কখনো কলেজে না পড়লেও ৫ ভাষায় কথা বলতে পারেন মেসি
ফুটবল যেন লিওনেল মেসির শ্বাস-প্রশ্বাস। ছোটবেলার সেই রোজারিও শহরের গলিতে হাতে স্কুলব্যাগ আর পায়ে ফুটবল নিয়ে দৌড়ানো ছেলেটিই আজ বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম। বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর—ফুটবলের প্রায় সব অর্জনই তার দখলে। তবুও নিজের জীবনকে ফিরে দেখলে এখনো কিছু জায়গায় আফসোস জাগে এই আর্জেন্টাইন মহাতারকার।
৩৮ বছর বয়সী ইন্টার মায়ামি তারকা লিওনেল মেসি কখনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেননি। এমনকি কলেজে পা না রাখলেও ফুটবল মাঠের মহাদক্ষতায় বিশ্বকে বুড়ো আঙুল দেখানো লিওনেল মেসি এখন স্প্যানিশ ও কাতালানসহ মোট ৫টি ভাষায় নিজের ভাব প্রকাশ করতে পারেন।
শৈশবে পড়াশোনায় পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়া এবং ইংরেজি ভালোভাবে না শেখার কারণে বর্তমান জীবনে নামী মানুষের ভিড়ে মাঝে মাঝে নিজের মধ্যে তীব্র আক্ষেপ ও অস্বস্তি জাগলেও ভাষাগত এই দক্ষতা তাঁর জীবনের এক অন্যরকম অর্জন। সম্প্রতি মেক্সিকান পডকাস্ট ‘মিরো দে আত্রাস’-এ আর্জেন্টিনার সাবেক গোলকিপার নাহুয়েল গুজমানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইন্টার মায়ামির এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা পড়াশোনা নিয়ে নিজের ভেতরের এমন কিছু লুকানো অনুশোচনার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।
ফুটবলকে ভালোবেসে শৈশব থেকেই দিনরাত সাধনা করা ৩৮ বছর বয়সী লিওনেল মেসির প্রাপ্তির খাতাটা ফুটবল দুনিয়ায় কানায় কানায় পূর্ণ। বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সব শিরোপাই তিনি নিজের করে নিয়েছেন এবং ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁর নামটা সবার ওপরেই শোভা পায়। তবে খেলার মাঠের বাইরে সাধারণ জীবনের কিছু অদক্ষতা এখন বড্ড পোড়ায় এই কিংবদন্তিকে। বিশেষ করে ছোটবেলায় ভালো শিক্ষা না নেওয়া ও ইংরেজি ভাষাটা ঠিকঠাক রপ্ত না করার আক্ষেপ সন্তানদের সামনেও প্রকাশ করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে নিজের মনের সেই অস্বস্তিকর অনুভূতির কথা জানিয়ে মেসি বলেন, ‘অনেক বিষয়েই আমার আফসোস আছে। আমি সন্তানদের বলি; ভালো শিক্ষা না নেওয়া, ছোটবেলায় ইংরেজি না শেখা—এসব নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে। আমার লেখাপড়া করার সময় ছিল, সে জন্য আফসোস হয়।’
ভাষাগত সমস্যার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেমন লাগে তা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ‘এমন সময় আসে, যখন নামীদামি মানুষের সঙ্গে থাকতে হয়, কথা বলতে বা আলাপ করতে হয়, তখন নিজেকে অজ্ঞ মনে হয়। তখন ভাবি, কী বোকা আমি, কত সময় নষ্ট করেছি!’
