বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ১০ ঘটনা
বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফুটবলের লড়াই নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নাটকীয়তা, বিতর্ক, আবেগ আর অবিশ্বাস্য সব ঘটনা। বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত এসেছে, যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগে বিবিসি সাউন্ডসের জনপ্রিয় পডকাস্ট ‘ম্যাচ অব দ্য ডে: টপ টেন’-এ সাবেক ফুটবলার গ্যারি লিনেকার, অ্যালান শিয়ারার ও মাইকা রিচার্ডস বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ১০টি ঘটনা নিয়ে আলোচনা করেন।
১০. ল্যাম্পার্ডের ‘ভূতুরে গোল’
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে জার্মানির মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ড। ম্যাচে ২-১ গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের নেওয়া শট জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারের মাথার ওপর দিয়ে ক্রসবারে লেগে গোললাইন অতিক্রম করে। রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেলেও ম্যাচ কর্মকর্তারা গোল দেননি। সেই বিতর্কের পরই পরে ফুটবলে গোললাইন প্রযুক্তি চালু করা হয়।
মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘বলটি পরিষ্কারভাবে লাইন পার হয়েছিল। ওই আক্ষেপের পর ইংল্যান্ডের পুরো আত্মবিশ্বাসই ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল।’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘বলটা গোললাইনের এতটাই ভেতরে ছিল যে বলার বাইরে!’
৯. বিশ্বকাপ ছেড়ে চলে গেলেন রয় কিন
২০০২ বিশ্বকাপের আগে আয়ারল্যান্ড অধিনায়ক রয় কিন দলের অনুশীলন সুবিধা ও প্রস্তুতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পরে কোচ মিক ম্যাককার্থির সঙ্গে তীব্র বিরোধে জড়িয়ে তাকে দল থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই এই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘আমি তাকে (রয় কিন) কখনো এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনি। আসলে আসল সত্যটা কী, তা আমি জানি না।’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘ও ছিল দলের অন্যতম প্রধান ও অপরিহার্য খেলোয়াড়। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে এভাবে দল ছেড়ে রেগে চলে যাওয়া সত্যিই এক বিরাট ব্যাপার। আমাদের শো শেষ হওয়ার আগে ও কিন্তু কখনো এভাবে রাগ করে চলে যায়নি!’
৮. রিভালদোর নাটকীয় অভিনয়
২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্কের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান তারকা রিভালদোর ডাইভিং নিয়ে তৈরি হয় বড় বিতর্ক। হাকান উনসালের মারা বল তার হাঁটুতে লাগলেও রিভালদো মুখ চেপে ধরে মাঠে পড়ে যান। এতে উনসাল লাল কার্ড দেখেন। পরে রিভালদোকে জরিমানাও করে ফিফা।
মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘ও দীর্ঘক্ষণ মাঠে পড়ে ছিল। ও আসলে কী ভাবছিল তখন?’
অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘খুবই করুণ আর হাস্যকর অভিনয় ছিল। এখন দেখলে হাসি পায়।’
৭. সুয়ারেজের ‘হ্যান্ডবল’ বিতর্ক
২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ঘানার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে নিশ্চিত গোল হাত দিয়ে ঠেকান উরুগুয়ের লুইস সুয়ারেজ। তিনি লাল কার্ড দেখলেও পেনাল্টি মিস করেন আসামোয়া গিয়ান। পরে টাইব্রেকারে হেরে যায় ঘানা।
মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘সুয়ারেজ যেভাবে আনন্দ করছিল এবং অহংকার দেখাচ্ছিল, তা সত্যিই হতাশাজনক ছিল। এটা তো এক প্রকার প্রতারণাই, তাই না?’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘তোমার কি মনে হয় না ও নিজের চেয়ে নিজের দেশকে এগিয়ে রেখেছিল? ও প্রতারণা করেনি, ও একটা ফাউল করেছে মাত্র। কারণ ও যেকোনো মূল্যে জিততে চেয়েছিল।’
৬. রাইকার্ডের থুতু নিক্ষেপ
১৯৯০ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের ম্যাচে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড ও রুডি ফোলারের সংঘর্ষ বড় বিতর্ক তৈরি করে। লাল কার্ড দেখার পর মাঠ ছাড়তে গিয়ে রাইকার্ড দুবার ফোলারের গায়ে থুতু নিক্ষেপ করেন।
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘আমি জানি না কী কারণে ও ফোলারের গায়ে থুতু দিয়েছিল। একবার না হয় হুট করে রাগের মাথায় হয়ে যেতে পারে, কিন্তু দুই দুইবার করাটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
৫. সুয়ারেজের কামড় কাণ্ড
২০১৪ বিশ্বকাপে ইতালির ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড় বসান লুইস সুয়ারেজ। ম্যাচে কোনো কার্ড না পেলেও পরে চার মাসের জন্য নিষিদ্ধ হন তিনি।
অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘আমরা তখন স্টুডিওতে ছিলাম এবং সবাই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমরা নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে কী দেখলাম!’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘ও একটু কামড়াতে পছন্দ করে...’
