বার্সার ‘কাচের মানুষ’ থেকে পিএসজির ‘ফিনিক্স পাখি’, ডেম্বেলের রূপকথার প্রত্যাবর্তন
সময়টা ২০১৭ সাল, মাত্র ২০ বছর বয়সেই রেকর্ড ১৪ কোটি ইউরো ট্রান্সফার ফি’তে ওসমান ডেম্বেলেকে দলে ভিড়িয়েছিল বার্সেলোনা। সেই সময় তাকে ফুটবল বিশ্বের পরবর্তী ‘সুপারস্টার’ ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ফুটবল বিধাতা যেন তার জন্য ভিন্ন এক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। একের পর এক চোট তাকে বারবার মাঠের বাইরে ছিটকে দেয়। মাঠে পায়ের জাদুর বদলে হাসপাতালের বেড, পুনর্বাসন কেন্দ্র আর ক্রাচই যেন তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে উঠেছিল। চোটে জর্জরিত থাকায় ব্যঙ্গ করে তাকে ‘গ্লাস ম্যান’ বা ‘কাচের মানুষ’ আখ্যা দিয়েও উপহাস করতেন সমালোচক ও ভক্তদের একাংশ।
কিন্তু প্রতিকূলতার কাছে পরাজয় বরণ করেন না সত্যিকারের চ্যাম্পিয়নরা। জীবনে হাল না ছাড়ার গল্পের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে উঠেন তারা। এমনই নানা শারীরিক-মানসিক ধাক্কা এবং হতাশা-অনিশ্চয়তার মধ্যেও হাল ছাড়েননি ডেম্বেলে। নিজের জীবনযাপন আর মানসিক দৃঢ়তায় বড় পরিবর্তন এনে ধীরে ধীরে নিজেকে নতুন করে গড়েন ফরাসি এই উইঙ্গার। এতে দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনের সর্বোচ্চ মঞ্চেও জায়গা করে নেন। একসময় চোটে জর্জরিত ডেম্বেলেই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অর উঁচিয়ে ধরেন। এই রূপকথার মতো প্রত্যাবর্তনই যেন ডেম্বেলেকে প্যারিসের আকাশে ‘ফিনিক্স পাখি’ হয়ে উড়ার অভয় দেয়।
বার্সায় পারফরম্যান্সের চেয়ে ইনজুরির কারণেই বেশি আলোচনায় ছিলেন ডেম্বেলে। স্প্যানিশ এই ক্লাবটিতে ৬ মৌসুমে ১৫টিরও বেশি বড় চোটের কবলে পড়েন। এজন্য প্রায় ৭৮৪ দিন এবং ১১৯টিরও বেশি ম্যাচে মাঠের বাইরেই দিন কাটিয়েছিলেন।
ফরাসি এই ফুটবলারের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসেছিল। দীর্ঘ চোট সারিয়ে ট্রেইনিংয়ে ফেরার ক’দিনের মধ্যেই ফের তার ডান পায়ের হ্যামস্ট্রিংয়ের পেশি পুরোপুরি ছিঁড়ে যায়। পরে ফিনল্যান্ডের বিখ্যাত থিয়েটারে অস্ত্রোপচারের পর ১০ মাসের জন্য মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়। সেখানেই তার ক্যারিয়ারের শেষটা দেখে ফেলেছিলেন ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা। তীব্র ট্রল, সমালোচনা এবং চোটের মানসিক যন্ত্রণায় রীতিমত খাঁদের কিনারায় চলে গিয়েছিল তার ক্যারিয়ার।
সেই সঙ্গে তার শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব নিয়েও ক্লাবের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছিল। গভীর রাত পর্যন্ত ভিডিও গেম খেলার আসক্তির কারণে প্রায়ই সকালে যথাসময়ে অনুশীলনে উপস্থিত হতে পারতেন না। ফলস্বরূপ, বার্সেলোনায় সবচেয়ে বেশি জরিমানা গোনা খেলোয়াড় ছিলেন এই ফরাসি উইঙ্গার। তবে এত কিছুর পরও সুযোগ পেলেই বিধ্বংসী গতি আর ড্রিবলিংয়ের জাদুতে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতেন। কিন্তু হঠাৎ কিসে বদলে গেলেন এই খামখেয়ালী তরুণ?
