২২ জুন ২০২৬, ১০:২০

‘গেগেনপ্রেসিং’ ফুটবল খেলা ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে বড় চ্যালেঞ্জে আর্জেন্টিনা

অস্ট্রিয়ার গেগেনপ্রেসিং ফুটবল   © সংগৃহীত

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ের ২১তম স্থানে থাকা অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আজ বাংলাদেশ সময় রাত ১১ টায় মাঠে নামছে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বহু বছর ধরে ইউরোপীয় দলের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার বড় ম্যাচের অভাব নিয়ে যে আলোচনা চলছিল, সেই জায়গায় লিওনেল স্কালোনির দলের সামনে এবারই প্রথম কোনো ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বড় পরীক্ষা। ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে হতে যাওয়া এই ম্যাচের ওপর আর্জেন্টিনা দলের গ্রুপ শীর্ষস্থানও এখন ঝুলছে। তবে মহাগুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের আগে নিজের দল গঠন সম্পূর্ণ গোপন রেখেছেন কোচ লিওনেল স্কালোনির।

শহরের কেন্দ্রজুড়ে এখন কেবলই আর্জেন্টিনার জার্সির ছড়াছড়ি। বার, রেস্তোরাঁ, জাতীয় দলের হোটেলের আশপাশের ফুটপাত—সব জায়গাতেই ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। ডালাসে শত শত ভক্ত দলকে হোটেলে স্বাগত জানিয়েছে। কাগজে-কলমে গ্রুপের বাকি দুই ম্যাচ এখনো বাকি থাকলেও বাস্তবে আর্জেন্টিনা ও অস্ট্রিয়া এই ম্যাচে ১৬ দলের পর্বে ওঠার চেয়ে অনেক বড় কিছুর জন্য লড়বে। প্রথম ম্যাচ জিতে দুই দলই নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে এবং গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছে। তাই টেবিলের অবস্থান এবং ফিফার টাইব্রেকার নিয়ম অনুযায়ী এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি। আজকের জয়ী দল আগেভাগেই গ্রুপ শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ফেলতে পারবে, যা পরবর্তী রাউন্ডে শক্তি বাঁচানো, খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেওয়া এবং নকআউট পর্বে বেশি সতেজভাবে নামার বড় সুবিধা দেবে।

অবশ্য দলের ভেতরের দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থকদের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ৩–০ ব্যবধানের জয় পেলেও মাঠের পারফরম্যান্সের তুলনায় ওই ফল অনেক বড় ছিল। বিশেষ করে প্রথমার্ধে আফ্রিকান দলটি গতি ও বলের দখলে আর্জেন্টিনাকে চরম চাপে ফেলেছিল এবং অফসাইডে তাদের একটি গোলও বাতিল হয়। তাই জয় পেলেও ওই ম্যাচ থেকে একটি বার্তা পরিষ্কার হয়েছে যে, বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচই সহজ নয়। আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপের পথে জার্মানির বিপক্ষে ২০১৯ সালের একটি প্রীতি ম্যাচ এবং ইতালির বিপক্ষে ফিনালিসিমায় ৩–০ গোলে জয় পেয়েছিল। এরপর ২০২৩ সাল থেকে ইউরোপের বিপক্ষে একমাত্র ম্যাচ ছিল আইসল্যান্ডের বিপক্ষে ৩–০ ব্যবধানের জয়। ফলে ইউরোপের শীর্ষ লিগে নিয়মিত খেলা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া শক্তিশালী অস্ট্রিয়া আর্জেন্টিনার জন্য এক কঠিন পরীক্ষা।

অস্ট্রিয়ার ২৬ জন খেলোয়াড়ই ইউরোপের বিভিন্ন নামী ক্লাবে খেলেন। এর মধ্যে ১৫ জন জার্মান বুন্দেসলিগায়, বাকিরা ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের লিগে খেলেন। দলটি খুবই আক্রমণাত্মক, দ্রুতগতির এবং বল পুনরুদ্ধারের পর মাঝমাঠের করিডোর দিয়ে দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাকে যায়। এই কৌশলের পেছনে আছেন তাদের বিখ্যাত কোচ রাল্ফ রাংনিক, যিনি আধুনিক জার্মান ফুটবলের ‘গেগেনপ্রেসিং’ বা হাই-প্রেসিং ফুটবল ধাঁচের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি। জার্গেন ক্লপ, থমাস টুখেল ও জুলিয়ান নাগেলসমানের মতো বিশ্বসেরা কোচরা এই রাংনিকের দর্শন থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। অস্ট্রিয়ার এই ‘গেগেনপ্রেসিং’ কৌশলের মূল নীতি হলো দুটি—

১।বল হারানোর ৮ সেকেন্ডের মধ্যে আবার তা পুনরুদ্ধার করতে হবে, না পারলে দলকে দ্রুত সংগঠিত রক্ষণে ফিরে যেতে হবে।
২।বল পুনরুদ্ধারের পর ১০ সেকেন্ডের মধ্যে শট নিতে হবে, যাতে প্রতিপক্ষের অসংগঠিত রক্ষণকে পুরোপুরি কুপোকাত করা যায়।

