২৬ মে ২০২৬, ১১:১৯

আলভারেজের রূপকথার উত্থান, এক সিদ্ধান্তেই বদলে যায় ক্যারিয়ার

জুলিয়ান আলভারেজ   © সংগৃহীত

জুলিয়ান আলভারেজের বিশ্বকাপ যাত্রাটা যেন রূপকথার গল্পের মতোই। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বদলে যায় তার ক্যারিয়ারের পুরো চিত্রকল্প। কাতার বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনা দলে মূলত ব্যাক-আপ ফরোয়ার্ড ছিলেন তিনি। কোচ লিওনেল স্কালোনির পছন্দের তালিকায় সবার ওপরে ছিলেন ২০২১ কোপা আমেরিকা জয়ের অন্যতম নায়ক লাউতারো মার্টিনেজ।

কিন্তু বিশ্বমঞ্চে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে নাটকীয় পরাজয় এবং মেক্সিকোর বিপক্ষে ঘুরের দাঁড়ানোর ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন আলভারেজ। তবে পোল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তার পুরো ক্যারিয়ারগ্রাফই পাল্টে যায়। ওই ম্যাচে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে দলের হয়ে দ্বিতীয় ও জয়সূচক গোলটি করেন তিনি।

এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। রিভার প্লেট একাডেমি থেকে উঠে আসা এই তরুণ ফরোয়ার্ড আর্জেন্টিনার মূল একাদশে নিজের জায়গা স্থায়ী করে নেন। শেষমেশ ফাইনাল পর্যন্ত দলের আক্রমণভাগের অন্যতম ভরসায় পরিণত হন তিনি।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসায় আর্জেন্টাইন শিবিরে আলভারেজ ও মার্টিনেজকে হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। বর্তমানে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের অন্যতম ভরসার নাম আলভারেজ। অন্যদিকে ইন্টার মিলানের আক্রমণভাগ নেতৃত্ব দিচ্ছেন লাউতারো। দুজনেই বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শক্তিমত্তার প্রমাণ দিচ্ছেন। কোচও হয়তো তাদের ঘিরেই আক্রমণে নতুন ছক কষবেন।

তবে গত কয়েক বছরে আলভারেজের ভূমিকায় বেশ বদল দেখা গেছে। ইউরোপীয় ফুটবলে নিজেকে প্রমাণ করার পাশাপাশি প্রায় সব শিরোপাই ছুঁয়েছেন। তার অর্জনের তালিকায় কোপা লিবের্তাদোরেস, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, কোপা আমেরিকার শিরোপা রয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বেও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে ২৬ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড এখন আর্জেন্টিনার মূল একাদশের নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। দুর্দান্ত সমন্বয়, আক্রমণাত্মক প্রেসিং এবং নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কারণে দলের কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশও বনে গেছেন।

কাতারের বিশ্বমঞ্চে ৪টি গোল করে নিজেকে আলাদাভাবে পরিচিত করেছিলেন। এর মধ্যে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে তার জোড়া গোল আজও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বেশ স্মরণীয়। এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপকে সামনে রেখে আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন আর্জেন্টাইন এই ফরোয়ার্ড। এবারের বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে গ্রুপ ‘জে’-তে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া এবং জর্ডানের বিপক্ষে খেলবে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

সম্প্রতি ফিফার সঙ্গে আত্মবিশ্বাসী সুরেই খোলামেলা আলাপ সেরেছেন আর্জেন্টিনার ৯ নম্বর জার্সিধারী এই ফুটবলার। জুন-জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপকে সামনে রেখে নিজের লক্ষ্য ও দলের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার স্মরণীয় অভিযানের দিকগুলোও ফিরে দেখেন এই তারকা ফরোয়ার্ড। এ-ও স্মরণ করিয়ে দেন, একসময় ব্যাক-আপ ফরোয়ার্ড হিসেবে শুরু করলেও এখন তিনি আর্জেন্টিনা দলের অন্যতম প্রধান ভরসার নাম।

আলভারেজের ভাষ্যমতে, ‘আমরা প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু আমরা একসঙ্গে খেলার সুযোগও পাই, যা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের। আমরা যখনই একসঙ্গে মাঠে নেমেছি, ভালো করেছি এবং যখন আমাদের মধ্যে কেবল একজন ডাক পায়, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা সবাই দলের জন্য সেরাটাই চাই। এই অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা আমাদের উভয়কে প্রতিদিন আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করে। এটা সবসময় এমনই হয়। যখনই আপনার মাঝে তীব্র এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা থাকবে, প্রত্যেকেই আরও ভালো হয়ে উঠবে, যা মূল দিক।’

