১৪ জুন ২০২৬, ১৯:৪৬

যে কারণে ব্রাজিলের প্রতিদ্বন্দী হাইতির জার্সি নিষিদ্ধ করল ফিফা 

বিতর্কে পাল্টে গেল হাইতর জার্সি  © সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপের চলতি আসরের খেলোয়াড়দের অফিশিয়াল পোর্ট্রেট বা ছবিগুলো প্রকাশ পাওয়ার পর এক অদ্ভুত বিতর্ক ও কাণ্ড নজরে এসেছে ফুটবলপ্রেমীদের। সাধারণত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর খেলোয়াড়রা নিজ নিজ দেশের জার্সি পরে গম্ভীর বা হাসিমুখে পোজ দেন (যেমন এবারের পোর্ট্রেটে সুইডেনের ম্যানেজার গ্রাহাম পটারকে একটি কাউবয় হ্যাট পরে পোজ দিতে দেখা গেছে)। কিন্তু গত মঙ্গলবার রাতে ছবিগুলো প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় চমক ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে হাইতির খেলোয়াড়দের জার্সি নিয়ে। ছবিতে তাদের গায়ে যে জার্সিটি দেখা গেছে, তা কয়েক মাস আগে উন্মোচিত করা এবং প্রীতি ম্যাচগুলোতে তাদের পরা জার্সির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোর্ট্রেটে হাইতির খেলোয়াড়দের পরনে ছিল সাধারণ ডিজাইনের নীল রঙের হোম জার্সি, যার লাল কলার এবং সামান্য কিছু রঙের ছোঁয়া ছাড়া আর কোনো বিশেষ নকশা ছিল না। অথচ, তাদের যে জার্সিটি পরার কথা ছিল, তার নকশাটি ছিল দারুণ আকর্ষণীয়, ঐতিহাসিক এবং অর্থবহ। কলম্বিয়ান ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান সায়েতার ডিজাইন করা সেই মূল জার্সিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল হাইতিয়ান বিপ্লবের এক গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক চিত্র, যেখানে প্রাক্তন ক্রীতদাস জঁ-জ্যাক দেসালিনের নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামীরা ফরাসি উপনিবেশবাদীদের পরাস্ত করেছিলেন। 

১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধে একদল মুক্তিকামী মানুষকে লাল ও নীল রঙের একটি ছিন্নভিন্ন পতাকা ওড়াতে দেখা যায়—এর মাত্র কয়েক মাস পরেই ১৮০৪ সালের ১ জানুয়ারি হাইতি নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। ইতিহাসে এটিকে একমাত্র সফল ক্রীতদাস বিদ্রোহ মনে করা হয়, যেখানে ক্রীতদাসেরা তাদের শাসকদের উৎখাত করে নিজেরাই দেশ শাসন করেছিল।

হাইতির হোম, অ্যাওয়ে এবং থার্ড—তিনটি জার্সিতেই এই একই ঐতিহাসিক নকশা ব্যবহার করা হয়েছিল। জার্সিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ সাড়ম্বরে উন্মোচন করে বলা হয়েছিল, এটি কেবল একটি জার্সি নয়; এটি হাইতির মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। প্রথম চালানের সব জার্সি মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিক্রিও হয়ে যায়। ৫২ বছর পর হাইতির প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলার আবেগ এবং ইতিহাসকে ধারণ করার এই অনুভূতি সবাই বেশ ইতিবাচকভাবে নিয়েছিল। পেরু এবং নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচগুলোতে দলটিকে এই ঐতিহাসিক নকশার জার্সি পরেই খেলতে দেখা যায়। কিন্তু গত মঙ্গলবার হঠাৎ করেই জার্সিটি উধাও হয়ে যায় এবং তার জায়গায় আসে অতি সাধারণ ডিজাইনের নতুন জার্সি।

পরে রাতে সায়েতার পক্ষ থেকে ইনস্টাগ্রামে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, সায়েতা যে চূড়ান্ত নকশা উপস্থাপন করেছিল, তা হাইতির ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে প্রতিদিন অবদান রাখা নারী-পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য করা হয়েছিল, কোনো রাজনৈতিক বিবৃতির উদ্দেশে নয়। তবে পর্যালোচনা প্রক্রিয়ার সময় ফিফা মনে করেছে যে, এই জার্সির কিছু ভিজ্যুয়াল এলিমেন্ট বা দৃশ্যমান উপাদান ফিফার কিটসংক্রান্ত নিয়মের অধীনে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। ফলে তারা নকশাটি পরিবর্তনের অনুরোধ জানায়। সায়েতা এই প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে ফিফার চূড়ান্ত নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেছে।

