ইউসেবিও থেকে ফিগো হয়ে রোনালদো: পর্তুগিজ ফুটবলের তিন নিঃসঙ্গ শেরপা
বড় টুর্নামেন্টে পর্তুগালের সঙ্গে একটা বিশেষ ধরনের হতাশা জড়িয়ে থাকে। সাধারণ দলের হতাশা নয় এটা, কারণ পর্তুগাল কখনো স্রেফ সাধারণ দল ছিল না। সর্বস্ব বুকে নিয়ে বিশ্বমঞ্চে ওঠে তারা, শীর্ষের দিকে তাকায়, আর দেখে এক পর্বতচূড়া পরিমাণ দূরত্ব বাকি রয়ে গেছে। সবসময়ই খানিকটা বাকি থেকে যায়। এই গল্পের শুরু, যেমন পর্তুগিজ ফুটবলের প্রতিটি গল্পকে শুরু করতে হয়, ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ডের জুলাইয়ের রোদ্দুরে।
কালো চিতার আগুন
সেই গ্রীষ্মের আগে পর্তুগাল কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি। টুর্নামেন্টের ৬৪ বছরের ইতিহাসে তারা প্রথমবার এসেছিল, আর প্রথম পর্বেই পড়েছিল ব্রাজিলের সঙ্গে। পর পর দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। লিসবনের বাইরে কেউ পর্তুগালকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। তারপর মোজাম্বিক থেকে আসা এক ছেলে দৌড়াতে শুরু করল।
ইউসেবিও দা সিলভা ফেরেইরার জন্ম ১৯৪২ সালে মোজাম্বিকে, তখন সেটি ফ্যাসিস্ট পর্তুগালের উপনিবেশ। পর্তুগালের হয়ে ৬৪ ম্যাচে ৪১ গোল করেছেন তিনি। কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে সেই ইংরেজ গ্রীষ্মে ইউসেবিও কী ছিলেন, তা বোঝানো যাবে না। সে সময় কালো ফুটবলার মাঠে ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজন। মাঠে তার উপস্থিতিই ছিল এক বিবৃতি। কিক ইট আউটের চেয়ারম্যান লর্ড হারম্যান ওউসলি পরে বলেছিলেন, ষাটের দশকে ইউসেবিও সারা ইউরোপের কালো মানুষদের কাছে কিংবদন্তি ছিলেন। পেলের পাশে তিনি ছিলেন এই বার্তার প্রতীক যে ফুটবলে, আর জীবনে, কালো মানুষও সর্বোচ্চ জায়গায় পৌঁছাতে পারে।
গ্রুপ পর্বে পর্তুগাল ঝড় তুলল। হাঙ্গেরিকে ৩-১, বুলগেরিয়াকে ৩-০। তারপর যা কেউ ভাবেনি, ব্রাজিলকেও ৩-১ গোলে হারিয়ে দিল। ইউসেবিও সেদিন দুটো করলেন। পর্তুগাল শতভাগ রেকর্ড নিয়ে গ্রুপ টপ করল।
কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়া হওয়ার কথা ছিল নিছক আনুষ্ঠানিকতা। উত্তর কোরিয়া আগের রাউন্ডে ইতালিকে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম বড় বিস্ময় ঘটিয়েছিল। মিডলসব্রো থেকে প্রায় তিন হাজার সমর্থক লিভারপুলে ছুটে এসেছিল তাদের পেছনে। ২৫ মিনিটেই ৩-০তে পিছিয়ে পড়ল পর্তুগাল। লজ্জার একটা ম্যাচ হতে চলেছে মনে হচ্ছিল। তখন ইউসেবিও দায়িত্ব নিলেন।
২৭ মিনিটে গোল, ৪৩ মিনিটে পেনাল্টি, ৫৬ মিনিটে গোল, ৫৯ মিনিটে আবার পেনাল্টি। চারটি গোল একজনের। যে ম্যাচে তার দল ৩-০তে হারছিল, সেখানে একা টেনে তুলে ৫-৩ করলেন। হোসে আউগুস্তো ৮০ মিনিটে পঞ্চম গোল দিলেন। পর্তুগাল জিতল।
ইউসেবিও পরে বলেছিলেন, "সব খেলোয়াড়ের জীবনে একটা বিশেষ মুহূর্ত আসে। আমার সেই মুহূর্ত ছিল ওই ম্যাচের চারটি গোল।" ইংল্যান্ড অধিনায়ক ববি চার্লটন, যিনি কয়েক সপ্তাহ পরে ট্রফি তুলবেন, বললেন এটা তার দেখা সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সগুলোর একটি।
