৯৬ বছরের অপেক্ষার অবসান, মেক্সিকোর অবিস্মরণীয় জয়
মেক্সিকো সিটির আকাশে যেন তখন কেবলই উৎসবের রং। ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়াম যেন আবারও তার সোনালি দিনগুলোর প্রত্যাবর্তন লিখল। গ্যালারিতে ৮০ হাজারের বেশি দর্শকের গর্জন, চারদিকে উড়তে থাকা রঙিন সমব্রেরো হ্যাট, আর জার্সিতে মোড়া মানুষের ঢেউ—সব মিলিয়ে যেন জাতির আবেগের মহাউৎসব।
যদিও উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামার আগে ইতিহাসের ভার যেন কাঁধে নিয়ে নেমেছিল মেক্সিকো। প্রায় এক শতাব্দীর অপেক্ষা, ৭টি উদ্বোধনী ম্যাচের হতাশা কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছিল না। কিন্তু এ যেন নতুন ইতিহাস লেখার রাত।
শুরুর বাঁশি বাজতেই আক্রমণের পর আক্রমণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে ফেলে দেয় স্বাগতিকরা। গ্যালারির প্রতিটি গর্জন যেন তাদের আরও সামনে ঠেলে দিচ্ছিল। বিশ্বকাপের প্রথম গোল আসে মেক্সিকোর পা থেকেই, আর সেই মুহূর্তে আজতেকা স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হয় আনন্দে। তবে এই জয়েও লুকিয়ে ভিন্ন গল্প। দীর্ঘ ৯৬ বছরের অপেক্ষা ভাঙার গল্প এটি। ব্যর্থতার ইতিহাসকে পেছনে ফেলে নতুন অধ্যায় শুরু করার গল্প।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকোর অতীত ছিল কেবলই বেদনাময়। প্রথম পাঁচ উদ্বোধনী ম্যাচেই তারা টানা হেরেছিল। সেই ম্যাচগুলোতে মাত্র একটি দেওয়ার বিপরীতে ১৮টি হজম করেছিল। সবমিলিয়ে উদ্বোধনী ম্যাচে জয় নামের শব্দটি যেন তাদের অভিধানে ছিল না। কিন্তু ইতিহাস কখনও কখনও এভাবেই সুন্দরভাবে বদলায়। ২০২৬ বিশ্বকাপে সেই অসমাপ্ত গল্পটিই নতুন করে লিখল জাভিয়ের আগুইরের দল। ৯৬ বছরের অপেক্ষা শেষে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে প্রথমবারের মতো জয়ের স্বাদ পেল মেক্সিকো।
এদিন শুরু থেকেই দুর্দান্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে স্বাগতিক মেক্সিকো। এতে মাত্র নবম মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার রক্ষণভাগের ভুল পাসকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়ে বল জালে জড়ান কিনিয়োনেস। এর মাধ্যমে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ-এর এই মেগা আসরের অফিশিয়াল গোল খাতাটি তিনিই প্রথম খুললেন।
এক গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফিরতে মরিয়া হয়ে ওঠে দক্ষিণ আফ্রিকাও। যদিও মেক্সিকোর আক্রমণ সামলাতে গিয়ে কিছুটা শারীরিক ফুটবলের আশ্রয় নেয় তারা। ফলে, ম্যাচের ১৬তম মিনিটে আলভারো ফিদালগোকে কঠোর ট্যাকল করে টুর্নামেন্টের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন তেবোহো মোকোয়েনা। পরে ফাউল করে হলুদ কার্ড পান মেক্সিকোর এরিক গুতিয়েরেসও।
প্রথমার্ধের শেষভাগে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে আরও জমে ওঠে ম্যাচ। ৩৫তম মিনিটে কিনিয়োনেসের চমৎকার পাস থেকে সুযোগ পেয়েও শট নিতে দেরি করায় গোলের সম্ভাবনা নষ্ট করেন মেক্সিকোর আলভারাদো। তিন মিনিট পর বাঁ-দিক থেকে এমবোকাজির ক্রসে মাথা ছোঁয়ান দক্ষিণ আফ্রিকার লাইল ফস্টার, তবে তার প্রচেষ্টা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে সমতায় ফিরতে পারেনি প্রোটিয়ারা।
তবে প্রথমার্ধের সবচেয়ে বড় আক্ষেপের মুহূর্তটি আসে ৪২তম মিনিটে। আরেকবার গোলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন কিনিয়োনেস, কিন্তু তার শট প্রতিহত করে গোলবার। এর দুই মিনিট আগে দুর্দান্ত এক সেভ করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আরও বড় বিপদ থেকে বাঁচান গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামস, ফলে ব্যবধান ১-০-ই থাকে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই আরও বিপদে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। ৫০তম মিনিটে পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে মেক্সিকোর এক খেলোয়াড়কে ফাউল করে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন মিডফিল্ডার স্ফেফেলো সিথোলে। এর ফলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় প্রোটিয়ারা। একইসঙ্গে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম লাল কার্ডের রেকর্ডও নিজের নামে লেখান সিথোলে। ফাউলের সুবাদে বিপজ্জনক জায়গা থেকে ফ্রি-কিক পায় মেক্সিকো। তবে সেখান থেকে সুবিধা আদায় করে নিতে পারেনি স্বাগতিকরা।
দ্বিতীয়ার্ধের ৬৬তম মিনিটে আবারও জালের দেখা পায় স্বাগতিকরা। আক্রমণ তৈরিতে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখান কিনিয়োনেস। ডানপ্রান্ত ধরে ইসরায়েল রেয়েসের কাছে বল পৌঁছেও দেন। সেখান থেকে বক্সের ভেতরে নিখুঁত একটি ক্রস পেয়েই গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসকে পরাস্ত করে লক্ষ্যভেদ করেন জেমিনেজ। মজার বিষয় হলো- জেমিনেজের ক্যারিয়ারের বিশ্বমঞ্চে প্রথম গোল এটি, সেটাও কিনা চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম গোলের দেখা পেলেন অভিজ্ঞ এই স্ট্রাইকার।
এই গোল হজমের পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকার খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরে ৮৩তম মিনিটে মেক্সিকোর আলভারাদোর মুখে আঘাত করার অভিযোগে সরাসরি লাল কার্ড দেখেন থেম্বা জাওয়ামে। ফলাফল, ৯ জনের দলে নেমে আসে সফরকারীরা। মেক্সিকোও ফায়দা তুলে নিয়ে ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তবে নাটকীয়তা এখানেই শেষ হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের ৯৩তম মিনিটে সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন মেক্সিকোর সিজার মোন্তেস। রেফারি সাম্পাইওর এমন সিদ্ধান্তে হতবাক হন মোন্তেসও। এতে বিশ্বকাপ ইতিহাসে একই ম্যাচে তিনটি লাল কার্ডের বিরল ঘটনাও ঘটল। তবে নানা নাটকীয়তা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত পূর্ণ তিন পয়েন্টই নিজেদের ঝুলিতে পুরেছে মেক্সিকো। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে শুভসূচনা করেছে স্বাগতিকরা।