১৯ মে ২০২৬, ০৯:৩১

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে নতুন তারকা রায়ান, কেন তাকে নিয়ে এত আলোচনা?

ব্রাজিলের তরুণ স্ট্রাইকার রায়ান   © টিডিসি ফটো

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পেয়েছেন তরুণ স্ট্রাইকার রায়ান। ইংলিশ ক্লাব বোর্নমাউথে যোগ দেওয়ার পর থেকেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ১৯ বছর বয়সী এই ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার। আর সেই পারফরম্যান্সই তাকে জায়গা করে দিয়েছে কার্লো আনচেলত্তির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে।

প্রিমিয়ার লিগে পা রেখেই নিজের শক্তি, গতি ও গোল করার সামর্থ্য দিয়ে নজর কেড়েছেন রায়ান। জানুয়ারির শেষ দিকে ভাস্কো দা গামা থেকে বোর্নমাউথে যোগ দেন তিনি। দলটিতে যোগ দেওয়ার পরপরই মাঠে নামানো হয় তাকে। খুব দ্রুতই বোঝাতে শুরু করেন কেন এই তরুণ স্ট্রাইকারের পেছনে ৩৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে ইংলিশ ক্লাবটি।

উলভারহ্যাম্পটনের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নেমে প্রথমবার নিজের সামর্থ্যের ঝলক দেখান রায়ান। ম্যাচে ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার জোয়াও গোমেসকে হারিয়ে বক্সের ভেতরে অ্যালেক্স স্কটকে বল বাড়িয়ে দেন, সেখান থেকেই আসে গোল। সেই ম্যাচের পরই কোচ আন্দোনি ইরাওলা তাকে মূল একাদশে জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ঘরের মাঠে অভিষেক ম্যাচেই অ্যাস্টন ভিলার বিপক্ষে অসাধারণ একক নৈপুণ্যে গোল করে দলকে ১-১ সমতায় ফেরান তিনি। ডান প্রান্ত থেকে ভেতরে ঢুকে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে পোস্টের কোণ ঘেঁষে বল জালে জড়ান রায়ান।

এভারটনের বিপক্ষে শুরুটা অবশ্য ভালো হয়নি। নিজেদের রক্ষণভাগ থেকে আক্রমণ গড়তে গিয়ে বল হারিয়ে প্রতিপক্ষকে পেনাল্টি উপহার দেন তিনি। তবে কিছুক্ষণ পরই ভুল শুধরে ফার পোস্টে দারুণ এক হেডে গোল করে বোর্নমাউথকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন।

দক্ষিণ আমেরিকার অনেক খেলোয়াড়েরই প্রিমিয়ার লিগের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। কিন্তু রায়ানের ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। প্রথম তিন ম্যাচেই দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলেছেন তিনি।

রায়ান অবশ্য হুট করেই এই পর্যায়ে আসেননি। ভাস্কো দা গামায় খেলার সময় লিভারপুলের সাবেক তারকা ফিলিপে কুতিনহোর সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগ করেছেন। কুতিনহো তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা ছিলেন। এছাড়া ওয়েস্ট হ্যামের সাবেক ফুটবলার দিমিত্রি পায়েতের কাছ থেকেও শিখেছেন অনেক কিছু।

২০২৪ সালে বাহিয়ার বিপক্ষে এক ম্যাচে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ পুরস্কার জেতার পর পায়েত নিজ হাতে সেই পুরস্কার রায়ানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনা তরুণ এই ফুটবলারের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেয়।

ভাস্কোতে খেলার সময় ক্রিস্টাল প্যালেসের নতুন সাইনিং ম্যাথিউস ফ্রাঞ্চার সঙ্গেও ছিলেন তিনি। ফ্রাঞ্চার ইনজুরি ও আত্মবিশ্বাস হারানোর অভিজ্ঞতা কাছ থেকে দেখেছেন রায়ান। ফলে অল্প বয়সে ইউরোপে পাড়ি জমানোর ঝুঁকিও ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