যদিও ২০২১ সালেও তাকে কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়েও ‘সেরা খেলোয়াড়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন বার্সা সভাপতি হুয়ান লাপোর্তা। এর এক সপ্তাহ পরই ন্যু ক্যাম্পের তৎকালীন কোচ জাভি হার্নান্দেজ বলেছিলেন, ‘সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে ডেম্বেলে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হতে পারেন।’
কিন্তু খুব কাছ থেকে যারা তাকে চিনতেন; তাদের মতে, ডেম্বেলের জীবনের মূল টার্নিং পয়েন্ট ২০২১ সালের ডিসেম্বর। সে সময় মরক্কোতে মুসলিম রীতিনীতি মেনে প্রেমিকা রিমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এর কিছুদিন পরেই তাদের কোলজুড়ে আসে এক সন্তান। যদিও ডেম্বেলের বিয়ের খবর তার বার্সার সতীর্থদের কাছে মস্ত বড় চমক ছিল। অনেকেই জানতেন না যে ডেম্বেলে কারও সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন। মূলত বিয়ে এবং বাবা হওয়ার পর বার্সেলোনায় কাটানো শেষ দুই মৌসুমেই তার জীবনে এই বড় পরিবর্তনগুলো আসে। সহজ কথায়, মানসিকভাবে পরিপক্ক হয়ে ওঠেন ডেম্বেলে।
শরীরকে নতুন করে চেনার জন্য লাইফস্টাইলই বদলে ফেলেন। বেছে নেন কঠোর লড়াইয়ের পথ। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে গভীর রাত পর্যন্ত ভিডিও গেম খেলা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের অভ্যাস; পুরোপুরি ছেঁটে ফেলেন। পেশিকে শক্তিশালী করতে ব্যক্তিগত শেফের পাশাপাশি ফিটনেস ট্রেইনারও নিয়োগ দেন। নিয়ম করে প্রতিদিনই জিম সেশনে দীর্ঘ সময় কাটানো শুরু করেন। এ ছাড়া একজন বাবার দৃষ্টিভঙ্গি আর মানসিকতায় সবকিছু নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন তিনি।
কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আর্থিক সংকটে জর্জরিত কাতালান ক্লাবটি ডেম্বেলের বেতন কমিয়ে নতুন চুক্তির কিংবা বার্সা ছেড়ে যাওয়ার আলটিমেটাম দেয়। তবে এই প্রস্তাবে সাড়া না পেয়ে তাকে দল থেকেই ছেঁটে ফেলেন কোচ জাভি। পরে তিনটি লা লিগা জয়ী এই ফরাসি তারকাকে ২০২৩ সালের আগস্টে মাত্র ৪৩ দশমিক ৫ মিলিয়ন পাউন্ডে কিনে নেয় পিএসজি। ফরাসি ক্লাবের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে সে সময়ে অনেক বার্সা সতীর্থই অবাক এবং হতাশ হয়েছিলেন।
তবে ফরাসি ক্লাবটিতে পাড়ি জমানোর পর ডেম্বেলে যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। মাত্র ৫ ম্যাচে ১০ গোল স্পর্শ করে মুহূর্তেই ইউরোপের সবচেয়ে ফর্মে থাকা স্ট্রাইকার হয়ে উঠেন। এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে কিংবদন্তিদের রেকর্ডেও ডেম্বেলের নাম উচ্চারিত হতে থাকে। পিএসজির ‘অধরা’ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ট্রফি জয়ের মিশনে ‘প্রধান ট্রাম্পকার্ড’ও হয়ে উঠেন। কিলিয়ান এমবাপ্পের বিদায়ের পর ফরাসি ক্লাবটির পুরো আক্রমণভাগের ভার ডেম্বেলের কাঁধেই উঠে। ফলাফল, সেবার সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পিএসজির হয়ে ১১ ম্যাচে একাই ১৮টি গোল ছুঁয়ে নেন।
পিএসজিতে কোচ লুইস এনরিখেও তার জন্য বিশেষ বৈজ্ঞানিক রুটিন তৈরি করেন। হালকা চোট বা কাফ ইনজুরির সামান্যতম আভাসেই তাকে বিশ্রাম দেওয়া শুরু হয়। কোচের সেসব পরামর্শ ডেম্বেলে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন এবং দলের নতুন রণকৌশলে নিজের নতুন ভূমিকা দারুণভাবে উপভোগ করতে থাকেন। বার্সেলোনায় থাকার সময় তাকে নিয়ে অনেকের যে নেতিবাচক ধারণা ছিল, পিএসজির ডেম্বেলে যেন এর সম্পূর্ণ বিপরীত। যদিও পিএসজিতে ডেম্বেলের সময়টা যে একেবারেই সবসময় খুব মসৃণ কেটেছে, তা কিন্তু নয়। তবে একরোখা জেদ আর কোনো জয় করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা দিয়েই বন্ধুর পথে হেঁটেছেন তিনি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রেনের বিপক্ষে পিএসজির ৩-১ ব্যবধানের জয়ের পর কোচ এনরিখের সঙ্গে ডেম্বেলের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। এই ঘটনার জেরে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচের দল থেকে ডেম্বেলেকে পুরোপুরি বাদ দিয়ে দিয়েছিলেন কোচ। সে সময় লুইস এনরিখে বলেছিলেন, ‘যখন কোনো খেলোয়াড় দলের প্রতি তার বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিতেই হয়।’
পরবর্তীতে এনরিখে এ-ও বলেছিলেন, ‘লন্ডনে আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচে তাকে না খেলানোই ছিল আমার নেওয়া সেরা সিদ্ধান্ত, যদিও এর জন্য আমাকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এটি চলতি বছরে আমার নেওয়া সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। বাকি কাজটা সে (ডেম্বেলে) নিজেই (নিজেকে শুধরে) করেছে।’
অভাবনীয় পারফরম্যান্সে ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অরও জেতেন ডেম্বেলে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ মৌসুমেও দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন তিনি। লিগ ওয়ানে ১০ গোল ও ৭ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ৮ গোল ছুঁয়েছেন। পিএসজি টানা দুবারের শিরোপা উঁচিয়ে ধরার মঞ্চে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে তার এমন পারফরম্যান্স। যদিও চলতি মে’র শেষদিকে চোট কাটিয়ে ফেরা এই উইঙ্গার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আর্সেনালের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে আবারও প্রমাণ করেছেন বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে কতটা দক্ষ তিনি। সামনেই ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ, সেখানে ফ্রান্সের অন্যতম ‘ট্রাম্পকার্ড’ হিসেবে ভাবা হচ্ছে এই উইঙ্গারকে।