১৩ জুন ২০২৬, ১০:০৮

ব্রাজিলের হেক্সা মিশনের শুরুতেই মরক্কো চ্যালেঞ্জ: প্রিভিউ, প্রেডিকশন এবং সম্ভাব্য একাদশ

ব্রাজিল- মরক্কো ম্যাচ   © টিডিসি ফটো

ষষ্ঠ বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের মিশন শুরু করতে যাচ্ছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। গ্রুপ ‘সি’-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত এই ম্যাচে সেলেসাওদের প্রতিপক্ষ আফ্রিকান জায়ান্ট মরক্কো। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির বিখ্যাত মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল ভোর ৪টায় শীর্ষ র‍্যাংকিংয়ের অন্যতম এই দুই দলের হাইভোল্টেজ লড়াই শুরু হবে। গ্রুপ পর্বের অন্যতম সেরা ও রোমাঞ্চকর এই ম্যাচটির দিকে এখন তাকিয়ে আছে গোটা ফুটবল বিশ্ব।

বিশ্বকাপের সাথে ব্রাজিলের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরেই খেলেছে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন সেলেসাওরা। তবে ১৯৫০ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তারা সবচেয়ে দীর্ঘ (২৪ বছর) শিরোপা খরায় ভুগছে। কাকতালীয়ভাবে, ব্রাজিল সর্বশেষ ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে তাদের ২৪ বছরের এই শিরোপা খরা ভেঙেছিল, আর সেবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই টুর্নামেন্টটি আয়োজন করেছিল।

ব্রাজিলিয়ানরা এবারই প্রথম দলের দায়িত্ব তুলে দিয়েছে একজন বিদেশি কোচের হাতে। অভিজ্ঞ ইতালীয় কোচ কার্লো আনচেলত্তি এই গ্রীষ্মে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাছাইপর্বে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হওয়ায় দেশের মাটিতে সমর্থকদের প্রত্যাশা কিছুটা কম ছিল। তবে এখন মূল খেলা শুরু হয়ে যাওয়ায় ব্রাজিলিয়ানরা আবারও আশায় বুক বাঁধছে। তাদের দেশ ফুটবলের শীর্ষস্থানে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

ব্রাজিলের জন্য উদ্বোধনী ম্যাচটি মোটেও সহজ হবে না। কারণ কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে সেমিফাইনালে উঠেছিল মরক্কো। এরপর থেকে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, এমনকি এই বছরের শুরুতে বেশ অদ্ভুত পরিস্থিতিতে আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের শিরোপাও জিতেছে তারা।

মরক্কোর এই অবিশ্বাস্য উত্থানের পেছনে আংশিক অবদান রাখা ম্যানেজার ওয়ালিদ রেগ্রাগুই আর দলটির দায়িত্বে নেই। বিশ্বকাপ শুরুর তিন মাস আগে তিনি কোচের পদ থেকে ইস্তফা দেন। মরক্কো দল এখন মোহামেদ ওয়াহবির অধীনে খেলছে, তবে তাদের খেলায় বড় কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যায়নি।

ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচ প্রেডিকশন

মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষ ১০-এ থাকা দুটি দেশের এই লড়াইটি চলতি টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রতীক্ষিত গ্রুপ পর্বের ম্যাচ।

কোচ আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল আস্তে আস্তে তাদের চেনা ছন্দ ফিরে পাচ্ছে। তারা নিজেদের প্রস্তুতি ম্যাচে পানামা এবং মিশরকে হারিয়েছে। অন্যদিকে, মরক্কোও বেশ দারুণ ফর্মে আছে। মাদাগাস্কারকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর তারা নরওয়ের সাথে ১-১ গোলে ড্র করে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।

মাঠে অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ এক পরিবেশ সৃষ্টি হবে, কারণ দুই দলই জানে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে জয় পাওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এই ম্যাচের বিজয়ী দল গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে অনেকখানি এগিয়ে যাবে, তবে ম্যাচটি ড্র হলে গ্রুপ ‘সি’-এর সমীকরণ সবার জন্যই উন্মুক্ত হয়ে পড়বে।

উদ্বোধনী ম্যাচে ব্রাজিলের রেকর্ড: ১৯৩০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ব্রাজিল মাত্র একটিতে হেরেছে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ডের সাথে ১-১ গোলের ড্র ছিল ১৯৭৮ সালের পর প্রথম ঘটনা, যখন ব্রাজিল তাদের উদ্বোধনী ম্যাচে জয় পায়নি। তবে কাতার বিশ্বকাপে তারা আবার জয়ের ধারায় ফেরে এবং সার্বিয়াকে ২-০ গোলে পরাজিত করে।

কার্লো আনচেলত্তি ফ্যাক্টর: অতীতে ব্রাজিলের স্কোয়াড আরও অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল ঠিকই, তবে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এবারই প্রথম সেলেসাওরা ডাগআউটে একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ কোচের দিকনির্দেশনা পাচ্ছে। আনচেলত্তি দায়িত্ব নেওয়ার পর শুরুর দিনগুলো খুব একটা সহজ ছিল না, তবে ২০২৬ সালে এসে তার অধীনে ব্রাজিল দলে একটি চমৎকার ছন্দ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তার স্বাধীনচেতা বা সহজ ধাঁচের রণকৌশল এই দলটির সাথে বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে যাবে।

