১৯ জুন ২০২৬, ১৪:৫৯

যে চিঠি ফুটবলবিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে

আইভরি কোস্টের তরুণ ফরোয়ার্ড ইয়ান ডিওমান্দ  © টিডিসি ছবি

আইভরি কোস্টের তরুণ ফরোয়ার্ড ইয়ান ডিওমান্দের লেখা এক আবেগঘন খোলা চিঠি ফুটবল দুনিয়াকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ছোট বোন রোকসানের স্মৃতিতে লেখা এই চিঠি শুধু ব্যক্তিগত শোকের গল্প নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের আবেগে গভীর ছাপ ফেলেছে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক পার্টিতে বিষমিশ্রিত পানীয় পান করে মারা যান রোকসান। সেই বোনের স্মৃতিকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতেই এই চিঠি লেখেন ১৯ বছর বয়সী আরবি লাইপজিগ তারকা ডিওমান্দে।

চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছে দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউনে। প্রকাশের পর থেকেই এটি ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রথম ছবিতেই দেখা যায় একটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের জার্সি, যার পেছনে কালো মার্কার দিয়ে হাতে লেখা ‘রোনালদো ৭’। ছোটবেলার অনুপ্রেরণা ছিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো—সেই ভালোবাসাই ফুটবলের প্রতি তার পথচলা শুরু করে।

আবেদনময় এই চিঠিতে ডিওমান্দে নিজের শৈশবের কঠিন জীবন তুলে ধরেছেন। আইভরি কোস্টের আবিদজানে একই ছাদের নিচে ২৫ জনের সঙ্গে বড় হওয়া, গভীর রাতে টেলিভিশনের শব্দ কমিয়ে লুকিয়ে ফুটবল দেখা—এসবই ছিল তার শুরুর জীবন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে ট্রায়াল এবং শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ ক্লাব লেগানেসে পেশাদার অভিষেক—সবকিছুই উঠে এসেছে তার লেখায়।

ঠিক সেই সময়েই নেমে আসে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। রোকসানের মৃত্যুর খবর আসে তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটির মাঝখানে।

ডিওমান্দে লিখেছেন, ‘তোমার কি মনে আছে, যখন আমি বোর্নমাউথে ট্রায়াল দিয়েছিলাম? চেলসি, রেঞ্জার্স, অলিম্পিয়াকোস, ক্রিস্টাল প্যালেসেও সুযোগ খুঁজেছিলাম। এমনকি এবেরেচি এজে ও মাইকেল ওলিসে এক অনুশীলনের পর এসে বলেছিল, ‘শোনো, তুমি সত্যিই অনেক ভালো খেলো।’ কিন্তু তারপরও কেউ আমাকে দলে নেয়নি। এমএলএসের দ্বিতীয় দলগুলোও আমাকে চায়নি। কেন চায়নি, সেটাও কেউ বলেনি। বড়রা সবকিছু সামলাত। তারা আমাকে ইউরোপের এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যেত, আর সবাই শুধু না বলত। একসময় আমার ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে গেল। মনে হলো স্বপ্ন শেষ। আমাকে আফ্রিকায় ফেরত পাঠানো হলো, আর আমরা একসঙ্গে কেঁদেছিলাম। কিন্তু তুমি কখনো বিশ্বাস হারাওনি।’

তিনি আরও লেখেন, ‘কয়েক সপ্তাহ পর আমি লেগানেসের সঙ্গে চুক্তি করলাম। তখন আমরা অন্যরকম আনন্দের কান্না কেঁদেছিলাম। তখনও আমার অনুভূতি ছিল। এখন কিছুই অনুভব করি না। মনে হয় আমি আর মানুষ নই। তুমি চলে যাওয়ার পর আমি ভেতর থেকে একেবারে শূন্য হয়ে গেছি।’

লেগানেসে অভিষেকের পরই আসে সেই ভয়াবহ ফোনকল, যা তার জীবন পুরোপুরি বদলে দেয়। রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে মাত্র ১৮ বছর বয়সে অভিষেকের মতো বড় মুহূর্তের মধ্যেই তার পৃথিবী ভেঙে পড়ে।

তিনি লিখেছেন, ‘যেদিন আমাকে বলা হয়েছিল তুমি আর নেই, সেদিন আমি কেঁদেও উঠতে পারিনি। আমি শুধু স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। লেগানেসের হয়ে অভিষেকের কয়েক সপ্তাহ পরের ঘটনা। ১৮ বছর বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে অভিষেক—এটা ছিল অবিশ্বাস্য। স্বপ্নপূরণের মুহূর্ত। কিন্তু মুহূর্তেই সেটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। আমার শহর থেকে একজন বারবার ফোন করছিল। আমি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেন এত ফোন করছে। শেষ পর্যন্ত ফোন ধরলাম। কোনো ভূমিকা ছাড়াই সে বলল, ‘তোমার বোন আর নেই।’ আমি বললাম, ‘কী? কী বলছ?’ তখন জানাল, ‘একটি পার্টিতে কেউ তার পানীয়তে কিছু মিশিয়ে দিয়েছিল। সে আর কখনো জেগে ওঠেনি। সে মারা গেছে।’ তখন তোমার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর।’

ফুটবল ক্যারিয়ারের দিক থেকেও দ্রুত এগিয়ে চলেছেন ডিওমান্দে। গত মৌসুমে আরবি লাইপজিগের হয়ে ৩৬ ম্যাচে ১৩ গোল ও ১০ অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রায় দুই কোটি ইউরোতে লেগানেস থেকে তাকে দলে নেয় জার্মান ক্লাবটি। বর্তমানে তার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১৩ কোটি ইউরোরও বেশি।

চিঠির শেষ অংশে ডিওমান্দে লেখেন, ‘আমি এটা লিখেছি কারণ আমি মুখে এসব বলতে পারি না। আমি লিখেছি কারণ আমি চাই তোমার স্মৃতি বেঁচে থাকুক। আমি নিশ্চিত করব পৃথিবীর সবাই তোমার নাম জানবে। ফুটবল মাঠে আমি যা কিছু করি, সব তোমার জন্য।’

সবশেষে তিনি যোগ করেন, ‘তুমি সবসময় বলতে, আমি একদিন ক্রিস্টিয়ানোর চেয়েও ভালো হতে পারব। যদি কোনোদিন তার সঙ্গে দেখা হয়, তোমার পক্ষ থেকে তাকে শুভেচ্ছা জানাব। তুমি যা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলে, আমি তা সত্যি করব—আমি কথা দিচ্ছি। যখন আমার নিজের একটি ভালো বুটও ছিল না, তখনও তুমি সবাইকে বলতে, ‘আমার ভাই একদিন বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হবে।’ আমি প্রমাণ করব তুমি ঠিক ছিলে। আর সেটা করতে গিয়ে যদি জীবনও দিতে হয়, তবুও চেষ্টা থামাব না। তোমার ভাই, ইয়ান।'