৪. ম্যারাডোনার ডোপ টেস্ট ও বহিষ্কার
১৯৯৪ বিশ্বকাপে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা ডোপ টেস্টে নিষিদ্ধ উপাদান ‘এফিড্রিন’-এর জন্য পজিটিভ হন। পরে তাকে বিশ্বকাপ থেকে বহিষ্কার করা হয়। গ্রিসের বিপক্ষে গোল করার পর তার উন্মাতাল উদযাপনের ছবিটিও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।
মাইকা রিচার্ডস বলেন, ‘আমার মাঝে মাঝে ভাবি, তখন তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল।’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘বুয়েনস আইরেসে আমি তার সাথে দুটো দিন কাটিয়েছিলাম। সেটা ছিল পুরো পাগল করা এক অভিজ্ঞতা। ও যেখানেই যেত, হাজার হাজার মানুষ তাকে ঘিরে ধরত। মানুষ তাকে ঈশ্বরের মতো ভক্তি করত। হয়তো সেই অতিমানবীয় প্রতিভা আর মাত্রাতিরিক্ত জনপ্রিয়তার চাপ সামলানোই ছিল মূল সমস্যা।’
৩. ‘হ্যান্ড অব গড’
১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার করা ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বিতর্কগুলোর একটি। গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগে বল স্পর্শ করে হাত দিয়ে জালে পাঠান ম্যারাডোনা। পরে একই ম্যাচে শতাব্দীর সেরা গোলগুলোর একটি করেন তিনি। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জিতে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়।
অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘ম্যারাডোনা এরপর যে দ্বিতীয় গোলটি করেছিল—তার সেই অবিশ্বাস্য জাদুকরী নৈপুণ্যের কারণেই মানুষ তার এই অপরাধটাকে কিছুটা সহজভাবে মেনে নিয়েছিল।’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘আমি সাক্ষাৎকারে কতবার যে এই বিষয়ে কথা বলেছি তার হিসাব নেই, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো মাঠের ভেতর আমি নিজে ঘটনাটি দেখতে পাইনি। ম্যারাডোনা নিজেই পরে বলেছিলেন গোলটি কিছুটা ঈশ্বরের হাতে আর কিছুটা ম্যারাডোনার মাথায় লেগে হয়েছিল। এটা সম্ভবত ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ম্যাচ।’
২. জিদানের হেডবাট
২০০৬ বিশ্বকাপ ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে ফ্রান্স অধিনায়ক জিনেদিন জিদান মাথা দিয়ে আঘাত করেন ইতালির ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাত্সিকে। অতিরিক্ত সময়ে এই ঘটনার কারণে লাল কার্ড দেখেন তিনি। পরে টাইব্রেকারে জিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।
অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘বিশ্বকাপে কত কিছুই তো ঘটেছে, কিন্তু আমি এটা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ফুটবল মাঠে অনেকেই অনেক কথা বলে উসকানি দেয়, কিন্তু তার জবাবে এমন কাণ্ড...’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘ওই একটা ঘটনাই ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিয়েছিল, তাই না? আমি মাঠে উপস্থিত ছিলাম এবং ভাবছিলাম, ‘আরে, এটা কী হয়ে গেল!’’
১. ফাইনালের দল থেকে রোনালদোর বাদ পড়া ও নাটকীয় ফেরা
১৯৯৮ বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ব্রাজিলের তারকা স্ট্রাইকার রোনালদো রহস্যজনকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রথমে মূল একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগ মুহূর্তে আবারও তাকে দলে ফেরানো হয়। তবে পুরো ম্যাচে তাকে স্বাভাবিক মনে হয়নি এবং ব্রাজিল ফ্রান্সের কাছে ৩-০ গোলে হেরে যায়।
অ্যালান শিয়ারার বলেন, ‘ও ছিল সুপারস্টার। দলের জন্য ও কী ছিল আর ওর ওপর কী পরিমাণ চাপ ছিল—হয়তো সেই মানসিক চাপই ও সহ্য করতে পারেনি।’
গ্যারি লিনেকার বলেন, ‘এটা ছিল অত্যন্ত নজিরবিহীন এক ঘটনা। ও অসুস্থ শরীর নিয়েও খেলতে নেমেছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই তারা হেরে যায়, যার কারণে এই ঘটনা নিয়ে পরবর্তীতে অনেক ধরণের ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ডালপালা মেলেছিল।’