হোসে মরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদে প্রত্যাবর্তন: কার লাভ, কার ক্ষতি
দীর্ঘ ১৩ বছর পর আবারও রিয়াল মাদ্রিদের ডাগআউটে ফিরছেন হোসে মরিনহো। ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের বহুদিনের ইচ্ছা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিয়েছে। সোমবার বিভিন্ন গণমাধ্যম জানায়, দ্বিতীয় মেয়াদে মরিনহোর সঙ্গে চুক্তি করেছে স্প্যানিশ জায়ান্টরা। খবর গোল ডট কম।
মরিনহোর ফেরার গুঞ্জন অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই ছিল। গত মাসে খবর আসে, জানুয়ারিতে বরখাস্ত হওয়া জাভি আলোনসোর জায়গায় দায়িত্ব নেওয়া আলভারো আরবেলোয়ার পরিবর্তে নতুন কোচ হিসেবে মরিনহোকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ পেরেজের। তবে রিয়ালের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত অনেককেই বিস্মিত করেছে।
এই মুহূর্তে রিয়াল মাদ্রিদ ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ সমালোচনার মুখে, ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র, এমনকি সতীর্থের আক্রমণে একজন খেলোয়াড় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এর মধ্যে সমর্থকদের একাংশ তারকা স্ট্রাইকারদের বিক্রির দাবিতে স্বাক্ষর অভিযান শুরু করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে মরিনহোকে ফেরানোকে অনেকে আগুনে ঘি ঢালার মতো সিদ্ধান্ত বলেই মনে করছেন।
জয়ী: হোসে মরিনহো
ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আত্মবিশ্বাসী কোচ মরিনহো হয়তো মনে করছেন, তিনি আবার নিজের জায়গাতেই ফিরেছেন। তবে বাস্তবতা হলো, একসময়কার ‘দ্য স্পেশাল ওয়ান’ এখন আর আগের মতো সফল নন।
বেনফিকা হয়তো তাকে ধরে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু তার আগের চার ক্লাব— ফেনারবাহচে, রোমা, টটেনহ্যাম ও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড— তাকে বিদায় দিতেই স্বস্তি পেয়েছে।
২০১০ সালে যখন প্রথমবার রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন মরিনহো, তখন তাকে বিশ্বের সেরা কোচদের একজন ধরা হতো। ইন্টারের হয়ে ট্রেবল জিতে তিনি রিয়ালে এসেছিলেন। এর আগে চেলসি ও পোর্তোর হয়ে ইতিহাস গড়া সাফল্যও পেয়েছিলেন।
তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ২০১৫ সালের পর আর কোনো লিগ শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। গত নয় বছরে তার একমাত্র ট্রফি উয়েফা কনফারেন্স লিগ।
সম্প্রতি কয়েকজন তরুণ কোচের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন মরিনহো। অথচ গত এক দশকে নিজেও তেমন কোনো বড় সাফল্য দেখাতে পারেননি। তাই রিয়ালের মতো ক্লাবে ফেরার সুযোগ পাওয়াটা তার জন্য বড় অর্জন বলেই মনে করা হচ্ছে। এখন তার সামনে সুযোগ এসেছে আবারও নিজেকে প্রমাণ করার।
পরাজিত: ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ
অবশেষে আবারও নিজের পছন্দের মানুষকে ফিরিয়ে আনলেন ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। রিয়াল সভাপতি বরাবরই মনে করেন, এই ক্লাব সামলাতে বিশেষ ব্যক্তিত্বের দরকার হয়। সেই জায়গায় জিনেদিন জিদান ও কার্লো আনচেলত্তি ছিলেন শান্ত, ধীরস্থির ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। নিজেদের সফল খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ারের কারণেই তারা ড্রেসিংরুমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু মরিনহো সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। তিনি উত্তেজনা কমানোর বদলে প্রায়ই নতুন বিতর্কের জন্ম দেন। কোথাও গেলে ‘সত্যের বোমা’ ফাটানো যেন তার স্বভাব।
একসময় তার অনুপ্রেরণামূলক কৌশল খুব কার্যকর ছিল। কিন্তু এখন সেই জাদু আগের মতো কাজ করছে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রিয়ালে তার প্রথম মেয়াদও পুরোপুরি সফল ছিল না।
বার্সেলোনার আধিপত্য ভেঙে লা লিগা জেতা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন ছিল। কিন্তু ড্রেসিংরুমের অস্থিরতা ও খেলোয়াড়দের সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে তার মেয়াদ আগেভাগেই শেষ হয়ে যায়। ক্লাব কিংবদন্তি সার্জিও রামোস ও ইকার কাসিয়াসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। এমনকি কাসিয়াস প্রকাশ্যে তার ফেরার বিরোধিতাও করেছিলেন।
তবুও পেরেজ এখনো বিশ্বাস করেন, মরিনহোই রিয়ালকে উদ্ধার করতে পারবেন। বলা যায়, নিজের সভাপতির ভবিষ্যৎও তিনি এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করিয়ে দিয়েছেন। তবে এই ঝুঁকি সফল হওয়ার সম্ভাবনার চেয়ে ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই বেশি বলে মনে করছেন অনেকে।
জয়ী: বার্সেলোনা
জাভি আলোনসো রিয়ালের কোচ হওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েই দেখেছিলেন বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিক। কারণ, জার্মান জাতীয় দলের কোচ থাকাকালে আলোনসোর ফুটবল দর্শনে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি।
আলোনসোর আগমনকে রিয়ালের আধুনিক ফুটবলে ফেরার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছিল। ধারণা করা হয়েছিল, ব্যক্তিনির্ভর ফুটবলের বদলে দলীয় খেলাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন ক্লাব কর্তারা।
শুরুও হয়েছিল দুর্দান্তভাবে। মৌসুমের প্রথম এল ক্লাসিকোয় ২-১ গোলে জিতে বার্সেলোনার চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে গিয়েছিল রিয়াল।
কিন্তু ফল খারাপ হতে শুরু করতেই পরিস্থিতি বদলে যায়। একদিকে আলোনসো ধৈর্য ধরে নতুন দল গড়তে চাইছিলেন, অন্যদিকে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নেতৃত্বে কিছু তারকা খেলোয়াড় অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন।
শেষ পর্যন্ত পেরেজ খেলোয়াড়দের পক্ষই বেছে নেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় আলোনসো অধ্যায়।
এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেও আলোনসোর সুনাম বেড়েছে, আর পেরেজের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই কারণেই আবারও মরিনহোর শরণাপন্ন হয়েছেন তিনি।
বার্সেলোনা অবশ্য মরিনহোকে পুরোপুরি হালকাভাবে নিচ্ছে না। কারণ, আগের মেয়াদে তিনি রিয়ালকে লা লিগা ও কোপা দেল রে জিতিয়েছিলেন। তবে বর্তমান বাস্তবতায় কাতালানদের খুব বেশি উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণও নেই।
হান্সি ফ্লিক ইতোমধ্যে তরুণ ও ঐক্যবদ্ধ দল নিয়ে টানা দুইবার শিরোপা জিতেছেন। অন্যদিকে মরিনহো এমন একটি ড্রেসিংরুমে যাচ্ছেন, যেখানে বিভক্তি স্পষ্ট।
তাই আগামী মৌসুমে লা মাসিয়ার তরুণ বার্সা দল রিয়ালের তারকাবহুল কিন্তু অস্থির স্কোয়াডকে সহজেই ছাপিয়ে যেতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।