ফুটবল বিশ্বকাপে এশিয়া-আফ্রিকার সর্বোচ্চ সাফল্য সেমিফাইনাল, সব কাপ গেছে দুই মহাদেশে
ফুটবল বিশ্বকাপের প্রায় একশত বছরের ইতিহাসে শিরোপার সবগুলোই গেছে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর হাতে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ পর্যন্ত ইউরোপের দেশগুলো জিতেছে সর্বোচ্চ ১২টি শিরোপা, আর দক্ষিণ আমেরিকার ঝুলিতে আছে ১০টি ট্রফি। অন্যদিকে এশিয়া ও আফ্রিকার সর্বোচ্চ সাফল্য সেমিফাইনাল।
বিশ্বকাপে ইউরোপের পাঁচটি দেশ শিরোপা জিতেছে। ইতালি চারবার, জার্মানি চারবার, ফ্রান্স দুইবার, ইংল্যান্ড একবার এবং স্পেন একবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে। ব্রাজিল পাঁচবার, আর্জেন্টিনা তিনবার এবং উরুগুয়ে দুইবার ট্রফি ঘরে তুলেছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে সফল দল ব্রাজিল। তারা পাঁচবার শিরোপা জিতে নিজেদের ‘বিশ্বকাপের রাজা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার পর একমাত্র দেশ হিসেবে প্রতিটি আসরে অংশ নিয়েছে ব্রাজিল। তাদের প্রথম শিরোপা আসে ১৯৫৮ সালে। সেই আসরেই ১৭ বছর বয়সে অভিষেক হয়েছিল কিংবদন্তি পেলের। ফাইনালে দুটি গোল করে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
এরপর ১৯৬২ সালে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জিতে ব্রাজিল ইতিহাস গড়ে। ১৯৭০ সালে তৃতীয় শিরোপা জয়ের পর তারা স্থায়ীভাবে জুলে রিমে ট্রফি নিজেদের কাছে রাখার অধিকার পায়। পরে ১৯৯৪ সালে টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে চতুর্থবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় সেলেসাওরা। সেটিই ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম টাইব্রেকার ফাইনাল। সবশেষ ২০০২ সালে পঞ্চম শিরোপা জেতে ব্রাজিল।
পেলে, জিকো, রোমারিও, রোনালদো নাজারিও, রোনালদিনহো ও কাফুর মতো কিংবদন্তিদের হাত ধরে ব্রাজিল বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। তাদের আক্রমণাত্মক ও নান্দনিক ফুটবলধারা ‘জোগো বনিতো’ বা ‘সুন্দর ফুটবল’ নামে পরিচিত।
এখন পর্যন্ত একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের রেকর্ডও পেলের দখলে। তিনি ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
ব্রাজিলের পর সবচেয়ে সফল দেশ জার্মানি ও ইতালি। দুই দলই চারবার করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আর সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা আবারও নিজেদের শক্তিমত্তা প্রমাণ করেছে। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে ২০২২ সালে তৃতীয় শিরোপা জেতে আলবিসেলেস্তেরা।
তবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখনও কোনো এশিয়ান বা আফ্রিকান দেশ শিরোপা জিততে পারেনি। বিভিন্ন বিশ্লেষকের মতে, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থসংকট, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং বিশ্বকাপে তুলনামূলক কম কোটা পাওয়ার বিষয়টি।
এশিয়ার সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার হাত ধরে। ২০০২ বিশ্বকাপে জাপানের সঙ্গে যৌথ আয়োজক ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। সেই আসরে তারা ইতালি ও স্পেনের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছে যায়। শেষ পর্যন্ত চতুর্থ স্থান অর্জন করে তারা, যা এখনও কোনো এশিয়ান দেশের সেরা অর্জন।
