১৪ জুন ২০২৬, ১৯:৪৫

ব্রাজিলকে নাচিয়ে চার ইউরোপীয় জায়ান্টের নজর কাড়লেন মরক্কোর ১৮ বছরের বিস্ময় বালক আইয়ুব বুয়াদি

আইয়ুব বুয়াদি  © সংগৃহীত

ফুটবল মাঠে একজন সাধারণ মিডফিল্ডারের সাথে বিশ্বমানের ‘মেট্রোনোম’দের পার্থক্য গড়ে দেয় একটি দৃশ্য। চাপের মুখে মাথা উঁচু করে পিচ জুড়ে বল চালানোর ক্ষমতা। এই ক্ষমতার জন্য প্রয়োজন নিখুঁত টেকনিক, অসম্ভব কৌশলগত বুদ্ধিমত্তা আর আকাশচুম্বী আত্মবিশ্বাস। বিশ্বকাপের হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের বিপক্ষে ঠিক এই জাদুটাই দেখালেন মরক্কোর ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক আইয়ুব বুয়াদি। 

বিশ্বমঞ্চে নিজের অভিষেক ম্যাচ, প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। সাধারণ কোনো তরুণের যেখানে স্নায়ুচাপে ভেঙে পড়ার কথা, সেখানে ফরাসি ক্লাব লিলের এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার খেললেন এক পরিণত মাঝমাঠের সেনাপতির মতো। মাঝমাঠ থেকে ব্রাজিলের তীব্র চাপ একাই বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে তিনি বল টেনে ওপরে উঠলেন, তা শুধু মরক্কোকেই স্বস্তি দেয়নি, মন্ত্রমুগ্ধ করেছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে।

মাঝমাঠের নতুন 'ডিপ-লাইং প্লে-মেকার'

৬ ফুট ১ ইঞ্চির দীর্ঘদেহী এই ফুটবলার মূলত একজন 'ডিপ-লাইং প্লে-মেকার' বা 'সিঙ্গেল পিভট' হিসেবে খেলেন। আধুনিক ফুটবলের পরিভাষায় তাকে বলা হচ্ছে 'প্রেস-রেজিস্ট্যান্ট', অর্থাৎ প্রতিপক্ষের ঘোরতর চাপের মুখেও যিনি বলের নিয়ন্ত্রণ হারান না। দুই পায়েই সমান দক্ষ হওয়ায় বুয়াদিকে মাঝমাঠে আটকে রাখা প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। লম্বা পদক্ষেপে বল পায়ে যখন তিনি প্রতিপক্ষের প্রথম লাইনের বাধা ভেঙে মাঝমাঠে বা ফাইনাল থার্ডে প্রবেশ করেন, তখন তাকে থামানো প্রায় অসম্ভব।

রক্ষণাত্মক দেয়াল ও ফুটবলীয় পরিপক্বতা

ব্রাজিলের বিপক্ষে বুয়াদির আরেকটি নজরকাড়া দিক ছিল তার রক্ষণাত্মক কর্মদক্ষতা। নিজের ডি-বক্সের ভেতরেও যেভাবে তিনি ঠান্ডা মাথায় নিখুঁত ট্যাকল করেছেন, তা এক কথায় অসাধারণ। শারীরিকভাবে কিছুটা হালকা গড়নের হলেও, তার মূল শক্তি লুকিয়ে আছে তার ফুটবলীয় মগজে।

তিনি মাঠের লড়াইয়ে অতিরিক্ত আগ্রাসী ডিফেন্ডিংয়ের চেয়ে দূরদর্শী রক্ষণভাগ সামলাতেই বেশি বিশ্বাসী। প্রতিপক্ষ পাস দেওয়ার আগেই নিজের পজিশন ঠিক করে ফেলা এবং লম্বা পায়ের ছোঁয়ায় বলের গতিপথ রোধ করায় তিনি দারুণ পটু। একই সাথে বক্স-টু-বক্স মিডফিল্ডার হিসেবে পুরো মাঠ জুড়ে দৌড়ানোর সামর্থ্য তার রয়েছে।

ডেক্লান রাইস ও কামাভিঙ্গার ছায়া

বুয়াদির খেলার শৈলী ইতিমিধ্যেই ফুটবল পণ্ডিতদের বাধ্য করেছে তাকে ইউরোপের শীর্ষ তারকাদের সাথে তুলনা করতে। লম্বা গড়ন, নিখুঁত ট্যাকলিং আর মাঝমাঠে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতার কারণে অনেকেই তার মধ্যে আর্সেনালের ডেক্লান রাইসের ছায়া দেখছেন। আবার চাপের মুখে দারুণ গতিবৃদ্ধি এবং রক্ষণভেদী ড্রিবলিংয়ে লাইন ব্রেক করার ক্ষমতার কারণে তাকে তুলনা করা হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদের তরুণ তুর্কি এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার সাথে।

ট্রান্সফার মার্কেটে ঝড়: লড়ছে ইউরোপের চার জায়ান্ট

বিশ্বকাপের আগেই ট্রান্সফার মার্কেটে বুয়াদির আনুমানিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছিল ৫০ মিলিয়ন ইউরো। তবে তার বর্তমান ক্লাব লিলি এখনই তাকে এত সহজে ছাড়তে নারাজ। ফরাসি ক্লাবটি এই তরুণের জন্য ইতিমধ্যেই ৬০ থেকে ৭০ মিলিয়ন ইউরো (৫০ থেকে ৫৮ মিলিয়ন পাউন্ড) দাবি করে আসছিল।
তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে এই চোখ ধাঁধানো পারফরম্যান্সের পর ফুটবল বোদ্ধাদের ধারণা, বিশ্বকাপ শেষ হতে হতে তার প্রাইস ট্যাগ সমস্ত রেকর্ড ভেঙে ৮০ মিলিয়ন ইউরো বা তারও বেশি ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ইতিমধ্যেই ইউরোপের দলবদল বাজারে তাকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে জায়ান্টদের কাড়াকাড়ি। আর্সেনাল, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ এবং লিভারপুলের মতো শীর্ষ ক্লাবগুলো এই উদীয়মান তারকাকে দলে ভেড়াতে অফিশিয়ালি আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ফুটবলে পা রেখেই যেভাবে আলো ছড়ালেন আইয়ুব বুয়াদি, তাতে এটা বলাই বাহুল্য যে বিশ্বফুটবল এক নতুন সুপারস্টারের জন্ম দেখল।