মরক্কোর চোটের দুশ্চিন্তা: মরক্কো অত্যন্ত চমৎকার একটি দল এবং তারা শনিবার ব্রাজিলের জন্য বড় বিপদের কারণ হতে পারে, তবে তারা সম্ভবত নিজেদের সেরা ছন্দে মাঠে নামতে পারবে না। টুর্নামেন্টের ঠিক আগ মুহূর্তে কোচ পরিবর্তন হওয়ায় দলের বোঝাপড়ায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এছাড়া নরওয়ের সাথে ড্র করা ম্যাচটিতে দলের কয়েকজন খেলোয়াড় চোটে পড়েছেন।

পূর্বাভাস (প্রেডিকশন): ব্রাজিল ২–১ মরক্কো

মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ

কার্লো আনচেলত্তি সবাইকে চমকে দিয়ে নেইমার জুনিয়রকে ২৬ সদস্যের স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করার পরপরই তিনি কাফ মাসলের (পায়ের পেশি) চোটে পড়েন। ৩৪ বছর বয়সী এই তারকা উত্তর আমেরিকায় তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ উপভোগ করছেন। চোটের কারণে তিনি ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচে খেলতে পারবেন না, তবে তার সুস্থতার প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে।

আনচেলত্তির দলে লুকাস পাকেতা সম্ভবত ১০ নম্বর পজিশনে (অ্যাটাকিং মিডফিল্ড) খেলা শুরু করবেন, আর আক্রমণভাগের নেতৃত্বে দেখা যেতে পারে ম্যাথিউস কুনহাকে। ইগর থিয়াগো এবং এনড্রিকের মতো তরুণ ফুটবলাররা বেঞ্চ থেকে এসে অবদান রাখার জন্য অপেক্ষা করবেন।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে পেনাল্টি মিস করার হৃদয়বিদারক ঘটনার পর গ্যাব্রিয়েল মাগালহায়েস এই প্রথম মাঠে নামবেন। মাঠে ১২ গজ দূর থেকে শট মিস করার পর প্যারিস সেন্ট-জার্মেইর (পিএসজি) অধিনায়ক মার্কুইনহোস তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন, এই ম্যাচে তিনি সেই মার্কুইনহোসের সাথেই রক্ষণভাগ সামলাবেন।

ডাইনামিক ফুলব্যাক ওয়েসলি চোটের কারণে পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে গেছেন। কোচ আনচেলত্তি তার জায়গায় মিডফিল্ড ব্যাকআপ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ফলে দলে ডাক পেয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দিতে যাওয়া এডারসন, যা স্কোয়াডের গভীরতা আরও বাড়াবে।

ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১): অ্যালিসন; দানিলো, মার্কুইনহোস, গ্যাব্রিয়েল, অ্যালেক্স সান্দ্রো; ক্যাসিমিরো, ব্রুনো গুইমারেস; রাফিনহা, পাকেতা, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র; কুনহা।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফুলব্যাক নুসাইর মাজরাউই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে নরওয়ের সাথে খেলা ১-১ ড্রয়ের ম্যাচে কাঁধে চোট পেয়েছিলেন। তবে তিনি ইতিমধ্যেই অনুশীলনে ফিরেছেন এবং শনিবারের শুরুর একাদশে তার থাকার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

গতিময় ফুটবলার আশরাফ হাকিমি রাইটব্যাক হিসেবে খেলা শুরু করবেন, তাই মাজরাউই সামলাবেন লেফটব্যাক পজিশন।

উদ্বেগের বিষয় হলো, নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে উইঙ্গার আবদে ইজ্জালজৌলিও চোট পেয়েছেন, যার ফলে তার বিশ্বকাপ খেলাই এখন হুমকির মুখে। তিনি খেলতে না পারলে মরক্কো সম্ভবত আক্রমণাত্মক সেন্টার ফরোয়ার্ড ইসমায়েল সাইবারির পেছনে কয়েকজন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারকে ব্যবহার করবে।

২০২২ সালের বিশ্বকাপের অন্যতম নায়ক, সেন্টার ব্যাক নায়েফ আগুয়ের্ডকে এই গ্রীষ্মে পাচ্ছে না মরক্কো। তাই ফুলহ্যামের ডিফেন্ডার ইসা দিওপের দলে অন্তর্ভুক্তি বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। নিউ জার্সির এই ম্যাচে তিনি ক্রিস্টাল প্যালেসের চাদি রিয়াদের সাথে রক্ষণভাগের জুটি বাঁধবেন।

মরক্কোর সম্ভাব্য একাদশ (৪-২-৩-১): বোনো; হাকিমি, দিওপ, রিয়াদ, মাজরাউই; বুয়াদ্দি, এল আইনাউই; দিয়াজ, উনাহি, এল খানৌস; সাইবারি।

টিভি ও লাইভ স্ট্রিমে যেভাবে দেখবেন ব্রাজিল বনাম মরক্কো ম্যাচ

দেশ — টিভি/লাইভ স্ট্রিম

যুক্তরাষ্ট্র: ফক্স নেটওয়ার্ক, ফুবোটিভি, টেলেমুন্ডো, টেলেমুন্ডো দেপোর্তেস এন ভিভো, ফক্স ওয়ান।

যুক্তরাজ্য: বিবিসি স্পোর্টস ওয়েব, বিবিসি ওয়ান, বিবিসি আইপ্লেয়ার।

কানাডা: টিএসএন+, টিএসএন১ , টিএসএন৪, টিএসএন৫, আরডিএস, সিটিভি, আরডিএস অ্যাপ, সিটিভি অ্যাপ, ক্রেভ।

মেক্সিকো: কানাল ৫ টেলেভিসা, টিইউডিএন, আজটেকা ৭, টিইউডিএন এন ভিভো, লাস এস্ট্রেলাস, আজটেকা দেপোর্তেস এন ভিভো  , ভিক্স মেক্সিকো ।

বাংলাদেশ: বিটিভি, টি স্পোর্টস, সময় টিভি।