ব্রাজিলিয়ান লিগে ১৪ গোল করার পর ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেয়েছিলেন রায়ান। তবে তিনি খুব হিসেব করেই বোর্নমাউথকে বেছে নেন। তার বিশ্বাস ছিল, তরুণ খেলোয়াড় গড়ে তুলে বড় ক্লাবে পাঠানোর ক্ষেত্রে বোর্নমাউথের সুনাম তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

শৈশব থেকেই ভাস্কো দা গামার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল রায়ানের। তার বাবা একসময় ক্লাবটির ব্যাকআপ সেন্টার-ব্যাক ছিলেন এবং পরে যুব একাডেমিতে কাজ করেন। মা-ও কাজ করতেন ক্লাবটিতে। মাত্র ছয় বছর বয়সে ভাস্কোর একাডেমিতে যোগ দেন রায়ান।

ছোটবেলায় ক্লাব কিংবদন্তি রবার্তো দিনামিতের সঙ্গে তার একটি ভিডিও এখনও ভাস্কো সমর্থকদের মধ্যে জনপ্রিয়। ফলে অনেকেই মনে করতেন, ভাস্কোর জার্সিতেই বড় তারকা হয়ে উঠবেন তিনি।

ব্রাজিল অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলেছেন রায়ান। তবে গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ দলে খেললেও তখন তাকে খুব বড় প্রতিভা হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। কারণ সেই সময় পর্যন্ত তার নামের পাশে ছিল মাত্র একটি লিগ গোল।

কিন্তু ২০২৫ সালে বদলে যায় সবকিছু। ধারাবাহিক উন্নতির মাধ্যমে ব্রাজিলিয়ান লিগের অন্যতম সেরা গোলদাতায় পরিণত হন তিনি। শুরুতে রাইট উইংয়ে খেললেও পরে নিজেকে পূর্ণাঙ্গ সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে গড়ে তোলেন।

তার ডান পায়ের দক্ষতাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এখন দুই দিকেই আক্রমণ করতে পারেন, যা ডিফেন্ডারদের জন্য তাকে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ বানিয়েছে। সতীর্থদের সঙ্গে ছোট ছোট পাসের সমন্বয়, বক্সে উপস্থিতি ও হেডিং দক্ষতা—সব মিলিয়ে আরও পরিণত হয়েছেন রায়ান।

তবে এখনও নিজেকে নিখুঁত খেলোয়াড় বলা যাবে না। কোচ ইরাওলা ও ভাস্কোর সাবেক কোচ ফার্নান্দো দিনিজ দুজনই মনে করেন, পিঠে গোলপোস্ট রেখে বল নিয়ন্ত্রণ ও খেলার ক্ষেত্রে আরও উন্নতি করতে হবে তাকে।

দিনিজ একবার বলেছিলেন, 'রায়ান যাতে এখানে থেকে যায়, তার জন্য আমি সাধ্যমতো সবকিছু করেছি।'

দলবদলের সময় তিনি আরও বলেন, 'আমি মনে করি ও এখন দল ছেড়ে দিয়ে একটা ঝুঁকি নিচ্ছে। এটি ভালোও হতে পারে, তবে আমি নিশ্চিত যে রায়ানের জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত হতো এখানে আরও একটি মৌসুম থেকে যাওয়া এবং নিজেকে আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করে তারপর পাড়ি জমানো।'

তবে আপাতত প্রিমিয়ার লিগে রায়ানের শুরুটা তার সিদ্ধান্তকেই সঠিক প্রমাণ করছে। যদিও সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা এখন তাকে নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করবে। তার কাট-ইন, হেডিং কিংবা শারীরিক শক্তি—সবকিছু ঠেকানোর উপায় খুঁজবে তারা।

এখন দেখার বিষয়, প্রিমিয়ার লিগে দুরন্ত শুরু করা এই তরুণ ব্রাজিলিয়ান নিজের ছন্দ ধরে রাখতে পারেন কি না। কারণ শুরুটা তিনি করেছেন একদম চলন্ত ট্রেনের মতো।