বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে যে ৭টি ম্যাচ হতে পারে রোমাঞ্চকর
দরজায় কড়া নাড়ছে ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এই টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল সম্প্রচার স্বত্ব বাংলাদেশে এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এতে বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ দেখা নিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। তবে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দেশে বিশ্বকাপ দেখা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার অর্থাৎ ‘ব্ল্যাকআউট’র কোনো ঝুঁকি নেই। ধারণা করা হচ্ছে, চলতি সপ্তাহেই এই বিষয়ে সমাধান আসতে যাচ্ছে।
এদিকে এবার প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল বিশ্বকাপে খেলবে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য বৈশ্বিক এই মহারণে ১০৪ ম্যাচ হবে। আর বিশ্বমঞ্চে এবার দলে বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা বিবর্ণ হয়ে পড়েছে গ্রুপ পর্বের লড়াইও। অর্থাৎ গ্রুপ পর্বের ঝাঁজ বুঝি কমে যাচ্ছে এবার। তবে এর মাঝেও এমন কিছু ম্যাচ আছে, যেগুলোর দেখার জন্য অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় থাকবেন ফুটবলপ্রেমীরা। এমনই ৭টি ম্যাচের দিকে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে।
মরক্কো-ব্রাজিল: উদীয়মান বনাম সফলতম দলের লড়াই
বিশ্বমঞ্চে উদীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে এখন সবার আগে মরক্কোর নাম। কাতারে সবাইকে চমকে দিয়ে সেমিফাইনালে উঠে চতুর্থস্থান অর্জন করেছিল তারা। বড় দলের বিপক্ষে সমানতালে লড়াই করার আত্মবিশ্বাসও দেখায় তারা। ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত টুর্নামেন্টে এবার শুরুতেই তাদের সামনে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল।
সেলেসাওরা অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই শিরোপার খরা কাটানোর অপেক্ষায়। সবশেষ ২০০২ বিশ্বকাপে ২৪ বছর আগে শিরোপা উল্লাস করেছিল তারা। সেই আক্ষেপ ঘোচানোর লক্ষ্যেই কার্লো আনচেলত্তিকে কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিশ্বকাপ বাছাইয়ে নিজেদের জাত সেভাবে চেনাতে পারিনি তারা। ফলে বিশ্বকাপের শুরুতেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে সেলেসাওরা। ১৪ জুন বাংলাদেশ সময় ভোর ৪টায় গড়াবে ম্যাচটি।
ফ্রান্স-নরওয়ে: সেরা দুই ফরোয়ার্ডের দ্বৈরথ
এবারের বিশ্বকাপে ‘আই’ গ্রুপে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বৈরথ হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও নরওয়ের মুখোমুখি লড়াই। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা দুই ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হলান্ড এই ম্যাচে মাঠে নামবেন। ফলে দর্শকদের প্রত্যাশা, জমজমাট গোল উৎসবে রূপ নিতে পারে ম্যাচটি।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে নরওয়ে, আর বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলবেন হলান্ড। অন্যদিকে ইতোমধ্যেই বিশ্বমঞ্চে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এমবাপ্পে। ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য তিনি, আর ২০২২ সালে রানার্সআপ ফ্রান্স দলের গোল্ডেন বুটজয়ীও গতিময় এই তারকা। এবার হলান্ড যেমন প্রথম বিশ্বকাপেই নিজের ছাপ রাখতে চাইবেন, তেমনি এমবাপ্পেও নিজের বর্ণাঢ্য বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় যোগ করতে চাইবেন। ২৬ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় হবে ম্যাচটি।
স্পেন-উরুগুয়ে: দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের মহারণ