সেমিফাইনালে স্বাগতিক ইংল্যান্ড, খেলা ফুটবলের তীর্থ ওয়েম্বলিতে। পর্তুগাল ২-১ গোলে হারল। ৮২ মিনিটে ইউসেবিও পেনাল্টি করলেন, কিন্তু সেটুকুই। শেষ বাঁশিতে তিনি মাঠে কাঁদলেন। সেই কান্নার ছবি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল। পর্তুগাল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে সোভিয়েত ইউনিয়নকে হারিয়ে তৃতীয় হলো। ইউসেবিও নয় গোল নিয়ে গোল্ডেন বুট জিতলেন। একটি বিশ্বকাপে এই রেকর্ড পরে মাত্র তিনজন ভাঙতে পেরেছেন: ১৯৫৮ সালে জাস্ট ফঁতেন ১৩টি, ১৯৫৪ সালে স্যান্ডর কোচিস ১১টি, আর ১৯৭০ সালে গার্ড মুলার ১০টি। নয় গোল, তৃতীয় স্থান। একটা জাতি একসঙ্গে আনন্দ আর বেদনায় কাঁদল।
এরপর পর্তুগাল আরো ২০ বছর বিশ্বকাপে ফিরতে পারেনি। ফুটবলে একটা প্রজন্ম মানে প্রায় দশ বছর। ইউসেবিওর প্রজন্মকে দুটো প্রজন্ম পার হতে দেখতে হলো পরের অধ্যায় খোলার আগে।
আলমাদার উইঙ্গার আর গোল্ডেন জেনারেশনের ভার
লুইস ফিগো বড় হয়েছেন লিসবনের উলটো পাড়ে আলমাদার শ্রমিকশ্রেণির পাড়া কোভা দা পিয়েদাদেতে। বারো বছর বয়সে স্পোর্টিং সিপির একাডেমিতে যোগ দেন। মাঝ-বিশের কোঠায় এসে তিনি পৃথিবীর সেরা উইঙ্গার। তাঁকে সর্বকালের অন্যতম সেরা উইঙ্গার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কিন্তু ফিগো একা পর্তুগালকে বয়ে বেড়াননি, বহন করেছেন একটি গোল্ডেন জেনারেশনকে। ফুটবলে এই শব্দটির মানে সাধারণত হয় অসাধারণ প্রতিভার একটি দল যারা শেষ পর্যন্ত কিছু জেতেনি। পর্তুগালের গোল্ডেন জেনারেশন সেই সংজ্ঞায় পুরোপুরি মেলে। রুই কস্তা, জোয়াও পিন্তো, নুনো গোমেস, সার্জিও কনসেইসাও। কোনো ট্রফি নেই। কিন্তু ফিগোর নেতৃত্বে তারা ১৯৬৬-র পর পর্তুগালের সেরা বিশ্বকাপ ফলাফল করলেন, আর ২০১৬ সালে জেতার আগে পর্যন্ত ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও সেরা ফলাফল।
সেই সাফল্যের পথটা বারবার গেছে শেষ মুহূর্তের বেদনার মধ্য দিয়ে, আর একটা পুরো অপমানের মধ্য দিয়েও। ১৯৯৬ সালে ইউরো, ইংল্যান্ডে। ১৯৮৪-র পর পর্তুগালের প্রথম বড় টুর্নামেন্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে চেক রিপাবলিকের কাছে পেনাল্টিতে বিদায়। সক্ষম, প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, কিন্তু যথেষ্ট নয়।
তারপর ২০০০ সালের ইউরো। মনে হচ্ছিল এবার পর্তুগাল সত্যিই ভাঙতে পারবে দেয়াল। ইংল্যান্ড, জার্মানি, রোমানিয়াকে সামনে পেয়ে তিন জয়ে গ্রুপ টপ করল। ফিগোর ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই দূরপাল্লার শট পর্তুগিজ ফুটবলের অন্যতম আইকনিক ছবি হয়ে গেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তুরস্কের বিরুদ্ধেও ফিগো নির্ধারক। তারপর সেমিফাইনালে ফ্রান্স, আর ট্রেজেগেতের গোল্ডেন গোলে শেষ হলো স্বপ্ন। এতটুকু কাছে এসে।
