এবার উরুগুয়েকেও রুখে দিল কেপ ভার্দে
বিশ্বকাপে রূপকথার মতো এক গল্প লিখে চলেছে কেপ ভার্দে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আফ্রিকার ছোট্ট দেশটি এবার স্পেনের পর দুবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়েকেও আটকে দিয়েছে। মায়ামি স্টেডিয়ামে রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে উরুগুয়ের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছে কেপ ভার্দে। এর ফলে বিশ্বকাপ অভিষেকে টানা দ্বিতীয় ম্যাচেও পয়েন্ট তুলে নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে দলটি।
পাঁচ লাখের কিছু বেশি জনসংখ্যার কেপ ভার্দে বিশ্বকাপ ইতিহাসের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম অংশগ্রহণকারী দেশ। অনেকেই ভেবেছিলেন, বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাওয়াই হবে তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন। কিন্তু মাঠে নেমে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু অংশ নিতে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেও এসেছে।
এর আগে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকাপ অভিষেকে প্রথম পয়েন্ট পেয়েছিল কেপ ভার্দে। তখন অনেকে সেটিকে কাকতালীয় ঘটনা বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু উরুগুয়ের বিপক্ষে তাদের পারফরম্যান্স প্রমাণ করেছে, সেটি কোনোভাবেই ভাগ্যের ফল ছিল না।
ম্যাচের ২১ মিনিটে ৩২ মিটার দূর থেকে নেওয়া সরাসরি ফ্রি-কিকে গোল করে কেপ ভার্দেকে এগিয়ে দেন কেভিন পিনা। বিশ্বকাপে এটি ছিল কেপ ভার্দের প্রথম গোল, আর সেই গোলেই পিছিয়ে পড়ে উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দল। একই সঙ্গে এটি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে দূরপাল্লার গোল।
গোলটির সঙ্গে আরও একটি ইতিহাস জড়িয়ে আছে। বিশ্বকাপে এর আগে কখনো সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে গোল হজম করেনি উরুগুয়ে। ফলে কেপ ভার্দের বিপক্ষে নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে তিক্ত এক রেকর্ডও যোগ হলো দক্ষিণ আমেরিকার দলটির।
পরিসংখ্যানবিদদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপ ইতিহাসে কেপ ভার্দের আগে মাত্র একটি দল তাদের প্রথম বিশ্বকাপ গোল সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে করেছিল। ১৯৩০ বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হয়ে সেই গোল করেছিলেন লুইস মন্টি। আর ১৯৬৬ সাল থেকে বিশ্বকাপের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ শুরুর পর কেপ ভার্দেই প্রথম দল, যারা নিজেদের প্রথম গোল করেছে সরাসরি ফ্রি-কিক থেকে।
গোল হজমের পর আক্রমণের ঝড় তোলে উরুগুয়ে। ধারাবাহিক চাপের ফল পায় তারা ৪৪ মিনিটে। পোস্টে লেগে ফিরে আসা বল হেডে জালে জড়িয়ে সমতা ফেরান মাক্সিমিলিয়ানো আরাউহো। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আগুস্তিন কানোবিও গোল করলে মনে হচ্ছিল, কেপ ভার্দের স্বপ্নযাত্রা হয়তো সেখানেই থেমে যাবে।
কিন্তু বিরতির পর আবারও ঘুরে দাঁড়ায় আফ্রিকার দলটি। উরুগুয়ের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফিফার ওয়েবসাইটকে কেভিন পিনা বলেছিলেন, ‘একবার মাঠে নামলে সবাই সমান। কার (জয়ের) চাওয়াটা বেশি, কারা সবকিছু নিংড়ে দিতে চায়, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করে।’
দ্বিতীয়ার্ধে ঠিক সেই মানসিকতাই দেখিয়েছে কেপ ভার্দে। আক্রমণ ও রক্ষণ—দুই ক্ষেত্রেই তারা দারুণ সংগঠিত ছিল। অন্যদিকে উরুগুয়ে ধীরে ধীরে ছন্দ হারাতে শুরু করে।
৬১ মিনিটে সেই সুযোগ কাজে লাগান বদলি নামা মিডফিল্ডার হেলিও ভারেলা। বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে উরুগুয়ের ডিফেন্ডার মাতিয়াস অলিভেরা ভুল করেন। গোলকিপার ফার্নান্দো মুসলেরাও তখন নিজের জায়গা থেকে অনেকটা এগিয়ে ছিলেন। সুযোগ বুঝে বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিখুঁত শটে গোল করেন ভারেলা। ইউরোপের বড় তারকা স্ট্রাইকারদের কাছেও এমন ফিনিশিং খুব পরিচিত দৃশ্য।
এরপর জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে উরুগুয়ে। ফেদেরিকো ভালভের্দের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়। তবে শুধু দুর্ভাগ্যকে দায় দেওয়ার সুযোগ নেই তাদের। কেপ ভার্দে পুরো ম্যাচজুড়েই সমানতালে লড়াই করেছে। এমনকি শেষ দিকে পাওয়া কয়েকটি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে ম্যাচ জিতেও যেতে পারত তারা।
ম্যাচের পরিসংখ্যানও কেপ ভার্দের সাহসী পারফরম্যান্সের সাক্ষ্য দেয়। উরুগুয়ে ১৭টি শট নিলেও লক্ষ্যে রাখতে পেরেছে মাত্র ২টি। কেপ ভার্দে ১২টি শট নিয়ে তার মধ্যে ৪টি লক্ষ্যে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দিয়ান গোলকিপার ভোজিনিয়াকে খুব বেশি পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়নি। বরং উরুগুয়ের অভিজ্ঞ গোলকিপার মুসলেরাকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করতে হয়েছে।
এই ড্রয়ের ফলে ‘এইচ’ গ্রুপের লড়াই আরও জমে উঠেছে। দুই ম্যাচে ৪ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে রয়েছে স্পেন। সমান ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে উরুগুয়ে। কেপ ভার্দেও দুই ম্যাচে ২ পয়েন্ট পেয়েছে, তবে গোল ব্যবধানে রয়েছে তিন নম্বরে। এক ম্যাচে ২ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে সৌদি আরব।
গ্রুপ পর্বে কেপ ভার্দের শেষ ম্যাচ সৌদি আরবের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে জিততে পারলেই নকআউট পর্বে জায়গা নিশ্চিত হবে তাদের। অন্যদিকে স্পেনের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে জিততেই হবে উরুগুয়েকে। কোনো ধরনের হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভর না করে পরের রাউন্ডে উঠতে এটিই তাদের একমাত্র পথ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক অঘটন দেখা গেছে। তবে স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে পয়েন্ট আদায় করে নেওয়ার কীর্তি নিঃসন্দেহে দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব। কেপ ভার্দে হয়তো এখনো কোনো ম্যাচ জেতেনি, কিন্তু পরপর দুই শক্তিশালী প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে যে লড়াই করেছে, সেটি অনেক জয়ের চেয়েও বড় অর্জন।