বিশ্বমঞ্চে দুই দশকের মহাকাব্য: ফিরে দেখা ৩৯ ছুঁইছুঁই মেসির ১৮ গোল
বয়স মাত্র এক দিন পরই পূর্ণ হবে ৩৯। আর তার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের ক্যারিয়ারের অনন্য এক বৃত্ত পূরণ করলেন লিওনেল মেসি। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে করা গোলটি কেবল আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এই তোলেনি, বরং বিশ্বমঞ্চে তাঁর গোলসংখ্যাকে নিয়ে গেছে এক অলৌকিক উচ্চতায়—১৮টি বিশ্বকাপ গোল। কিশোর বয়সের এক লম্বা চুলের তরুণ থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বজয়ী অধিনায়ক হয়ে ওঠার এই যাত্রাটি যেন রূপকথাকেও হার মানায়।
২০০৬ থেকে ২০২৬—বিগত ২০ বছরে বিশ্বমঞ্চে এলএম১০ এই অবিশ্বাস্য যাত্রার একটি সংক্ষিপ্ত কোলাজ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. এক প্রতিভার আত্মপ্রকাশ (২০০৬)
মাত্র ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল মেসির। জার্মানির সেই বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে ৬-০ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন ১৯ নম্বর জার্সি পরা সেই তরুণ।
২. গোলহীন ১০ নম্বর (২০১০)
ডিয়েগো ম্যারাডোনার অধীনে আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি গায়ে জড়িয়ে ততদিনে দলের অবিসংবাদিত চালিকাশক্তি মেসি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সেই বিশ্বকাপে দারুণ খেললেও এবং বারবার পোস্ট ও গোলরক্ষকের বাধায় আটকে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো গোলের দেখা পাননি তিনি।
৩. অধিনায়কের কাঁধে মারাকানার স্বপ্ন (২০১৪)
অধিনায়ক হিসেবে ব্রাজিল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে একাই টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন ফাইনাল পর্যন্ত। গ্রুপ পর্বে একের পর এক জাদুকরী গোল (বিশেষ করে ইরানের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই বাঁকানো শট) করে দলকে ফাইনালে তুললেও মারাকানায় জার্মানির কাছে ১-০ ব্যবধানে হারতে হয়। তবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জিতে নেন গোল্ডেন বল।
৪. বিপর্যয়ের মাঝে এক ঝলক আলো (২০১৮)
রাশিয়া বিশ্বকাপটি আর্জেন্টিনার জন্য ছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ার শঙ্কায় ভরা। তবে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে বাঁচা-মরার ম্যাচে মেসির সেই চোখধাঁধানো গোলটি ফুটবলপ্রেমীরা চিরকাল মনে রাখবে—উরু দিয়ে বল নিয়ন্ত্রণ করে আলতো ছোঁয়ায় ডান পায়ের সেই ফিনিশ দলটিকে নক-আউটে নিয়ে গিয়েছিল।
৫. কাতার ২০২২: পরম প্রাপ্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে ক্যারিয়ারের সেরা বিশ্বকাপ। গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফাইনালে জোড়া গোলসহ পুরো টুর্নামেন্টে মোট ৭টি গোল করেন তিনি। অবশেষে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পাশাপাশি ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো জেতেন গোল্ডেন বল।
৬. ২০২৬: অমরত্বের নতুন সংজ্ঞা
যখন অধিকাংশ ফুটবলার বুটজোড়া তুলে রাখেন বা আন্তর্জাতিক ফুটবলের তীব্র চাপ থেকে দূরে সরে যান, ঠিক ৩৯ বছর বয়সে এসে মেসি খেলছেন নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বিধ্বংসী ফর্মে। চলতি টুর্নামেন্টের মাত্র দুই ম্যাচেই ৫ গোল করে তিনি এখন বিশ্বকাপের ইতিহাসের এককভাবে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা।
"হ্যাপি আর্লি বার্থডে, লিও!" — গ্যালারি থেকে ধারাভাষ্যকার, সবার কণ্ঠেই এখন এই এক শুভেচ্ছা। ৩৯তম জন্মদিনের ঠিক দুদিন আগে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন নিজের করে নেওয়ার চেয়ে বড় উপহার আর কী-ই বা হতে পারে এই ফুটবল ঈশ্বরের জন্য।