দুই বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপ, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান। গ্রুপে আমেরিকার কাছে ৩-২ হারল, পোল্যান্ডকে ৪-০ হারাল। তারপর গ্রুপ জেতা দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ১-০। ১৯৮৬-র পর প্রথম বিশ্বকাপে গ্রুপ থেকেই বিদায়। ফিগো একটা গোলও পেলেন না। এত প্রতিভাবান একটি দলের জন্য এটা ছিল আত্মবিশ্বাসের গভীর সংকট।
২০০৪ সালে ইউরো পর্তুগালেই। প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ। ফিগো দলনায়ক। পুরো জাতি অপেক্ষায়। কিন্তু উদ্বোধনী ম্যাচেই গ্রিস ২-০ গোলে এগিয়ে গেল। ফিগোর কর্নার থেকে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর শেষ মুহূর্তের গোল শুধু সান্ত্বনা হলো। পর্তুগাল ২-১ হারল। সেখান থেকে ঘুরে উঠে রাশিয়া, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ডকে হারাল। ফাইনালে উঠল। ফিগো অসাধারণ ছিলেন সেমিফাইনালে ডাচদের বিরুদ্ধে। তারপর ফাইনালে আবার গ্রিস। আবার ১-০ হার। ইতিহাসে প্রথম আয়োজক দেশ হিসেবে ইউরো ফাইনাল হেরে বসল পর্তুগাল।
সে রাতে ফিগো আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন, যে সিদ্ধান্ত পরে বদলান। ২০০৬ সালে তিনি ফিরলেন। বাছাইপর্বে ছয় ম্যাচে সাত অ্যাসিস্ট করলেন। অ্যাঙ্গোলার বিরুদ্ধে একমাত্র গোলে পাউলেতাকে এসিস্ট করলেন ফিগো। সেই দলে সতীর্থ হিসেবে ছিলেন একজন ২১ বছরের ছেলে, সতেরো নম্বর জার্সিতে, বাম দিকে। ছোটবেলা থেকে ফিগোকে আদর্শ মেনে বড় হয়েছেন, একই স্পোর্টিং একাডেমিতে। সেই ব্যাটন হস্তান্তর ঘটছিল একই ড্রেসিংরুমে, একই মাঠে। পর্তুগাল নেদারল্যান্ডসকে হারাল রাউন্ড অব সিক্সটিনে। ইংল্যান্ডকে পেনাল্টিতে কোয়ার্টার ফাইনালে।
সেমিফাইনালে ফ্রান্স, জিনেদিন জিদান, আর শেষ। তৃতীয় স্থান নির্ধারণীতে জার্মানির কাছে ৩-১ হার। ফিগো সেখানেও একটি অ্যাসিস্ট করলেন, মাঠে নামলেন বদলি হিসেবে, পেলেন অধিনায়কের বাহুবন্ধনী। পর্তুগিজ আর জার্মান সমর্থক দুদিক থেকেই করতালি দিল। সর্বস্ব দিয়ে কিছু না পাওয়া একজন মানুষকে সবাই সম্মান জানাল।
সেটাই পর্তুগিজ ফুটবলের বিশেষ বেদনা: পুরস্কার হিসেবে শুধু প্রশংসা পাওয়া
১২৭ ম্যাচ, ৩২ গোল নিয়ে ফিগোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হলো। পর্তুগালের সর্বকালীন গোলদাতার তালিকায় তিনি চতুর্থ। গোল্ডেন জেনারেশন ভেঙে গেল। সাত নম্বর জার্সির সেই তরুণকে একা বহন করতে হবে এরপরের সব কিছু।
সিআর৭-এর উত্তরাধিকার
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো সিংহাসনের উত্তরাধিকার পাননি, পেয়েছেন ইতিহাসের ভার। ২০১০ বিশ্বকাপের দলে যখন পর্তুগাল ছিল, রোনালদোর বয়স তখন ২৫। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন, রেকর্ড দামে রিয়াল মাদ্রিদে গেছেন। পৃথিবীর সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে ৭-০-র জয়ে মাত্র একটি গোল। এবং শেষ পর্যন্ত ভবিষ্যৎ চ্যাম্পিয়ন স্পেনের কাছে রাউন্ড অব সিক্সটিনে বিদায়। পুরো দেশ অনেক বেশি আশা করেছিল।
