে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো জনপ্রিয়তার বিচারে মেসির চেয়ে এগিয়ে আছেন। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ ৮টি দেশে লিওনেল মেসির প্রতি জনসমর্থন বেশি। জার্মানি ও জাপানসহ ৭টি দেশে দুই তারকার জনপ্রিয়তায় পরিসংখ্যানগতভাবে তেমন কোনো বড় ব্যবধান পাওয়া যায়নি। তবে ব্যতিক্রম ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। এশিয়ার এই দেশটিতে সামগ্রিক রাজনৈতিক মতাদর্শ ছাপিয়ে লিওনেল মেসি অত্যন্ত বড় ব্যবধানে রোনালদোর চেয়ে এগিয়ে আছেন।

গবেষকেরা আরও লক্ষ্য করেছেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে তারকা পছন্দের এই প্রবণতা বয়স্কদের তুলনায় তরুণ প্রজন্মের মাঝে সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্কটি কিছুটা দুর্বল হয়ে আসে।

এ ছাড়া গবেষণার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো—যাদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ বা ‘সেলফ এস্টিম’ বেশি, তাদের মাঝে রোনালদোকে পছন্দ করার হার বেশি। সমাজ মুখে বিনয়ের প্রশংসা করলেও, বাস্তবে উচ্চ আত্মসম্মানসম্পন্ন মানুষরা এমন ব্যক্তিত্বকে পছন্দ করেন যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সক্ষমতা বুক ফুলিয়ে প্রকাশ করতে পারেন। তারা রোনালদোর এই অতি-মানবীয় সাফল্যের সঙ্গে নিজেদের আত্মপরিচয়কে একাত্ম করে এক ধরনের মানসিক তৃপ্তি পান।

বিশ্বকাপের চলতি আসর হয়তো এই দুই কিংবদন্তির শেষ বিশ্বমঞ্চ। মাঠের লড়াইয়ে কে ট্রফি উঁচিয়ে ধরবেন তা সময় বলবে, তবে নানয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা প্রমাণ করে দিল—মেসি আর রোনালদো এখন আর কেবল দুজন ফুটবলার নন; বরং তারা মানুষের ব্যক্তিগত দর্শন, জীবনবোধ ও আত্মপরিচয়ের দুটি ভিন্ন প্রতীক। আর ঠিক এ কারণেই, এই বিতর্কের অবসান হওয়া কোনোদিনই সম্ভব নয়।