মেসি বনাম রোনালদো দ্বৈরথে কে কোন জায়গায় এগিয়ে
ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং অবিসংবাদিত দ্বৈরথটি যেন এক চিরন্তন যুদ্ধ, যার সমাপ্তি কোনোদিন হওয়ার নয়। বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকা—লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—গোলের রাজা হওয়ার এক শ্বাসরুদ্ধকর ও অতিমানবীয় লড়াইয়ে একে অপরের একেবারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়ে যাচ্ছেন। ক্যারিয়ারের শেষ গোধূলিতে দাঁড়িয়েও ২০২৬ সালের এই চলতি বিশ্বকাপে দুজনেই নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছেন এবং ফুটবলবিশ্বকে বুদ করে রাখছেন।
যেখানে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক এবং অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি এই দ্বৈরথে নতুন করে আগুন জ্বালিয়েছেন, ঠিক সেখানেই শুরুর ধাক্কা সামলে উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল দিয়ে নিজের রাজ্য পাহারা দিচ্ছেন পর্তুগিজ যুবরাজ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। মাঠের লড়াইয়ে শিরোপা আর ব্যক্তিগত পুরস্কারের সীমানা ছাড়িয়ে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন রূপ নিয়েছে এক জটিল ও নিখুঁত পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে, যেখানে ফুটবল ইতিহাসের প্রধানতম রেকর্ডগুলোতে একজন অন্যজনকে প্রতিনিয়ত টেক্কা দিয়ে যাচ্ছেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে যদি এই দুই তারকার মহাকাব্যিক লড়াইয়ের খতিয়ান দেখা যায়, তবে সেখানে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বমঞ্চে ২৮টি ম্যাচ খেলা মেসির গোল সংখ্যা ১৮টি, যেখানে ২৫ ম্যাচে রোনালদোর গোল ১০টি। কেবল গোল করাই নয়, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও (অ্যাসিস্ট) ৮টি অ্যাসিস্ট নিয়ে এগিয়ে আছেন মেসি, যেখানে রোনালদোর অ্যাসিস্ট মাত্র ২টি। জয়ের দিক থেকেও ১৯টি জয় নিয়ে রোনালদোর (১০টি জয়) চেয়ে অনেক ওপরে অবস্থান করছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।
এর বাইরে মেসির ঝুলিতে রয়েছে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি, যেখানে রোনালদোর সর্বোচ্চ সাফল্য ২০০৬ সালের সেমিফাইনাল। তবে বিশ্বমঞ্চে রোনালদোরও রয়েছে এক অনন্য কীর্তি; ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে তিনি টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড গড়েছেন। অন্যদিকে মেসি ১৮টি গোল নিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি নিজের দখলে রেখেছেন। অবশ্য তারা দুজনেই বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপ খেলার এক অলৌকিক নজির ভাগাভাগি করছেন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে বা নিজের দেশের জার্সিতে সামগ্রিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে আবার রাজার আসনটি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দখলে। পর্তুগালের হয়ে ২৩০টি ম্যাচ খেলে ১৪৫টি গোল নিয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতার রেকর্ডটি নিজের করে রেখেছেন সিআরসেভেন । এখানে মেসি ২০১ ম্যাচে ১২২টি গোল নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থেকে রোনালদোকে তাড়া করছেন। তবে জাতীয় দলের হয়ে সতীর্থদের গোল বানিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে মেসির কার্যকারিতা অনেক বেশি, যেখানে তাঁর অ্যাসিস্ট ৬১টি এবং রোনালদোর ৩৭টি। এমনকি মাঠে প্রতি ৯০ মিনিটে মেসি যেখানে একটি গোলে অবদান (গোল অথবা অ্যাসিস্ট) রাখছেন, সেখানে রোনালদোর সময় লাগছে ১২১ মিনিট।
ইতিহাসের সর্বকালের সেরা আন্তর্জাতিক গোলদাতাদের তালিকায় এই দুই পরাশক্তি যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান ধরে রেখেছেন। এদের পেছনে আছেন ইরানের আলি দাই (১৪৮ ম্যাচে ১০৮ গোল), ভারতের সুনিল ছেত্রী (১৫৭ ম্যাচে ৯৫ গোল), বেলজিয়ামের রোমেলু লুকাকু (১২৬ ম্যাচে ৯০ গোল), মালয়েশিয়ার মোখতার দাহারি (১৪২ ম্যাচে ৮৯ গোল) এবং পোল্যান্ডের রবার্ট লেভানডভস্কি (১৬৭ ম্যাচে ৮৯ গোল)। তালিকায় পরবর্তী নামগুলো হলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলি মাবহুত (১১৫ ম্যাচে ৮৫ গোল), হাঙ্গেরি ও স্পেনের ফেরেন্স পুসকাস (8৯ ম্যাচে ৮৪ গোল), ব্রাজিলের নেইমার জুনিয়র (১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল) এবং জাম্বিয়ার গডফ্রে চিতালু (১১১ ম্যাচে ৭৯ গোল)।
সব হিসাব-নিকাশের বাইরে, পুরো ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার মূল সিংহাসনটি পাওয়ার জন্য এই দুই কিংবদন্তির লড়াই এখন চূড়ান্ত পর্বে রূপ নিয়েছে। গত আড়াই দশক ধরে ফুটবল দুনিয়া শাসন করা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ১,৩২৭টি ম্যাচে মোট ৯৭৫টি গোল এবং ২৬১টি অ্যাসিস্ট নিয়ে এই ঐতিহাসিক দৌড়ে সবার আগে দৌড়াচ্ছেন। তবে লিওনেল মেসিও খুব বেশি পিছিয়ে নেই; ১,১৫৮টি ম্যাচে ৯১৬টি গোল এবং ৪১৪টি চোখ ধাঁধানো অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনি রোনালদোর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন। দুজনের গোলের ব্যবধান এখন মাত্র ৫৯টি, যা তাদের ক্যারিয়ারের এই অন্তিম লগ্নে প্রতিটি ম্যাচকে রূপ দিচ্ছে এক একটি শ্বাসরুদ্ধকর উপাখ্যানে।