ফিফা দাবি করেছে, এটি শেষ মুহূর্তের কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। তারা কয়েক সপ্তাহ আগেই সায়েতা এবং হাইতি ফুটবল ফেডারেশনকে এই সমস্যার কথা জানিয়েছিল এবং উভয় পক্ষই বিতর্কিত ছবিটি সরাতে সম্মত হয়েছিল। তবে বুধবার দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া হাইতি ফুটবল ফেডারেশনের এক মুখপাত্রের বক্তব্য থেকে জানা যায়, সবাই এই পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত ছিলেন না। মুখপাত্র বলেন, ‘ভুল ব্যাখ্যার কারণে ফিফা কর্মকর্তারা আমাদের ফেডারেশনকে ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বীরদের পতাকা ওড়ানোর ছবিটি জার্সি থেকে বাদ দিতে বলেন। ভের্তিয়েরেস হলো আমাদের স্বাধীনতার শেষ যুদ্ধক্ষেত্র, যা ১৮০৩ সালের ১৮ নভেম্বর সংঘটিত হয়েছিল। কী অদ্ভুত কাকতালীয় বিষয়, ২০২৩ সালের ১৮ নভেম্বরই হাইতি দল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল!’

ফিফার দৃষ্টিকোণ থেকে এই নিয়মের ব্যাখ্যা বেশ সোজাসাপ্টা। ২০২৬ বিশ্বকাপের নিয়মের ২৮.১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, খেলা চলাকালীন, খেলার আগে বা পরে কোনো দলের খেলোয়াড় বা কর্মকর্তা তাঁদের জার্সি, পোশাক বা অন্য কোনো সরঞ্জামে কোনো ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত বার্তা কিংবা স্লোগান প্রদর্শন করতে পারবেন না। 

সহজ কথায়, পটভূমি বিবেচনা না করলে যেকোনো বিপ্লবের চিত্রই একটি রাজনৈতিক বিবৃতি। আর যদি একটু বাড়িয়ে বলা হয়, এই জার্সিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ফ্রান্সের বিরুদ্ধে এক বিপ্লবের গল্প, অথচ চলতি বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট পর্বেই হাইতিকে হয়তো ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ফলে তাত্ত্বিকভাবে এটি একটি রাজনৈতিক জটিলতা বা প্রতিপক্ষকে অসম্মান করার কারণ হতে পারত।

এখন প্রশ্ন হলো, আজ থেকে ২২০ বছর আগের একটি দাসপ্রথাবিরোধী এবং উপনিবেশবাদকে হটিয়ে দেওয়ার লড়াইয়ের একটি ঐতিহাসিক প্রতীকী ছবি নিয়ে কার আপত্তি থাকতে পারে? ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, হাইতির ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ও 'দ্য ফার্স্ট অ্যান্ড লাস্ট কিং অব হাইতি' বইয়ের লেখক মারলেন ডট এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি ভাবছি ফিফার যেসব কর্মকর্তা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা আসলে ভের্তিয়েরেসের যুদ্ধ সম্পর্কে কতটা জানেন! স্বয়ং ফরাসিদেরও এই ইতিহাস নিয়ে কোনো আপত্তি নেই। গত বছর প্যারিসের 'পালে দো টোকিও'তে হাইতিয়ান বিপ্লবের অন্যতম নায়ক অঁরি ক্রিস্তোফের ওপর একাধিক প্রদর্শনী হয়েছে। ফরাসিরাই যেখানে আপত্তি করছে না, সেখানে অন্য কার খারাপ লাগবে?’

সমালোচকরা মনে করেন, ফিফার এই ধরনের কঠোর এবং অন্ধ নিয়ম বাস্তবতার পরিপন্থী। কারণ এই বিশ্বকাপেই এমন অনেক প্রতীক রয়েছে যা সরাসরি রাজনৈতিক বা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ রয়েছে। যেমন ইরানের জাতীয় পতাকা, যেখানে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর একটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতীক যুক্ত করা হয়। ফিফার পক্ষে কোনো দেশের জাতীয় পতাকা নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়, তবে কঠোর নিয়মের মারপ্যাঁচে এটিও এক অর্থে ফিফার নিয়মকে লঙ্ঘন করে। এমন ঘটনা ক্রীড়াঙ্গনে এবারই প্রথম নয়। 

চলতি বছর শীতকালীন অলিম্পিকে হাইতির স্কিয়িং দলের পোশাকে বিপ্লবী নেতা তুসাঁ লুভারতুনের ঘোড়ায় চড়া ছবি শেষ মুহূর্তে বাতিল করতে হয়েছিল, যার ফলে স্কিয়ারদের শুধু একটি ঘোড়ার ছবি সংবলিত হাস্যকর ডিজাইনের পোশাক পরে অংশ নিতে হয়। ২০২০ ইউরো কাপে ইউক্রেনের জার্সিতে দেশটির মানচিত্র নিয়ে আপত্তি উঠেছিল, যেখানে রাশিয়া কর্তৃক দখল করা 'ক্রিমিয়া' অংশটিকে ইউক্রেনের মানচিত্রে রাখা হয়েছিল।