২০১৪ আসর আরো কঠিন ছিল। টুর্নামেন্টের আগে হাঁটুর চোট রোনালদোকে দৃশ্যতই বেঁধে ফেলেছিল। প্রথম ম্যাচে জার্মানির কাছে ৪-০ হার, সাম্প্রতিক ইতিহাসে পর্তুগালের সবচেয়ে মর্মান্তিক পরাজয়গুলোর একটি। শেষ গ্রুপ ম্যাচে ঘানার বিরুদ্ধে রোনালদো দেরিতে বিজয়ী গোল করলেও গ্রুপ পেরোতে পারল না পর্তুগাল। তিনটি টুর্নামেন্ট। তিনটি হতাশা। বিশ্বকাপ জেততে না পারা আরেক মহাদেশীয় প্রতিভা মেসির সঙ্গে তুলনা জোরালো হতে লাগল। তবে ২০১৮ বিশ্বকাপে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করার সেই অধ্যায়ের আগে এসেছিল ভিন্ন ধরনের এক জয়।
ইউরো ২০১৬-তে রোনালদো অবশেষে জিতেছিলেন জাতীয় দলের হয়ে একটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। কিন্তু টুর্নামেন্টটি মোটেও সহজ ছিল না। গ্রুপ পর্বে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি পর্তুগাল, সেরা তৃতীয় স্থানধারী দলগুলোর একটি হিসেবে তারা নকআউট পর্বে ওঠে। হাঙ্গেরির বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ৩-৩ ড্রয়ে দুই গোল করে দলকে বাঁচান রোনালদো। এরপর ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ড ও ওয়েলসের বিপক্ষে জয়ের পথে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং দলকে পৌঁছে দেন ফাইনালে।
প্যারিসের ফাইনাল নিয়ে আসে নতুন এক হৃদয়ভঙ্গের মুহূর্ত। স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের মাত্র ২৫ মিনিটেই হাঁটুর চোটে কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়তে হয় রোনালদোকে। কিন্তু সাইডলাইন থেকে তিনি যেন হয়ে ওঠেন দলের অতিরিক্ত এক কোচ, সতীর্থদের উৎসাহ দিতে থাকেন, তাদের লড়াই চালিয়ে যেতে তাগিদ দেন। পর্তুগালও নিজেদের ধরে রাখে। অতিরিক্ত সময়ে এডারের গোলে তারা ১-০ ব্যবধানে জয় পায় এবং জিতে নেয় ইতিহাসের প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা। বিশ্বকাপে বারবার ব্যর্থতার জন্য এতদিন যে রোনালদো সমালোচিত হয়েছেন, তিনি তখন আর শুধু একজন তারকা নন। তিনি ইউরোপের চ্যাম্পিয়ন।
তারপর ২০১৮, আধুনিক বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, পর্তুগাল বনাম স্পেন। ১৫ জুন ২০১৮, সোচিতে রোনালদো চার মিনিটেই গোল দিলেন। ডিয়েগো কোস্তা সমতা ফেরাল। রোনালদো আবার এগিয়ে দিলেন। কোস্তা আবার সমতা আনল। তারপর ৮৮ মিনিট। ২৫ গজ দূর থেকে ফ্রি-কিক। রোনালদো বলটা উপরের কোণে বাঁকিয়ে দিলেন। হ্যাটট্রিক। ৩৩ বছর ১৩০ দিন বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় হলেন। পর্তুগাল ৩-৩ ড্র করল স্পেনের সঙ্গে। গ্রুপ পর্বের সেরা ম্যাচ। রোনালদো শেষমেশ চার গোল করলেন ওই বিশ্বকাপে। রাউন্ড অব সিক্সটিনে উরুগুয়ের কাছে বিদায়।
