১৮ জুন ২০২৬, ১৪:৩২

ঘরের মাঠে আত্মবিশ্বাসী দক্ষিণ কোরিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত মেক্সিকো

দুই দলের তারকা ফুটবলার   © টিডিসি ফটো

বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যাচ্ছে দ্বিতীয় পর্বের লড়াই। গ্রুপ ‘এ’-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে শুক্রবার এস্তাদিও গুয়াদালাজহারায় (এস্তাদিও অ্যাক্রন) স্টেডিয়ামে সহ-আয়োজক মেক্সিকো মুখোমুখ হচ্ছে এশিয়ার পরাশক্তি দক্ষিণ কোরিয়া। বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকাল ৭টায় শুরু হতে যাওয়া এই ম্যাচটি দুই দলের জন্যই নকআউট পর্বের টিকিট নিশ্চিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ।

নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ কোরিয়া দুই দলই দুর্দান্ত জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করেছে। ফলে পূর্ণ পয়েন্টের লক্ষ্যে নামা এই দুই দলের লড়াই যে বেশ জমজমাট হবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। হাভিয়ের আগিরের অধীনে মেক্সিকো দল এখন রয়েছে দারুণ ফর্মে। প্রথম ম্যাচের জয় পেয়ে পাওয়া অত্মবিশ্বাস এই ম্যাচেও ধরে রাখতে চাইবে তারা। গত বৃহস্পতিবার জুলিয়ান কুইনোনসের প্রথমার্ধের চমৎকার গোল এবং দ্বিতীয়ার্ধে রাউল জিমেনেজের গোলে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে টুর্নামেন্টে শুভ সূচনা করে মেক্সিকো।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে নিজেদের প্রথম ম্যাচে এটিই মেক্সিকোর প্রথম জয়। এই বড় জয়ের সুবাদে তারা গ্রুপ ‘এ’-এর পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষস্থান দখল করেছে এবং শুক্রবার ঘরের মাঠে সেই আধিপত্য বজায় রাখতে তারা জানপ্রাণ দিয়ে লড়বে। তবে তাদের প্রতিপক্ষ দক্ষিণ কোরিয়া মোটেও সহজ দল নয়। যদিও নিজেদের শেষ ৯টি ম্যাচের মধ্যে ৭টি জয় ও ২টিতে ড্র করার আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামবে মেক্সিকো। তাছাড়া শেষ ৪টি ম্যাচের মধ্যে ৩টিতেই কোনো গোল না খাওয়ায় মেক্সিকান রক্ষণভাগ রয়েছে বেশ ফুরফুরে মেজাজে। তবে সেন্ট্রাল ব্যাক সিজার মন্তেস লাল কার্ড পাওয়ায় তার অনুপস্থিতি মেক্সিকোর রক্ষণভাগকে কতটা ভোগায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

অন্যদিকে, হং মিয়ুং-বোর দক্ষিণ কোরিয়াও গত সপ্তাহে চেক প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে ২-১ ব্যবধানের এক বীরত্বপূর্ণ জয় দিয়ে বিশ্বকাপে স্বপ্নের মতো পথচলা শুরু করেছে। ম্যাচের প্রায় এক ঘণ্টার মাথায় চেক প্রজাতন্ত্রের লাদিস্লাভ ক্রেয়চি গোল করে দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন। তবে এর মাত্র ৮ মিনিট পর ফেইনুর্দের তারকা হোয়াং ইন-বিওম গোল করে দক্ষিণ কোরিয়াকে সমতায় ফেরান এবং পরবর্তীতে ওহ হিয়ন-গিউর জয়সূচক গোলে চমৎকার এক অ্যাসিস্ট করেন।

প্রথম ম্যাচে এভাবে পিছিয়ে পড়েও দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর এই গল্প তাইগুক ওয়ারিয়র্সদের আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মেক্সিকো নিজেদের চেনা মাঠে গ্যালারিভর্তি দর্শকের বাড়তি সুবিধা পাবে জেনেও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের রুখে দিতে প্রস্তুত। এই জয়ের মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া তাদের টানা ৩ ম্যাচে জয়ের ধারা বজায় রেখেছে। সামগ্রিকভাবে শেষ ৮টি ম্যাচের মধ্যে তারা ৬টিতেই জিতেছে, তাই সমর্থকরা আশা করছেন এই সপ্তাহেও দল তাদের সেরা পারফরম্যান্সটাই উপহার দেবে। 

তবে পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৬ সালের পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়া আর মেক্সিকোকে হারাতে পারেনি। এর মধ্যে তারা মেক্সিকোর কাছে ৩ বার হেরেছে এবং ১ বার ড্র করেছে। দুই দলের শেষ দেখা হয়েছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে এবং সেই ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়। ওই ম্যাচে মেক্সিকোকে হার থেকে বাঁচাতে ৯৪ মিনিটে সান্তিয়াগো গিমেনেজের করা সমতাসূচক গোলের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ায় লোকোমো মস্কোর সেন্টার ব্যাক সিজার মন্তেসকে এই ম্যাচে পাচ্ছে না মেক্সিকো। ফলে রক্ষণভাগে জোহান ভাসকুয়েজের সাথে জুটি বাঁধতে পারেন দলের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অধিনায়ক এডসন আলভারেজ। এদিকে, প্রথম ম্যাচে প্রথম গোল করা লেফট-উইঙ্গার জুলিয়ান কুইনোনস চোটের কারণে ‘মাঠ ছাড়ার অনুরোধ করেছিলেন’ এবং ম্যাচের শেষের দিকে তাকে ‘খুঁড়িয়ে হাঁটতে’ দেখা গেছে বলে জানান কোচ আগিরে। তবে আল-কাদিসিয়াহর এই তারকাকে এই সপ্তাহে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে, যদিও তাকে নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে। কোনো কারণে তিনি খেলতে না পারলে উইং সামলানোর জন্য আলেকজিস ভেগা প্রস্তুত থাকবেন।