‘এইচ’ গ্রুপেও হাইভোল্টেজ লড়াই অপেক্ষা করছে। যেখানে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ও উরুগুয়ে। তবে এটি কেবল দুই দলের লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষও। লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে দৃষ্টিনন্দন পাসিং ও বল দখলনির্ভর ফুটবল খেলছে স্পেন। বিপরীতে উরুগুয়ে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ‘চ্যারুয়া গ্রিট’ অর্থাৎ অদম্য লড়াই এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হার না মানার মনোভাব দেখাবে। দুটি ভিন্ন ঘরানার এই দ্বৈরথ ফুটবলপ্রেমীদের জন্য দারুণ উপভোগ্য এক ম্যাচ হতে পারে। ২৭ জুন বাংলাদেশ সময় ভোর ৬টায় হবে ম্যাচটি।
পর্তুগাল-কলম্বিয়া: হামেস রোমাঞ্চ বনাম রোনালদোর খ্যাতি
বিশ্বমঞ্চে কলম্বিয়া মানেই বাড়তি রোমাঞ্চ। বিদায় নেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত বিনোদনের পরসা সাজায় দলটি। এবার ‘কে’ গ্রুপে তাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রতিপক্ষ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল। সিআর সেভেনের মতো বিশ্বসেরা তারকা না থাকলেও দলটির অন্যতম ভরসার নাম হামেস রদ্রিগেজ। বিশ্বমঞ্চে অসাধারণ পারফরম্যান্সেই তার উত্থান হয়েছিল। ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এটিই তাদের শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে। তাই, এই দুই জাদুকরের দ্বৈরথ ঘিরে আগ্রহের কমতি নেই ফুটবলপ্রেমীদের। বাংলাদেশ সময় ২৮ জুন ভোর সাড়ে ৫টায় গড়াবে ম্যাচটি।
ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া: কঠিন পরীক্ষার সামনে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ
প্রায় ৬ দশক ধরে ইংল্যান্ডের কাছে বিশ্বকাপ মানেই আক্ষেপ। প্রতিভাবান দল গড়েও শিরোপার স্বাদ নেওয়া হয়ে উঠেনি থ্রি-লায়ন্সদের। তবে জার্মান কোচ টমাস টুখেলের অধীনে অন্যতম শক্তিশালী ও ভারসাম্যপূর্ণ দলটি সাম্প্রতিক সময়ে দুর্দান্ত ছন্দে আছে। তাই অনেকের কাছেই শিরোপার অন্যতম দাবিদার ইংলিশরা।
তবে গ্রুপ পর্বে তাদের সামনে বড় শঙ্কার নাম ক্রোয়েশিয়া। বিশ্বমঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ বারবার দেওয়া এক দল তারা। কাতার বিশ্বকাপে তৃতীয়স্থান অর্জন ছাড়াও ২০১৮ সালে রানার্সআপ হয়েছিল ক্রোয়েশিয়ানরা। লড়াকু মানসিকতা এবং বড় ম্যাচে সেরাটা নিগড়ে দেওয়ার ক্ষমতা ক্রোয়েশিয়াকে করে তুলেছে ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষ। ১৮ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় গড়াবে ম্যাচটি।
ফ্রান্স-সেনেগাল: পুরোনো হিসাব চুকানোর মঞ্চ
বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় অঘটনের সঙ্গে জড়িয়ে ফ্রান্স-সেনেগাল। ২০০২ আসরের উদ্বোধনী ম্যাচে সে সময়ের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বে তুমুল আলোড়ন তুলেছিল সেনেগাল। দীর্ঘ ২৪ বছর পর ফের বিশ্বমঞ্চে মুখোমুখি হচ্ছে দল দুটি। ফ্রান্সের সামনে সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ। তবে কাজটা মোটেও নয়। আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল হিসেবে সেনেগালও এখন প্রতিষ্ঠিত। তাই পুরোনো ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে আবারও চমক দেখাতে প্রস্তুত সেনেগালিজরা। ১৭ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় গড়াবে হাইভোল্টেজ এই লড়াই।
বেলজিয়াম–মিসর: দুই ভিন্ন মহাদেশের শক্তির লড়াই
ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়াম, অন্যদিকে আফ্রিকার পরাশক্তি মিসর। তবে আক্রমণভাগে থাকা তারকাদের কারণে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে এই ম্যাচটি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের অনেকেই এখন নেই। কিন্তু ‘ছন্দহীন’ লুকাকুও যেকোনো সময়ই জ্বলে উঠতে পারেন। এ ছাড়া মাতিয়াস ফার্নান্দেজ-পার্দো কিংবা কেভিন ডি ব্রুইনাও এই ম্যাচে প্রভাবক হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারেন। অন্যদিকে মিশরের সবচেয়ে বড় ভরসা মোহাম্মদ সালাহ, একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য রাখেন তিনি।
দুই দলের খেলার ধরনও বেশ ভিন্ন। বলের দখল ও আক্রমণাত্মক ফুটবলে বিশ্বাসী বেলজিয়াম। অন্যদিকে সুযোগ কাজে লাগিয়ে পাল্টা আক্রমণে কার্যকরী মিসরীয়রা। তাই কেবল তারকা নয়, কৌশলগত কারণেও আলোচনায় এই দ্বৈরথ। ১৬ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় গড়াবে ম্যাচটি।