ডেভিড বনাম গোলিয়াথ: কেপ ভার্দের অতিমানবীয় প্রাচীরে থমকে গেল ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন
বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম বড় এক মহাকাব্যিক রূপকথার জন্ম দিল পুঁচকে কেপ ভার্দে। মাঠের লড়াইয়ে বিশ্ব র্যাঙ্কিং বা শক্তির ব্যবধান যে কেবলই কাগজের হিসাব, তা আরেকবার প্রমাণ হলো। টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট এবং বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে ইতিহাস গড়েছে আফ্রিকার এই দ্বীপরাষ্ট্রটি। স্পেনের মতো পরাশক্তিকে এভাবে রুখে দেওয়াটা মাত্র সাড়ে ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দের অর্থাৎ বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশটির জন্য মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের মতোই এক অবিশ্বাস্য অর্জন।
ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই কেপ ভার্দের ফুটবলাররা যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে মাঠের ঘাসে হাঁটু গেড়ে বসছিলেন, তখন গ্যালারিতে উপস্থিত ফুটবল রোমান্টিকরা যেন এক রূপকথার সাক্ষী হলেন। ম্যাচের মূল পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে বোঝা যাবে, পুরো ৯০ মিনিট জুড়ে বলের দখল এবং আক্রমণের দিক থেকে একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল স্পেনের। তারা পুরো ম্যাচে ৭৪ শতাংশ বলের দখল রেখেছিল এবং রেকর্ড ৭৬৪টি পাস খেলেছিল, এর মধ্যে নিখুঁততার হার ৯২ শতাংশ। স্প্যানিশ আক্রমণভাগ একের পর এক ঢেউ তুললেও কেপ ভার্দের জমাট রক্ষণভাগ ভাঙতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
স্পেন পুরো ম্যাচে যেখানে ২৩টি শট নেয়, এর মধ্যে ৮টিই ছিল অন-টার্গেট শট, সেখানে কেপ ভার্দে মাত্র একবারই স্পেনের গোলমুখে শট নিতে পেরেছিল। স্প্যানিশদের কর্নার পাওয়ার সংখ্যাও ছিল ১১টি। কিন্তু এই আকাশছোঁয়া চাপের মুখেও কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ কতটা মাথা ঠান্ডা রেখে ডিফেন্স করেছে, তা বোঝা যায় মাত্র একটি ফাউল করার রেকর্ড থেকে। স্পেনের একের পর এক আক্রমণকে তারা কোনো রকম ফাউল বা পেনাল্টির সুযোগ না দিয়ে যেভাবে নসাৎ করেছে, তা এক কথায় ছিল অবিশ্বাস্য। অন্যদিকে ১১ বার ফাউল করেছে স্প্যানিশরা। যদিও দুই দলেরই একজন করে ফুটবলার হলুদ কার্ড দেখেছেন।
এই ঐতিহাসিক ড্রয়ের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় নায়ক দলটির ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা, তার আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস। পর্তুগিজ ভাষায় তার এই ডাকনামের অর্থ "ছোট কণ্ঠস্বর" হলেও, মাঠের পারফরম্যান্সে তার হুঙ্কার ছিল আকাশচুম্বী। প্রথমার্ধে স্পেনের একাধিক হাই-ভোল্টেজ ক্লোজ-রেঞ্জ শট যেভাবে তিনি অতিমানবীয় দক্ষতায় ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা স্প্যানিশ শিবিরকে শুরুতেই মানসিকভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেয়।
১৯৮৬ সালে জন্ম নেওয়া এই গোলকিপার ২০১২ সাল থেকে জাতীয় দলের পোস্ট আগলে রাখছেন। দেশের জার্সি গায়ে ৮১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার বিশাল অভিজ্ঞতা থাকলেও ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে এসে এই প্রথম বিশ্বমঞ্চে খেলার সুযোগ পান তিনি। ক্লাব ফুটবলেও এক যাযাবর এই গোলকিপার বর্তমানে খেলছেন পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের দল শ্যাভেসে। স্পেনের মতো বিশ্বসেরা আক্রমণভাগকে রুখে দিয়ে ভোজিনহা প্রমাণ করলেন যে, বয়সটা কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র।
ভোজিনহা যদি প্রথমার্ধের নায়ক হন, তবে দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের সামনে চীনের প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ডিফেন্ডার পিকো লোপেস, ম্যাচসেরার পুরস্কারও জিতেছেন তিনি। পুরো ম্যাচে শ্যামরক রোভার্সের এই সেন্টার-ব্যাক একাই ১৫টি রক্ষণাত্মক অবদান রাখেন, এর মধ্যে ১০টি ক্লিয়ারেন্স ও ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক ছিল। তার সাথে ডিফেন্ডার দিনেই বোর্গেসও জীবনের সেরা ম্যাচটি খেলে স্পেনের ফরোয়ার্ডদের বোতলবন্দী করে রাখেন।
অন্য দিকে, এই ম্যাচের পর স্পেনের হেড কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন। প্রথম একাদশ সাজানোর ক্ষেত্রেই তিনি চরম ভুল এবং কেপ ভার্দেকে হালকাভাবে নেওয়ার খেসারত দিয়েছেন। বর্তমান বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ও গতিময় উইঙ্গার জুটি লামিন ইয়ামাল এবং নিকো উইলিয়ামসকে শুরুর একাদশে না রেখে সাইডবেঞ্চে বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত কাউকেই স্বস্তি দেয়নি।
ম্যাচের ৭০ মিনিট পার হওয়ার পর যখন এই দুই উইঙ্গারকে মাঠে নামানো হয়, ততক্ষণে কেপ ভার্দে নিজেদের রক্ষণভাগকে পুরোপুরি গুছিয়ে নিয়েছে। ইয়ামাল ডান প্রান্তে নেমে বেশ কিছু দারুণ সুযোগ তৈরি করলেও, প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। চোট কাটিয়ে ফেরা গাভিকে মাঠে নামানো কিংবা দানি ওলমোকে নামাতে বড্ড দেরি করার কৌশলগত ভুলগুলো স্পেনের আক্রমণকে আরও ধীরগতির করে দিয়েছিল।
এই ড্রয়ের ফলে স্পেনের বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হলেও, আসরের হট ফেভারিট তকমাটা প্রথম ম্যাচেই চিন্তার কারণ হয়ে দাড়াল। তবে এই ম্যাচটি আবারও প্রমাণ করল, ফুটবল কোনো কাগজের হিসাব নয়, ফুটবল খেলা হয় মন থেকে। ৪৮ দলের এই বর্ধিত বিশ্বকাপের নাটকীয়তা যে বিন্দুমাত্র কমেনি, কেপ ভার্দের এই এক পয়েন্ট যেন তারই সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।