অস্ট্রিয়া বাছাইপর্বে প্রতিপক্ষকে গড়ে মাত্র ছয়টি পাস করার সুযোগ দিয়ে বল হারাতে বাধ্য করেছিল। দলটির আরেকটি বড় শক্তি হলো খেলোয়াড়দের শারীরিক গঠন ও উচ্চতা। তাদের শুরুর একাদশের গড় উচ্চতা প্রায় ১ মিটার ৮০ সেন্টিমিটার। ২ মিটার উচ্চতার সেন্টার ফরোয়ার্ড সাসা কালাজদিচ, ১.৯২ মিটার উচ্চতার মার্কো আর্নাউতোভিচ, ১.৮৮ মিটারের স্টেফান পচ, ১.৮৯ মিটারের ফিলিপ লিনহার্ট কিংবা ডেভিড আলাবা ও মার্সেল সাবিতজারের মতো তারকারা আকাশযুদ্ধে দারুণ পারদর্শী। বেঞ্চ থেকে নামা কেভিন ডানসো (১.৯০ মিটার), কার্নি চুকউএমেকাদের (১.৮৭ মিটার) উচ্চতাও আকাশযুদ্ধে বাড়তি সুবিধা দেয়। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তারা এই উচ্চ প্রেসিং বজায় রাখবে এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্সলাইন থেকে বল বের হওয়ার আগেই চাপ সৃষ্টি করবে। আক্রমণে তারা লম্বা ক্রস এবং দ্রুত লং বল ব্যবহার করে আক্রমণ সাজাবে। বিশেষ করে ডান দিক থেকে আসা লম্বা থ্রো বা ক্রসের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনাকে সতর্ক থাকতে হবে।

তবে অস্ট্রিয়ার রক্ষণভাগ অনেক সময় অসংগঠিত থাকে। তাদের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হয়। যদি আর্জেন্টিনা দ্রুত বল রিকভার করে সামনে পাস দিতে পারে, তবে এক পাসেই গোলের সুযোগ চলে আসবে। আবার কর্নার কিকের সময় অস্ট্রিয়া ম্যান ও জোনাল মার্কিংয়ের মিশ্রণ ব্যবহার করে। স্কালোনির দল সাধারণত কর্নার শর্ট করে খেলে সরাসরি ক্রস না দিয়ে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সকে নড়াচড়া করায়, যা আর্জেন্টিনার জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচের একাদশ এখনো নিশ্চিত করেননি স্কালোনি। রোববার অনুশীলনে তিনি বিভিন্ন কম্বিনেশন পরীক্ষা করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, ডান উরুর সমস্যার কারণে গনসালো মন্তিয়েল পুরো সপ্তাহ অনুশীলনে সীমিত থাকায় তার জায়গায় নাহুয়েল মলিনা মূল একাদশে ফিরবেন। মিডফিল্ডে একজন অতিরিক্ত মিডফিল্ডার হিসেবে এক্সেকিয়েল পালাসিওস বা লেয়ান্দ্রো পারেদেসকে রাখা হবে কি না, উইংয়ে জুলিয়ানো সিমিওনে নাকি নিকোলাস গঞ্জালেস খেলবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এছাড়া আক্রমণভাগে থিয়াগো আলমাদাকে রাখা কিংবা স্ট্রাইকার হিসেবে লাওতারো মার্তিনেস নাকি জুলিয়ান আলভারেজ খেলবেন, সেটিও গোপন রয়েছে। বিমান ধরার আগে আর্জেন্টিনা দল হোটেলে বসে স্পেনের প্রথমার্ধের খেলা দেখেছে এবং ডালাসে এসে উরুগুয়ে–কেপ ভার্দের ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধও উপভোগ করেছে।

মাইয়ামিতে হতে যাওয়া শেষ ১৬-র নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন দল খেলবে অন্য গ্রুপের রানার্সআপের বিপক্ষে, যেখানে বর্তমানে উরুগুয়ে অবস্থান করছে। আজ অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে লক্ষ্য পূরণ করা গেলে আর্জেন্টিনা পরবর্তী ম্যাচে মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে বিকল্প খেলোয়াড়দের সুযোগ দিতে পারবে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়ার জন্য ভালো খবর হলো, রিয়াল মাদ্রিদের ডিফেন্ডার ও দলের অধিনায়ক ডেভিড আলাবা এবং চোয়ালের হাড় ভাঙা আলেসান্দ্রো শোপফ অনুশীলনে ফিরেছেন এবং তাদের প্রথম একাদশে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে প্রতিপক্ষ যাই হোক না কেন, মেসি-বাহিনী অনেক দিন ধরেই নিজেদের খেলা উন্নত করার দিকেই সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। রোমাঞ্চকর এই ম্যাচটি সরাসরি দেখা যাবে বিটিভি, টি স্পোর্টস, সময় টিভি, টফি এবং বায়োস্কোপে।