অথচ রেকর্ড আর রাজকীয় কীর্তিতে মোড়ানো জীবনের শুরুতে ১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক অতি সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচিত্তিনি। চার ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় এই ছোট্ট ছেলেটি এক হাতে স্কুলব্যাগ আর অন্য হাতে ফুটবল নিয়ে রোজারিওর ‘জেনারেল লাস হেরাস’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে যেতেন।
তাঁর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মারিয়া সোলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, 'মেসি ছিলেন ভীষণ লাজুক, ভদ্র আর মনোযোগী ছাত্র, যে কি না অনুশীলনের ব্যস্ততার মাঝেও বাড়ির কাজ শেষ করার চেষ্টা করতেন।' কিন্তু মাত্র ১০ বছর বয়সে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতিজনিত রোগ ধরা পড়লে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। চিকিৎসার আকাশচুম্বী খরচ জোগাতে যখন তাঁর পরিবার হিমশিম খাচ্ছিল, ঠিক তখন ত্রাতা হয়ে পাশে দাঁড়ায় স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনা।
তারা মেসির চিকিৎসার সমস্ত দায়িত্ব নিয়ে মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁকে স্পেনের বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে নিয়ে আসে। নতুন দেশ আর সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কঠিন লড়াইয়ের পাশাপাশি বার্সেলোনা তাঁকে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করায়, যেখানে সেস্ক ফ্যাব্রেগাস ও জেরার্ড পিকের মতো ভবিষ্যৎ তারকারাও পড়তেন।
তবে কঠোর অনুশীলন, নিয়মিত ম্যাচ আর চিকিৎসার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় নিয়মিত হওয়া মেসির জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবুও ক্লাবের ব্যক্তিগত শিক্ষকদের সহায়তায় শেষ পর্যন্ত ১৭ বছর বয়সে ‘লিওন ত্রয়োদশ’ স্কুল থেকে স্কুলের উচ্চমাধ্যমিক বা ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন তিনি।
এরপরই মূলত তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের ইতি ঘটে এবং তিনি কলেজে পড়ার আর সুযোগ পাননি। একবার এক চীনা ফুটবল বিশ্লেষককে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও মেসি নিশ্চিত করেছিলেন যে তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত।
কলেজে না পড়লেও জীবনের অভিজ্ঞতা আর পেশাদার ফুটবলের প্রয়োজনে মেসি নিজেকে ভাষাগতভাবে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে মোট ৫টি ভাষায় যোগাযোগ করতে পারেন। মেসির মাতৃভাষা স্প্যানিশ, যা তাঁর মূল যোগাযোগের মাধ্যম এবং সব সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই ভাষাতেই কথা বলেন।
এ ছাড়া বার্সেলোনায় দীর্ঘ ২০ বছরেরও বেশি সময় কাটানোর ফলে সেখানকার আঞ্চলিক ভাষা কাতালানেও তিনি সমভাবে দক্ষ ও সাবলীল হয়ে ওঠেন। অনেকেরই ধারণা মেসি ইংরেজি পারেন না, তবে ইন্টার মায়ামির সতীর্থদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মেসি এখন ইংরেজি বেশ ভালোভাবে বোঝেন এবং মাঠের কৌশলগত নির্দেশনা ও সাধারণ কথাবার্তায় ইংরেজি ব্যবহার করতে পারেন।
যদিও একসময় ইংরেজিতে কথা বলতে দারুণ অস্বস্তি বোধ করতেন এবং নিজের স্ত্রী আন্তোনেলার সাহায্য নিতেন। এর বাইরে ফরাসি ক্লাব পিএসজিতে খেলার সময় তিনি কিছু সাধারণ ফরাসি বাক্য শিখেছিলেন এবং নিজের ইতালীয় বংশোদ্ভূত পারিবারিক আবহের কারণে কিছুটা ইতালিয়ান ভাষাও বুঝতে ও বলতে পারেন।
ব্যক্তিগত জীবনে স্ত্রী আন্তোনেলা ও তিন সন্তানকে নিয়ে সুখী সুশৃঙ্খল এক পারিবারিক জীবনের অধিকারী মেসি নিজের জীবনের এই না পাওয়ার শিক্ষাগুলো এখন সন্তানদের মানুষ করার ক্ষেত্রে কাজে লাগাচ্ছেন। তিন সন্তান যেন জীবন ও সময়ের প্রতিটি সুযোগকে দুই হাত পেতে গ্রহণ করে, সেই শিক্ষাই দিচ্ছেন এই ব্যালনে ডি’অর জয়ী তারকা।
মেসি নিজেই জানিয়েছেন, ‘আমার কোনো কিছুর অভাব ছিল না, বাবা সব সময়ই সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ওদের সামনে আরও বেশি সুযোগ রয়েছে।’ বার্সেলোনার হয়ে ১০টি লা লিগা ও ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এবং ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দেওয়া এই মহাতারকা হয়তো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বারান্দা মাড়াননি, তবে মাঠ, ড্রেসিংরুম ও জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে তিনি নেতৃত্ব, ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার যে অনন্য পাঠ নিয়েছেন, সেটিই মূলত তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে।