২৪ মে ২০২৬, ১৮:৪২

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ কারা খেলেছে, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা কোথায়?

বিশ্বকাপ শিরোপাজয়ী দল   © সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপ কেবলই ট্রফি বা গোলের প্রতিযোগিতা নয়; বরং এমন এক মঞ্চ, যেখানে কোন জাতীয় দল প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নিজেদের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম এবং কীভাবে ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরের স্থায়ী অংশ হয়ে উঠেছে তারা। 

বিশ্বমঞ্চে অভিজ্ঞতার দিক থেকেও কিছু দেশ সত্যিই অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। এর মধ্যে এমন দলও আছে, যারা কেবল শিরোপাই নয়; বরং টুর্নামেন্টে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থে স্থায়ী অবস্থানও তৈরি করেছে।

এদিকে ইতোমধ্যেই বেজে উঠেছে বিশ্বকাপ দামামা। এবারের বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে ৪৮ দল অংশ নেবে। শিরোপা উল্লাসে মাততে বিশ্বমঞ্চে ধারাবাহিকতার বিকল্প নেই দলগুলোর সামনে। সেই লক্ষ্যে শেষমুহূর্তের প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত দলগুলো। 

বিশ্বমঞ্চে সবচেয়ে বেশি পাঁচবার শিরোপার মালিক ব্রাজিল। বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টের প্রত্যেকটি আসরেই অংশ নিয়েছে সেলেসাওরা, ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি এটি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সবচেয়ে বেশি শিরোপা জয়ের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও তাদের দখলে? উত্তর, হ্যাঁ। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতার কারণে সর্বাধিক ম্যাচ খেলার কৃতিত্বও ব্রাজিলেরই।

সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বমঞ্চে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল সেলেসাওরা। এরপর কোনো শিরোপা না পেলেও সবসময়ই বিশ্বকাপ ঘিরে আলোচনায় কেন্দ্রে থাকে লাটিন আমেরিকার দলটি। ইতিহাস, পরিসংখ্যান এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্স মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাদের অবস্থান এখনো অন্য দলগুলোর চেয়ে যোজন-যোজন এগিয়ে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে জার্মানি ও আর্জেন্টিনা নিজেদের পারফরম্যান্স ও ধারাবাহিক সাফল্যের মাধ্যমে সেই ব্যবধান ক্রমেই কমিয়ে আনছে। ফলে, আসন্ন বিশ্বকাপ সামনে রেখে শীর্ষ দেশগুলোর এই প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে উঠছে।

নেদারল্যান্ডস—৫৫ ম্যাচ

বিশ্বমঞ্চে এখনও শিরোপার স্বাদ পায়নি নেদারল্যান্ডস। তবে বিশ্বকাপে তাদের ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৫৫টি ম্যাচ খেলেছে তারা। এখন পর্যন্ত তিনবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেছে ডাচরা। তবে প্রতিবারই শিরোপার খুব কাছে গিয়েও তা ছুঁয়ে দেখা হয়নি। তবে তাদের ফুটবল ইতিহাসে একাধিক কিংবদন্তি প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। জোহান ক্রুইফ, ডেনিস বার্গক্যাম্প, আর্জেন রোবেন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে ভার্জিল ভ্যান ডাইক—প্রতিটি যুগেই নেদারল্যান্ডস বিশ্বমানের তারকা ফুটবলার দিয়েছে।

উরুগুয়ে—৫৯ ম্যাচ

ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল উরুগুয়ে। বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত মোট ৫৯টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড তাদের। এ ছাড়া দু’বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে ‘লা সেলেস্তে’ নামে পরিচিত দলটি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১৯৩০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও তাদের।

মেক্সিকো—৬৬ ম্যাচ

ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে অভিজ্ঞ দলগুলোর তালিকায় বেশ ওপরে মেক্সিকো। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে মোট ৬৬টি ম্যাচ খেলেছে দলটি। আধুনিক ফুটবলেও সবচেয়ে নিয়মিত অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে অন্যতম জায়গায় নিজেদের নিয়ে গেছে তারা। 

২০২৬ বিশ্বকাপে মেক্সিকো একটি অনন্য ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে ‘এল ত্রি’রা। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার পৃথকভাবে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছে তারা। সবমিলিয়ে বিষয়টি বৈশ্বিক এই টুর্নামেন্টের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ ও গভীর সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে।