চার গোল। কিন্তু নকআউট পর্বে একটিও নেই। বিশ্বকাপও নেই। ২০২২, কাতার বিশ্বকাপ। রোনালদো বিতর্কের মাঝে পৌঁছালেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভেঙে পড়ছে সবার সামনে। কোচ ফার্নান্দো সান্তোস তাঁকে একাদশ থেকে বাদ দিলেন। দেশ দুভাগ হয়ে গেল। ঘানার বিপক্ষে ৩-২ জয়ে পেনাল্টি থেকে গোল দিলেন, পাঁচটি আলাদা বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম পুরুষ ফুটবলার হলেন। যে ম্যাচে মাঠে নেই, সেই ম্যাচে বেঞ্চে বসে কাঁদছেন। সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে বদলি হয়ে নামলেন, পর্তুগাল ৬-১ জিতল কিন্তু রোনালদো গোল পেলেন না। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর কাছে হার, রোনালদো শুধু বদলি হিসেবে।
মরক্কো ম্যাচের পরে ড্রেসিংরুমে বসে তিনি কাঁদলেন। সেই ছবিও পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, ঠিক যেমন ১৯৬৬ সালে ইউসেবিওর ছবি ছড়িয়েছিল। ভিন্ন টুর্নামেন্ট, ভিন্ন প্রজন্ম, একই পর্তুগিজ বেদনা।
হিউস্টন, ২৩ জুন ২০২৬, ভাঙল রেকর্ড
রোনালদো ২০২৬ বিশ্বকাপে এলেন ৪১ বছর বয়সে। পর্তুগালের হয়ে কোনো বড় টুর্নামেন্টে খেলা সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড়। দল ঘোষণার আগেই সমালোচকরা তাঁকে বাদ দিতে বলছিলেন। সৌদি আরবের ক্লাব ফুটবল বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে কতটুকু, তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ ১-১ ড্র। রোনালদো গোল পেলেন না। একটি গোল দরকার ছিল ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা প্রথম খেলোয়াড় হতে, পারলেন না।
তারপর উজবেকিস্তান, হিউস্টনে। পঞ্চম মিনিট। জোয়াও কানসেলোর ক্রসে রোনালদো ডান পায়ে হাফভলিতে গোল। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড়। কর্নারে ছুটে গিয়ে লাফ দিলেন, সেই চিরচেনা সিইউইউইইই উদযাপন, ৪১ বছর বয়সে, ষষ্ঠ বিশ্বকাপে। হয়তো ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে তাঁর শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচগুলোর একটিতে।
তারপর ৩৮ মিনিটে আবার। ব্রুনো ফার্নান্দেসের থ্রু বল, রোনালদো ডান পায়ে গোল। বিশ্বকাপে তাঁর দশম, ইউসেবিওর রেকর্ড ভাঙল।
দশ গোল, ছয় বিশ্বকাপ; ২০০৬ সালে জার্মানিতে ইরানের বিরুদ্ধে চুপচাপ ২১ বছরের ছেলেটির প্রথম পেনাল্টি থেকে ২০ বছরের পথ পেরিয়ে হিউস্টনে ৪১ বছরের এই রোনালদো, সেই রেকর্ড ভাঙলেন যেটা ধরে ছিলেন ইউসেবিও, যেবার ইংল্যান্ড শেষবার বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল।
পর্তুগাল ম্যাচ জিতল ৪-০। হাফটাইমের আগে রোনালদোর তৃতীয় গোলটি গোললাইনের ওপর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হলো, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে হ্যাট্রিকের জন্য দৌড়ে বলে পা ছোঁয়াতে পারেন নি। ৪১ বছর বয়সেও তিনি সবটুকু চান।
এই মানুষগুলো কাঁধে যে ভার বহন করেছেন
ছয় দশক জুড়ে এই তিনজনকে যা এক সুতায় বাঁধে তা শুধু প্রতিভা নয়। বিশ্বকাপে সব দেশেই প্রতিভা থাকে। পর্তুগাল যা তৈরি করেছে সেটা বিরল। এমন সব ব্যক্তিত্ব যারা দলের বাকি সবার চেয়ে এতটাই আলাদা যে তারাই হয়ে ওঠেন দলের পুরো গল্প। ১৯৬৬ সালে ইউসেবিও পর্তুগালের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন পর্তুগাল। ২০০৬ সালে ফিগো পর্তুগালের সেরা বিকল্প ছিলেন না। তিনি ছিলেন পর্তুগালের অতীত, বর্তমান এবং বিদায়। রোনালদো শুধু পর্তুগালের অধিনায়ক নন। বিশ বছর ধরে তিনি পর্তুগিজ ফুটবল সম্পর্কে যেকোনো প্রশ্নের উত্তর।
