২৪ জুন ২০২৬, ১৪:৪৫

আলমিরন লাল কার্ড পেলেও একই অপরাধে বেলিংহ্যাম কেন পেলেন না, রেফারির ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক

আলমিরন ও বেলিংহাম   © সংগৃহীত

২০২৬ বিশ্বকাপে নতুন এক নিয়ম ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে মুখ ঢেকে কথা বললে লাল কার্ড দেখানোর বিধান চালু করেছে ফিফা ও আইএফএবি। সেই নিয়মে প্যারাগুয়ের তারকা মিগেল আলমিরন সরাসরি লাল কার্ড দেখলেও ইংল্যান্ডের জুড বেলিংহ্যাম প্রায় একই ধরনের ঘটনার পর কোনো শাস্তি পাননি। ফলে ফুটবল বিশ্বে এখন বড় প্রশ্ন—একই নিয়ম দুই খেলোয়াড়ের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হলো কেন?

ঘটনার সূত্রপাত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে প্যারাগুয়ের তারকা মিগেল আলমিরন প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে কথা বলার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখেন। বিষয়টি রেফারির নজরে আসার পর ভিএআরের সহায়তায় ঘটনাটি পর্যালোচনা করা হয়। পরে সালভাদোরের রেফারি ইভান বার্টন তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। নতুন নিয়মে এটিই ছিল বিশ্বকাপের প্রথম লাল কার্ডের ঘটনা। সেই সঙ্গে এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও পান আলমিরন।

অন্যদিকে ঘানার বিপক্ষে ইংল্যান্ডের গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে জুড বেলিংহ্যামকে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় জর্ডান আয়েউর সঙ্গে উত্তেজিত মুহূর্তে মুখ ঢেকে কথা বলতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সমর্থক ও বিশ্লেষক ধারণা করেছিলেন, আলমিরনের ঘটনার মতো এখানেও অন্তত ভিএআরের হস্তক্ষেপ দেখা যাবে। কিন্তু রেফারি কোনো ব্যবস্থা নেননি। এমনকি ঘটনাটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো পর্যালোচনাও হয়নি।

এর পর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে, নতুন নিয়মটি কি সব ম্যাচে সমানভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে?

ফিফা ও আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) সম্প্রতি এই নিয়ম চালু করে। মূল লক্ষ্য ছিল বর্ণবাদী মন্তব্য, গোপন অপমানজনক ভাষা কিংবা ম্যাচ চলাকালে মুখ আড়াল করে অসদাচরণ প্রতিরোধ করা। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে কোনো খেলোয়াড় যদি হাত, বাহু বা জার্সি দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বলেন, তাহলে রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে পারেন।

বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ফুটবলে বর্ণবাদবিরোধী অবস্থান জোরদার হওয়ার পর এই ধরনের আচরণ কঠোরভাবে দমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে ঘটে যাওয়া একাধিক বর্ণবাদী ঘটনার পর বিষয়টি আরও গুরুত্ব পায়।

তবে বেলিংহ্যামের ঘটনায় শাস্তি না হওয়ায় বিতর্ক আরও বেড়েছে। অনেকের মতে, নিয়মটি যদি আলমিরনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়, তাহলে বেলিংহ্যামের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ হওয়া উচিত ছিল। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, দুই ঘটনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল এবং রেফারি হয়তো পরিস্থিতিকে একইভাবে মূল্যায়ন করেননি।

এদিকে ঘানার কোচ কার্লোস কুইরোজ ম্যাচ শেষে রেফারিং ও ভিএআরের ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তার দাবি, ম্যাচে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘানার বিপক্ষে গেছে।

ম্যাচ শেষে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কুইরোজ বলেন, ‘বিশ্বকাপে কি এখনো ভিএআর কাজ করছে? আদৌ কি ভিএআর আছে? এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘মনে হয় দ্বিতীয়ার্ধে ভিএআর রেফারি ছুটিতে ছিলেন।’

ব্যঙ্গাত্মক সুরে কুইরোজ যোগ করেন, ‘আবারও মনে হলো ভিএআর কফি খেতে চলে গিয়েছিল। অবশ্য আমিও মাঝে মাঝে কফি খেতে পছন্দ করি।’

তার মতে, ঘানার স্ট্রাইকার প্রিন্স আদুকে ফাউল করার ঘটনায় ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার এজরি কনসার বিরুদ্ধে পেনাল্টি দেওয়া উচিত ছিল। একই সঙ্গে গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড গোললাইন ছেড়ে বের হয়ে আদুর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ানোয় লাল কার্ডও দেখতে পারতেন।

কুইরোজ বলেন, ‘ওটা পরিষ্কার পেনাল্টি এবং লাল কার্ড ছিল। এ নিয়ে কারও কোনো সন্দেহ আছে? নাকি শুধু আমিই ম্যাচটা দেখেছি?’

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে তিনি বলেন, ‘আমার এই ব্যঙ্গাত্মক কথাগুলোর জন্য দুঃখিত। কিন্তু আমি যদি এগুলো সিরিয়াসভাবে বলি, তাহলে তারা আমাকে শাস্তি দেবে। তাই আমি মজা করেই বলছি।’

অন্যদিকে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হলেও নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে সন্তুষ্ট নন জুড বেলিংহ্যাম। রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার মনে করেন, ঘানার কোনো খেলোয়াড়ই পুরস্কারটি পাওয়ার বেশি যোগ্য ছিলেন।

ম্যাচ শেষে বেলিংহ্যাম বলেন, ‘সত্যি বলতে আমি এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য ছিলাম না। আমার মনে হয় তাদের কোনো একজন খেলোয়াড়ের পাওয়া উচিত ছিল, যারা অসাধারণ রক্ষণ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কয়েকটি মুহূর্ত পেয়েছিলাম, কিন্তু ম্যাচে ঠিকভাবে প্রভাব ফেলতে পারিনি। যারা আমাকে ভোট দিয়েছে, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’

ইংল্যান্ডের ধারাবাহিকভাবে দ্বিতীয় গ্রুপ ম্যাচে হোঁচট খাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বেলিংহ্যাম বলেন, ‘ইংল্যান্ডের সেই দ্বিতীয় ম্যাচের জ্বর, তাই না? প্রথম ম্যাচ জিতি, দ্বিতীয় ম্যাচ ড্র করি।’

ঘানার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তিনি বলেন, ‘এটা ঠিক আছে। আমার মনে হয় তারা ড্রয়ের লক্ষ্য নিয়েই খেলেছিল, আর সেই ফলই পেয়েছে। তাদের কৃতিত্ব দিতেই হবে। তারা দারুণ কাজ করেছে।’

ফুটবল বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, নতুন নিয়মটি খেলার স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা বলছেন, নিয়মের সফলতা নির্ভর করবে এর ধারাবাহিক প্রয়োগের ওপর। যদি এক ম্যাচে লাল কার্ড দেখানো হয় আর অন্য ম্যাচে একই ধরনের ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।

ফিফা এখনো বেলিংহ্যামের ঘটনাটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে নতুন এই নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেদিকেই এখন নজর ফুটবল বিশ্বের। আলমিরনের লাল কার্ড এবং বেলিংহ্যামের শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা ইতোমধ্যেই দেখিয়ে দিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচিত বিতর্ক হতে পারে এই নতুন নিয়ম এবং তার প্রয়োগ।