স্পেন—৬৭ ম্যাচ

গেল কয়েক দশকে বিশ্ব ফুটবলে স্পেনের উত্থান বিশ্বকাপের মঞ্চেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশেষত্ব ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপজয়ী দলটি ফুটবল ইতিহাসে নতুন এক যুগের সূচনা করেছে। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, জাভি হার্নান্দেজ, ইকার ক্যাসিয়াস, সার্জিও রামোসদের নিয়ে গড়ে ওঠা সেই স্বর্ণালী প্রজন্ম বিশ্ব ফুটবলে আধিপত্য বিস্তার করেছিল। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে মোট ৬৭টি ম্যাচ খেলেছে ‘লা রোজা’রা।

ফ্রান্স—৭৩ ম্যাচ

বিশ্ব ফুটবলে ঐতিহাসিক পরাশক্তিগুলোর তালিকায় দ্রুতই নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে ফ্রান্স। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৭৩টি ম্যাচ খেলেছে ফরাসিরা। প্রতিটি আসরেও সমৃদ্ধ হচ্ছে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাস। ‘লে ব্ল্যুস’ নামে পরিচিত দলটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বিশ্ব ফুটবলে অন্যতম সফল শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপ ও ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে টানা দুটি ফাইনালে ওঠার কৃতিত্ব তাদের আধুনিক ফুটবল ইতিহাসকে নতুন উচ্চতায় নিয়েছে।

ইংল্যান্ড—৭৪ ম্যাচ

বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দল ইংল্যান্ড। এখন পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে ৭৪টি ম্যাচ খেলেছে তারা। তবে কেবল একবারই শিরোপা জয়ের স্বাদ পায় ‘থ্রি লায়ন্স’রা। ১৯৬৬ সালে নিজেদের মাটিতে একমাত্র শিরোপা ঘরে তোলে তারা। এরপর আর ট্রফি জিততে না পারলেও বিশ্বকাপের শেষদিকের লড়াইয়ে নিয়মিতভাবেই নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে দলটি।

ইতালি—৮৩ ম্যাচ

আধুনিক ফুটবল ইতিহাসে সাম্প্রতিক সময়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পেরোলেও বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ইতালি। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৮৩টি ম্যাচ খেলেছে তারা। এ ছাড়া চারবার বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের গৌরব অর্জন করেছে ‘আজ্জুরি’রা। ব্রাজিলের পর সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ জয়ের তালিকায়ও অন্যতম সফল দল তারা।

আর্জেন্টিনা—৮৮ ম্যাচ

কাতারে শিরোপা জয়ের পর বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহাসিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ব্যবধান কমায় আর্জেন্টিনা। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ৮৮টি ম্যাচ খেলেছে ‘লা আলবিসেলেস্তে’রা। লিওনেল মেসির নেতৃত্বে কাতার বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজেদের তৃতীয় শিরোপা ঘরে তোলে আর্জেন্টিনা।

জার্মানি—১১২ ম্যাচ

ধারাবাহিকতাকেই যেন নিজেদের ঐতিহ্য বানিয়ে ফেলেছে জার্মানি। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ইউরোপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দল হিসেবে এখন পর্যন্ত ১১২টি ম্যাচ খেলেছে তারা। তবে শুধু অংশগ্রহণেই সীমাবদ্ধ থাকেনি জার্মানরা; বরং সেমিফাইনাল, ফাইনাল কিংবা সরাসরি চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াই—বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে জার্মানির উপস্থিতি নিয়মিত দৃশ্য।

ব্রাজিল—১১৪ ম্যাচ

বিশ্বকাপ নিয়ে যেকোনো আলোচনায় সবার আগেই ব্রাজিলের নাম উঠে আসে। ফুটবলের সবচেয়ে সফল দেশ হিসেবে ঐতিহাসিক এই তালিকাতেও সবার ওপরে ‘সেলেসাও’রা। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১১৪টি ম্যাচ খেলেছে তারা। এ ছাড়া ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে একমাত্র দল হিসেবে প্রতিটি আসরে অংশ নিয়েছে তারা।

পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা শুধু শিরোপার সংখ্যাতেই নয়, কিংবদন্তি ফুটবলার তৈরির ক্ষেত্রেও অনন্য। পেলে, রোনালদো, রোমারিও, রোনালদিনিয়ো থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের নেইমার জুনিয়র কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র—প্রতিটি যুগেই বিশ্ব ফুটবলকে সুপারস্টার দিয়েছে তারা।