৩ বিশ্বকাপে সঠিক বলা সেই অর্থনীতিবিদের এবারের ভবিষ্যদ্বাণী কী?
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা ফিফা বিশ্বকাপে পল দ্য অক্টোপাস যখন জার্মানির সব ম্যাচের ফলাফল সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তখন তাকে বিশ্বজুড়ে একজন ভবিষ্যৎ বক্তা হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছিল। এরপর জার্মান অর্থনীতিবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট একটি জটিল পূর্বাভাস মডেলের মাধ্যমে পল দ্য অক্টোপাসকেও ছাড়িয়ে গেছেন, যা ২০১৪ সাল থেকে শতভাগ ক্ষেত্রে বিশ্বকাপের বিজয়ী সঠিকভাবে পূর্বাভাস দিয়েছে।
এই মডেল অনুসারে, এবারের যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপে ট্রফি জিততে পারলে নেদারল্যান্ডস হবে ক্লেমেন্টের পরিসংখ্যানভিত্তিক ভবিষ্যদ্বাণীর চতুর্থ সাফল্য। শুধু বিজয়ী দল নয়, ৪৮ দলের পুরো বিশ্বকাপের গতিপথও তার মডেল বর্ণনা করা হয়েছে।
এতে দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জাপানের একটি চমকপ্রদ জয় এবং একই পর্যায়ে স্কটল্যান্ডের দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে বিদায়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও, তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে পৌঁছাবে এবং ২০০৬ সালের দুই দশক পর পর্তুগাল আবারও ইংল্যান্ডকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেবে।
ক্লেমেন্ট, যিনি নিজেকে একজন 'নিরাশাবাদী' হিসেবে পরিচয় দেন এবং এক দশক ধরে যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন, তার কাজের উদ্দেশ্য কখনোই হতাশা এড়ানো বা জুয়া খেলে অর্থ উপার্জন করা ছিল না। বরং, তিনি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন যে, ফলাফল ভবিষ্যদ্বাণী করার চেষ্টা করাটা কতটা অযৌক্তিক হতে পারে।
"এটি শুরু হয়েছিল এমন এক অনুশীলন হিসেবে, যার মাধ্যমে দেখানো যায় যে অর্থনীতিবিদরা কতটা অহংকার নিয়ে এমন বিষয় পূর্বাভাস দেন, যেগুলো সম্পর্কে তাদের প্রকৃতপক্ষে কোনও ধারণাই নেই," ব্যাখ্যা করেন ক্লেমেন্ট।
''আর এখন ব্যাপারটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, যদি আপনি যথেষ্ট ভাগ্যবান হন, তাহলে লোকেরা আপনাকে একজন গুরু বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে''।
'মানুষ মনে করে এই মডেলকে হারানো যায় না'
তার প্রথম ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হওয়ার পর, যখন তার নিজ দেশ জার্মানি ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জিতেছিল, ক্লেমেন্ট ভেবেছিলেন, ২০১৮ সালে হিসাবটি পুনরাবৃত্তি করলে প্রমাণিত হবে যে পুরোটাই ছিল নিছক কাকতালীয়। কিন্তু ২০১৮ সালে ফ্রান্সের ক্ষেত্রে এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রেও তিনি আবারও সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছিলেন।
"যেহেতু আমি পরপর তিনবার সঠিক হয়েছি, তাই মানুষ এখন বিশ্বাস করে যে এই মডেলটি অপরাজেয় এবং স্বাভাবিকভাবেই, পরেরবারও আমাকে সঠিক হতে হবে", তিনি বলেন।
এটা সত্যি যে বিশ্বকাপে সাফল্য আংশিকভাবে কিছু জ্ঞাত 'ব্যবস্থাগত' উপাদানের ওপর নির্ভর করে, যেমন কোনো দেশের জনসংখ্যা, সম্পদ, জলবায়ু বা ফিফা র্যাঙ্কিং।
ক্লেমেন্ট তার ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাপারে পাঠকদের সতর্ক থাকতে বলেছেন,যা প্রতিটি সাফল্যের সাথে জনপ্রিয়তা লাভ করছে। কারণ এই উপাদানগুলো গল্পের কেবল একটি অংশই তুলে ধরে।
"বাকি ৫০ শতাংশ হলো ভাগ্য", তিনি যোগ করেন।
"প্রতিটি ম্যাচ, বিশেষ করে যখন মান ও দক্ষতায় প্রায় সমমানের উচ্চ-স্তরের দলগুলো একে অপরের মুখোমুখি হয়, অনেকটা নির্ভর করে সেদিনের ফর্ম, রেফারির সিদ্ধান্ত বা ভাগ্যের ওপর, যেমন বল পোস্টে লাগা বা গোলে ঢুকে যাওয়া", তিনি আরও বলেন।
এই ধরনের ঘটনা কখনো আগে থেকে আচ করা যায় না।
'সব নেতিবাচকতার মধ্যে একটি ছোট বিরতি'
টুর্নামেন্ট যতই ঘনিয়ে আসে, ক্লেমেন্টের মডেলিং তার দৈনন্দিন কাজ থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
''বিশেষ করে ২০২৬ সালে, যখন চারপাশে এত সংকট, যুদ্ধ এবং নানা ঘটনা ঘটছে, তখন এই বিষয়টি আমাকে ভালো অনুভব করায় এবং আমি আশা করি, এটি পাঠকদেরও ভালো অনুভব করাবে ও বিশ্বে ঘটে চলা সমস্ত নেতিবাচক ঘটনা থেকে তাদের কিছুটা হলেও মনোযোগ সরাতে সাহায্য করবে'', তিনি বলেন।
কিন্তু প্রতিটি সঠিক ভবিষ্যদ্বাণীর সাথে সাথে ক্লেমেন্টের ওপর চাপ বাড়তে থাকে, যিনি বিনিয়োগ ব্যাংক প্যানমিউর লিবারামে কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেন।
তার অফিসে অন্যান্য অর্থনীতিবিদরা তাকে প্রশ্ন করেন, যেমন টটেনহ্যামের ডাচ মিডফিল্ডার জাভি সিমন্সের অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টের চোট তার মডেলকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
পূর্বাভাসের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বারবার সতর্ক করার পরও ক্লেমেন্ট জুনে বিশ্বকাপ শুরুর জন্য প্রস্তুতি নেন।
"আমার কয়েকজন সহকর্মী আমার পূর্বাভাস প্রকাশের পর নেদারল্যান্ডসের পক্ষে কিছু অর্থও বাজি ধরেছেন", তিনি জানান।
"তাই যদি নেদারল্যান্ডস বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে, তাহলে মনে হচ্ছে পরের দিন আমাকে বাসা থেকেই কাজ করতে হবে", বলছিলেন ক্লেমেন্ট।
সূত্র: বিবিসি বাংলা