দক্ষিণ কোরিয়া শিবিরেও কিছুটা চোটের হাওয়া লেগেছে। স্টোক সিটির অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার বায়ে জুন-হো গোড়ালির চোট থেকে সেরে উঠে মাত্র কিছুদিন আগে অনুশীলনে ফিরেছেন, তাই তাকে হয়তো এই ম্যাচে দেখা যাবে না। একইভাবে সেন্টার ব্যাক কিম টে-হিয়নও গোড়ালির চোট কাটিয়ে দলের সাথে অনুশীলনে অংশ নিচ্ছেন, তবে শুক্রবার তার শুরুর একাদশে থাকার সম্ভাবনা কম। তাই রক্ষণভাগের তিন জনের বাঁ-পাশে কিম মিন-জে এবং লি হান-বিওমের সাথে লি গি-হিউকই খেলা চালিয়ে যাবেন।

প্রথম ম্যাচে জয়ের দেখা পাওয়ায় দুই দলের ওপর থেকেই এখন মানসিক চাপ অনেকটাই কমে গেছে। নকআউট পর্বে পা রাখার জন্য এখন তাদের প্রয়োজন মাত্র ১টি পয়েন্ট। তবে এক ম্যাচ বাকি রেখেই পরের রাউন্ড এবং গ্রুপের শীর্ষস্থান নিশ্চিত করার এই বড় সুযোগটি কোনো দলই হাতছাড়া করতে চাইবে না। তিন পয়েন্ট পাওয়ার পাশাপাশি যদি চেক প্রজাতন্ত্র জিততে না পারে, তবে মেক্সিকো গ্রুপ সেরা হওয়া নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার গ্রুপ সেরা হতে হলে নিজেদের জয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকার পয়েন্ট হারানোর প্রার্থনা করতে হবে।

কাগজে-কলমে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান মাত্র ১১ ধাপ। তাই শুক্রবার মাঠের লড়াইটা যে বেশ উন্মুক্ত ও আক্রমণাত্মক হবে, তা নিশ্চিত। এস্তাদিও অ্যাক্রনের গ্যালারিতে যখন সমর্থকরা গর্জে উঠবেন, তখন দুই দলই হাই-প্রেসিং ফুটবলের ঝড় তুলতে চাইবে। মেক্সিকোকে ঘরের মাঠের সুবিধার কারণে কিছুটা এগিয়ে রাখা হলেও, দক্ষিণ কোরিয়াও তাদের টেকনিক্যাল ফুটবল দিয়ে কড়া জবাব দিতে প্রস্তুত। তবে মেক্সিকোর টানা আক্রমণের মুখে দক্ষিণ কোরিয়ার রক্ষণভাগ কতটা সামলাতে পারে, সেটাই বড় প্রশ্ন। বিশেষ করে, গত ম্যাচে চেক প্রজাতন্ত্রের সেট-পিস ঠেকাতে তাইগুক ওয়ারিয়র্সরা বেশ হিমশিম খেয়েছিল। মেক্সিকো দলে রাউল জিমেনেজের মতো বেশ কয়েকজন লম্বা ও শারীরিক দিক থেকে শক্তিশালী ফুটবলার থাকায় দক্ষিণ কোরিয়া আবারও একই সমস্যায় পড়তে পারে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে হেডে গোল করা জিমেনেজ দক্ষিণ কোরিয়ার ডিফেন্সের এই দুর্বলতার ফায়দা তুলতে মুখিয়ে থাকবেন।

হাভিয়ের আগিরের দল এখন উড়ন্ত ফর্মে রয়েছে। এটি ছিল তাদের টানা চতুর্থ জয়, যেখানে তারা ১০টি গোল করার বিপরীতে গোল খেয়েছে মাত্র ১টি। ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে মেক্সিকো অপরাজিত রয়েছে, যেখানে শেষ ৯টি ম্যাচের মধ্যে কেবল বেলজিয়াম এবং পর্তুগালের সাথে ম্যাচ দুটি ড্র হয়েছিল, বাকি সবগুলোতেই তারা মাঠ ছেড়েছে জয়ের হাসি নিয়ে। ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ম্যাচে মেক্সিকো ২-১ ব্যবধানে জয় পেতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার কারণে মন্তেসের অনুপস্থিতিতে মেক্সিকোকে তাদের রক্ষণভাগে অন্তত একটি পরিবর্তন করতে হবে। আলভারেজ ডিফেন্সে নেমে এলে এটাই হতে পারে সহ-আয়োজকদের একমাত্র পরিবর্তন। চোটের কিছুটা শঙ্কা থাকলেও কুইনোনস লেফট উইংয়েই শুরু করতে পারেন। জিমেনেজ, ব্রায়ান গুতিয়ারেজ এবং রবার্তো আলভারাডো— সবাই তাদের গত সপ্তাহের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ধরে রাখতে চাইবেন।

দুই দলের সম্ভাব্য শুরুর একাদশ
মেক্সিকোর একাদশ (৪-১-৪-১):

রঞ্জেল; রেয়েস, আলভারেজ, ভাসকুয়েজ, গ্যালার্দো; লিরা; আলভারাডো, গুতিয়ারেজ, ফিদালগো, কুইনোনস; জিমেনেজ।

দক্ষিণ কোরিয়ার একাদশ (৩-৪-২-১):

এস কিম; এইচ লি, এম কিম, জি লি; সিওল, আই হোয়াং, পাইক, টি লি; কে লি, জে লি; সন।