এই তারকা আরও জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ সামনে রেখে আর্জেন্টিনার ভেতরে সবসময়ই শিরোপা জয়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে এবং এবারও তার কোনো ব্যতিক্রম নয়।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে এবারের আসরে অংশ নেওয়াকে “অসাধারণ গর্বের বিষয়” বলে উল্লেখ আলভারেজ বলেন, ‘আর্জেন্টাইন হিসেবে উত্তেজনাটা সবসময়ই থাকে এবং আমরা সবসময়ই চ্যাম্পিয়ন হতে চাই। এবারের সময়টা ভিন্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা ফাইনালে পৌঁছাতে চাই। আমরা জানি এটা সহজ হবে না; এর জন্য আমাদের অনেক খাটতে হবে এবং ম্যাচের ভাগ্য খুব সামান্য ব্যবধানেও নির্ধারিত হতে পারে। তবে আমরা সম্ভাব্য সেরা প্রস্তুতি নেব এবং ধাপে ধাপে এগিয়ে যাব।বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এই বিশ্বকাপে অংশ নেওয়াটা এক কথায় অসাধারণ। আমি অত্যন্ত গর্বিত বোধ করছি। অবশ্যই, আমরা ট্রফিটি নিজেদের কাছেই রেখে দিতে চাই এবং আমাদের দেশের মানুষকে আবারও আনন্দে ভাসাতে চাই।’

বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র দুটি দেশের টানা দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার কীর্তি আছে। প্রথম দল হিসেবে ১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে এই রেকর্ড গড়ে ইতালি। এরপর ১৯৫৮ ও ১৯৬২ বিশ্বকাপে পেলের জাদু ও গারিঞ্চাদের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে একই কীর্তি গড়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু গত ৬৪ বছরে আর কোনো দেশ এই অর্জনে নাম লেখাতে পারেনি। আর্জেন্টিনার সামনে এবার সেই সুবর্ণ সুযোগ।

এ প্রসঙ্গে আলভারেজ বলেছেন, ‘আমরা যদি বিশ্বকাপ ধরে রাখতে পারি, তবে এটি ইতিহাসে লেখা থাকবে। কারণ, আমরা টানা দুবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি এই পথচলায় দুবার কোপা আমেরিকা জয়ের কীর্তিও গড়ব। গত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশের জন্য এটি একটি সোনালী অধ্যায়, তাই আমরা এই অবিশ্বাস্য মুহূর্তগুলোর আরও বেশি স্বাদ নিতে চাই, যা আমাদের সবাইকে এতটা আনন্দিত করে।’

আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অনেকেই বলছেন, লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এটি। তাই এই মহাতারকাকে ঘিরে বিশেষ পরিকল্পনাও সাজাচ্ছে আর্জেন্টাইন শিবির।

আলভারেজের ভাষ্যমতে, ‘আমরা সবাই পুরোপুরি সচেতন যে মেসির বয়সের কারণে এটিই হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ হতে পারে, তবে দিনশেষে সিদ্ধান্তটি তার নিজেরই। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি বিশেষ বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এবং আমি শুধু আমাদের, তার সতীর্থদের এবং আর্জেন্টিনার মানুষের কথাই বলছি না, বরং তাকে যারা দেখে এবং অনুসরণ করে সেই সমস্ত মানুষের কথাই বলছি, যেহেতু সে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। অবশ্যই, বিশ্বজুড়ে তার এক বিশাল প্রভাব রয়েছে।’

২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর নিজের পরিবর্তন প্রসঙ্গে আলভারেজের মন্তব্য, ‘আমি বলব না যে ২০২২ সালের পর থেকে আমার খেলার শৈলীতে খুব বেশি পরিবর্তন এসেছে, তবে আমি কিছু নতুন কৌশল শিখেছি এবং নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় উন্নতি করেছি। গত কয়েক বছরে প্রচুর ম্যাচ খেলার কারণে এখন আমার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। সর্বোপরি, এই জার্সিটি গায়ে জড়ানো আপনাকে একটি বাড়তি অনুপ্রেরণা যোগায় এবং আপনি নিজে টের না পেলেও সময়ের সাথে সাথে আপনার খেলায় উন্নতি আসে।’