১১ জুন ২০২৬, ০৯:১১

পর্তুগালের জয়ের রাতে কাঠগড়ায় রোনালদো, গোল মিসের মহোৎসব

রোনালদো   © সংগৃহীত

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় দিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শেষ করেছে পর্তুগাল। তবে এই উৎসবের রাতেও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন দলের মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। লেইরিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের শেষ প্রীতি ম্যাচে পর্তুগাল জয় পেয়েছে। কিন্তু পুরো ম্যাচজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রোনালদোর গোল মিসের মহোৎসব। 

আল-নাসরের এই ফরোয়ার্ড ম্যাচে গোল করার একাধিক নিশ্চিত সুযোগ নষ্ট করেন। এর মধ্যে দুটি ছিল একেবারেই অবধারিত গোল। দলের জয়ের রাতেও রোনালদোর এমন অফ-ফর্ম এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের অভাব পর্তুগিজ শিবিরে কিছুটা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। ম্যাচে পর্তুগালের হয়ে গোল দুটি করেন পেদ্রো নেতো ও ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও। আর নাইজেরিয়ার হয়ে আকোর অ্যাডামস কিছুক্ষণের জন্য সমতা ফিরিয়েছিলেন। 

আগামী ১৭ই জুন কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে পর্তুগাল তাদের বিশ্বকাপ মিশন শুরু করবে। তারা 'কে' গ্রুপে কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তানের মুখোমুখি হবে।

ম্যাচের ফলাফলের বাইরে ফুটবলপ্রেমীদের বড় একটি অংশ ক্রিস্টিয়ানোর ফিনিশিংয়ের ঘাটতি নিয়ে কথা বলছেন। ম্যাচের শুরুতেই গোল করার প্রথম সহজ সুযোগটি পান রোনালদো। তখন তিনি প্রতিপক্ষের গোলরক্ষককে একদম একা বা মুখোমুখি অবস্থায় পেয়েছিলেন। কিন্তু তার নেওয়া শটটি অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এরপর দ্বিতীয়ার্ধেও তিনি বক্সের ভেতরে আরও একটি পরিষ্কার সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে সেবার তার শটটি গোলপোস্টের ওপরের বারের অনেক উপর দিয়ে চলে যায়।

রোনালদো এই ম্যাচে জাতীয় দলের হয়ে মূল একাদশে খেলতে নেমেছিলেন। তিনি গোল পাওয়ার জন্য মাঠে ৬৫ মিনিট কঠোর পরিশ্রম করেন। কিন্তু ম্যাচের শেষ পর্যন্ত তার চেনা ফিনিশিং ছোঁয়াটি অধরাই থেকে যায়। অবশ্য গোল না পেলেও তিনি ম্যাচে কিছু চমৎকার পাস দেন। একই সাথে তিনি মাঠে ভালো মুভমেন্ট দেখান। তার এই অবদান পর্তুগালকে ম্যাচের বিভিন্ন সময়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে সাহায্য করে। তবে ম্যাচ শেষে ফুটবল পরিসংখ্যান ভিত্তিক ওয়েবসাইট সোফাস্কোর তাকে ১০ এর মধ্যে মাত্র ৬.২ রেটিং দেয়।

পরিসংখ্যানের পাতা উল্টালে রোনালদোর গোল মিসের পুরো গল্পটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রোনালদো পুরো ম্যাচে মোট চারটি শট নেন। এই চারটি শটের কোনোটিই গোলপোস্টের লক্ষ্যে ছিল না। এই শটগুলোর মধ্যে তিনটিই ছিল গোল করার একদম সহজ সুযোগ বা হাতছাড়া হওয়া বড় সুযোগ। সাধারণত ফুটবল মাঠে রোনালদো এই ধরনের সুযোগগুলো সহজেই গোলে পরিণত করেন। 

এছাড়া প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভাঙার চেষ্টার সময় তিনি একবার অফসাইডের ফাঁদেও পড়েন। ম্যাচ শেষে তার শটের মানদণ্ড বা শট নেওয়ার কার্যকারিতা ছিল মাইনাস ০.৬২। এই ঋণাত্মক সংখ্যাটি পরিষ্কার প্রমাণ করে যে সুযোগ পাওয়ার তুলনায় তার ফিনিশিং কতটা দুর্বল ছিল। তিনি মাঠে সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছিলেন কিন্তু বল জালে জড়াতে পারেননি। এই ম্যাচে তিনি কোনো গোল বা গোলে সহায়তা করতে ব্যর্থ হন। তিনি সতীর্থদের জন্য মাত্র একটি নিশ্চিত সুযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ পাস তৈরি করতে পেরেছিলেন। 

শারীরিক শক্তির লড়াইয়েও আজ তাকে বেশ দুর্বল দেখিয়েছে। তিনি ম্যাচে মাত্র একবার বল দখলের লড়াইয়ে বা মুখোমুখি দ্বন্দ্বে নামেন এবং সেখানেও হেরে যান। পর্তুগাল ম্যাচের দুই অর্দ্ধেই গোল করে জয় নিশ্চিত করেছে। তবে রোনালদো সেই উৎসবে সরাসরি যোগ দিতে পারেননি। তাই সার্বিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে সোফাস্কোরের দেওয়া ৬.২ রেটিংকে একদম সঠিক বলা যায়।