আফ্রিকার সেরা সাফল্য এসেছে মরক্কোর মাধ্যমে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান ও আরব দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠে মরক্কো। গ্রুপ পর্বে শীর্ষে থেকে তারা শেষ ষোলোতে স্পেন এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে হারায়। যদিও সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে এবং তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে যায়, তবুও তাদের অর্জন বিশ্ব ফুটবলে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলো বহু বছর ধরে ফুটবল একাডেমি, স্কাউটিং এবং তরুণ খেলোয়াড় তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। অন্যদিকে আফ্রিকা ও এশিয়ার অনেক দেশ এখনও সেই মানের অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের অল্প বয়সে ইউরোপে পাড়ি জমানো। এতে খেলোয়াড়রা ব্যক্তিগতভাবে উন্নতি করলেও নিজ দেশের লিগ দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়ও কমে যায়।
আফ্রিকার অনেক ফুটবল ফেডারেশন দুর্নীতি, বেতন-বোনাস জটিলতা ও প্রশাসনিক অস্থিরতায় ভুগেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপে ক্যামেরুন দল বেতন-বোনাসের দাবিতে নির্ধারিত সময়ে দেশ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
বিশ্বকাপে আফ্রিকার কম কোটাও দীর্ঘদিনের বিতর্ক। আফ্রিকার ৫৪টি দেশের জন্য আগে ছিল মাত্র পাঁচটি স্থান। বিপরীতে ইউরোপের ৪৪টি দেশের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৩টি জায়গা। ২০২৬ বিশ্বকাপে কোটাবৃদ্ধি হলেও ইউরোপ এখনও সবচেয়ে বেশি সুযোগ পাচ্ছে।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে আফ্রিকার পথচলা নিয়ে ঔপনিবেশিকতার প্রসঙ্গও উঠে আসে। যখন আন্তর্জাতিক ফুটবল সংগঠিত হচ্ছিল, তখন আফ্রিকার বহু দেশ ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উপনিবেশ ছিল। ফলে বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার সুযোগও সীমিত ছিল।
এছাড়া ইউরোপের অনেক দল আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে খেলিয়েছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত একাধিক খেলোয়াড় ছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপে ফ্রান্স ও মরক্কোর সেমিফাইনাল ম্যাচকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে ‘আফ্রিকা বনাম আফ্রিকা’ বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
আফ্রিকান দেশগুলোর ক্রীড়া অবকাঠামোর দুর্বলতাও বড় সমস্যা। অনেক দেশে পর্যাপ্ত স্টেডিয়াম ও প্রশিক্ষণ সুবিধা নেই। ফলে বড় টুর্নামেন্ট আয়োজনও কঠিন হয়ে পড়ে।
ইউরোপ ও আমেরিকায় ক্রীড়াশিল্প বিশাল অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হলেও আফ্রিকায় সেই শিল্প এখনও পিছিয়ে। স্থানীয় খেলোয়াড়দের অনেকেই নিজ দেশে ফুটবল খেলে পর্যাপ্ত আয় করতে পারেন না। তাই উন্নত সুযোগের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমাতে হয়।
আফ্রিকান দলগুলোকে প্রায়ই পুরো মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। ফলে তাদের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি হয়। ২০১০ বিশ্বকাপে ঘানার আসামোয়া গিয়ান সেই চাপের অন্যতম উদাহরণ। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ পেনাল্টি মিস করার পর তিনি ব্যাপক সমালোচনা ও হুমকির মুখে পড়েন। অথচ সেই ম্যাচে লুইস সুয়ারেজ হাত দিয়ে গোল ঠেকিয়ে লাল কার্ড দেখেছিলেন।
১৯৮২ বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার ম্যাচ নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, দুই দল ইচ্ছাকৃতভাবে এমন ফল করেছিল যাতে আলজেরিয়া পরের রাউন্ডে উঠতে না পারে। অনেকের মতে, ফিফা তখন যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
২০২২ বিশ্বকাপে মরক্কো ও ক্রোয়েশিয়ার তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের রেফারিং নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। তবু সব সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কের মাঝেও মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা আফ্রিকান ফুটবলে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে শেষ চারে উঠে তারা নতুন ইতিহাস গড়েছে।