এই একক কর্তৃত্ব একই সঙ্গে উপহার ও ফাঁদ। এই মানুষগুলোর পাশে পর্তুগালে প্রতিভার অভাব কখনো ছিল না। ফার্নান্দো কৌতু, রুই কস্তা, দেকু, পেপে, ব্রুনো ফার্নান্দেস, বার্নার্দো সিলভা। সাপোর্টিং কাস্ট সবসময় শক্তিশালী ছিল। কিন্তু ৬০ বছরে কোনো বিশ্বকাপই একজন ব্যক্তিগত প্রতিভাকে পুরস্কৃত করেনি। একজন মানুষের কাঁধে বিশ্বকাপ নিয়ে যাওয়া যায় না। ব্রাজিলের দরকার হয়েছিল রোনালদো-রিভালদো-রোনালদিনহো। ফ্রান্সের দরকার হয়েছিল জিদান-থুরাম-দেজাই। ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার দরকার হয়েছিল মেসি-ডি মারিয়া-আলভারেজ।
পর্তুগাল সবসময় বিশ্বাস করার মতো কাছাকাছি এসেছে। ১৯৬৬-র তৃতীয় স্থান। ২০০৬-র চতুর্থ স্থান। ২০১৬-র ইউরো, যেটা রোনালদো জিতলেন আহত অবস্থায়, মাঠের বাইরে থেকে, পর্তুগালের ইতিহাসে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। সেই প্যারিসের রাতটা একটা কথা বলল: পর্তুগাল জিততে পারে। তারা অভিশপ্ত নয়। যথেষ্ট সামষ্টিক শক্তি পেলে তারা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে পারে।
রোনালদো ছয় বিশ্বকাপে এখন দশ গোল করেছেন। সর্বকালীন রেকর্ড থেকে এখনো আট গোল পিছিয়ে। সেই রেকর্ড এখন লিওনেল মেসির, ১৮ গোল নিয়ে। মেসি ২২ জুন অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে দুই গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোসার পুরনো রেকর্ড ১৬ পেরিয়ে একাই এগিয়ে গেছেন। রোনালদো হয়তো ১৮-তে পৌঁছাবেন না। কেউ বাস্তবিকভাবে সেটা আশাও করেন না। কিন্তু ৪১ বছর বয়সে ছয় বিশ্বকাপে দশ গোল, পুরো একটি দেশকে পিঠে নিয়ে, ইউসেবিওর রেকর্ড ছাড়িয়ে, এটা নিজের মধ্যেই এক অসাধারণ গৌরব।
ইউসেবিও একটি বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে নয় গোল করেছিলেন। রোনালদো ছয় বিশ্বকাপে ২৪ ম্যাচ খেলে দশে পৌঁছেছেন। সংখ্যাগুলো আসলে মূল কথা নয়। দুজনেই এমন একটি জার্সি পরেছিলেন যা একজন মানুষের কাছে অনেক বেশি কিছু চায়। দুজনেই সর্বস্ব দিয়েছেন। কেউই বিশ্বকাপ নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেননি।
পর্তুগাল এগিয়ে চলছে। টুর্নামেন্ট চলছে। ৪১ বছরে রোনালদো তখনো তাড়া করছেন সেই একটি জিনিস যা সবচেয়ে বেশি সময় ধরে এড়িয়ে গেছে তাঁকে। এরপর যাই হোক, তিনি রেখে যাবেন ফুটবলে পর্তুগিজ আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে সম্পূর্ণ প্রতিকৃতি। এমন এক মানুষ যিনি সব চেয়েছিলেন, সব দিয়েছিলেন, প্রায় সব পেয়েছিলেন, আর শেষ পর্বতের পাদদেশে দাঁড়িয়ে তখনো উঠছিলেন। পর্তুগিজ ফুটবলের একাকী শেরপারা প্রতিটি চূড়ায় পৌঁছায় না। কিন্তু চেষ্টার বিষয়ে কেউ কখনো সন্দেহ করেনি।