বল পায়ে রোনালদো যখন সহজ পাসিং গেম খেলেন, তখন তিনি বেশ কার্যকর ছিলেন। তিনি ম্যাচে ১৮টি পাসের মধ্যে ১৭টি সফলভাবে সম্পন্ন করেন। তার পাসের নির্ভুলতার হার ছিল ৯৪ শতাংশ। নিজের হাফে তিনি ৬টি পাসের মধ্যে ৬টিই সফলভাবে সতীর্থদের দেন। প্রতিপক্ষের হাফে ১২টি পাসের মধ্যে ১১টি পাস সঠিক জায়গায় পাঠান। 

এই নির্ভুল পাসিংয়ের কারণে পর্তুগাল ম্যাচে বল দখলে সুবিধা পায়। তবে এই পাসগুলো সরাসরি কোনো গোল এনে দেয়নি। পাসিং ভালো হলেও ম্যাচে তার সামগ্রিক সম্পৃক্ততা বেশ কম ছিল। তিনি পুরো ম্যাচে মাত্র ২৫ বার বল স্পর্শ করেন। এই সংখ্যা তার সাধারণ পারফরম্যান্সের তুলনায় অনেক কম। তিনি বল নিয়ে মাত্র একবার সামনের দিকে এগিয়ে যান বা আক্রমণাত্মক অবদান রাখেন। তিনি মাত্র একবার বল টেনে নিয়ে সামনে যান। অর্থাৎ তিনি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের দিকে খুব বেশি চড়াও হতে পারেননি।

 এর বাইরে তার দুটি বল নিয়ন্ত্রণ ভুল হয়েছিল। তিনি চারবার বলের দখল হারান। এই ভুলগুলো তার পারফরম্যান্সে সামান্য দাগ ফেলেছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী তার পাসের কার্যকারিতা ছিল ০.০৬ এবং ড্রিবলিংয়ের কার্যকারিতা ছিল ০.০২। এই সংখ্যাগুলো দেখায় যে শট নেওয়া ছাড়াও মাঠের অন্যান্য কাজে তার সামান্য ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। এটি মূলত দলকে ধরে রাখার মতো খেলা ছিল। এখানে কোনো নায়কোচিত পারফরম্যান্স ছিল না।

রোনালদো মাঠে যে ৬৫ মিনিট ছিলেন, তখন ম্যাচের আবহ বেশ উত্তেজনাকর ছিল। প্রথমার্ধে ম্যাচটি ১-১ সমতায় ছিল। দ্বিতীয় অর্ধে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। পর্তুগাল ম্যাচের দুই অর্ধে একটি করে গোল করে। নাইজেরিয়া প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই একটি গোল শোধ দেয়। এই কঠিন পরিস্থিতির কারণে রোনালদো গোল না পেয়েও বারবার শট নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। গোল না পেলেও মাঠে তার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ত রাখে। 

এর ফলে দলের অন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা মাঠে কিছুটা ফাঁকা জায়গা পান। তারা নতুন আক্রমণের সুযোগ তৈরি করেন। এই প্রীতি ম্যাচে রক্ষণভাগে রোনালদোর কোনো বাড়তি পরিশ্রম করার প্রয়োজন হয়নি। তার রক্ষণাত্মক কাজের মানদণ্ড ছিল মাইনাস ০.০১। এটি আসলে একদম সাধারণ বা নিরপেক্ষ অবস্থান নির্দেশ করে। মাত্র একটি বল দখলের লড়াই এবং নিচে নেমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার তেমন প্রয়োজন ছিল না। তাই কোচের দেওয়া দায়িত্বটি তার জন্য সহজ ছিল। 

তার মূল কাজ ছিল ফাঁকা জায়গা খুঁজে নেওয়া, সুযোগ কাজে লাগানো এবং সতীর্থদের সাথে তাল মিলিয়ে খেলা। তিনি নিজে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। তবে দল শেষ পর্যন্ত জয় নিয়েই মাঠ ছেড়েছে। ভক্তরা চাইলে সোফাস্কোরে এই ম্যাচের খেলোয়াড়ের গতিবিধি মানচিত্র এবং সব উন্নত পরিসংখ্যান এক জায়গায় দেখতে পাবেন। পর্তুগাল বা সৌদি প্রো লিগে আল-নাসরের হয়ে রোনালদোর পারফরম্যান্স ট্র্যাক করার এটি সবচেয়ে সহজ উপায়।

এই রাতটিকে রোনালদোর ক্যারিয়ারের সেরা পারফরম্যান্সের তালিকায় রাখা যাবে না। তবে বিশ্বকাপের আগে এটি তার জন্য একটি দরকারি ম্যাচ ছিল। পর্তুগাল কাঙ্ক্ষিত জয় পেয়েছে। রোনালদো গোল করার মতো একাধিক সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি সাধারণত এই সুযোগগুলো হাতছাড়া করেন না। তবে আজ তার ফিনিশিং ভাগ্য সহায় ছিল না। আজ তার পাসিং নিখুঁত ছিল এবং মুভমেন্ট ভালো ছিল। শুধু গোলটাই মিস হয়েছে। তবে সামনে এমন সুযোগ আসতে থাকলে তিনি অবশ্যই আবার চেনা ছন্দে গোল পাবেন।