প্রোটিনের জন্য সেরা কোন ডাল, প্রতিদিন খাবেন কোনটি?
প্রতিদিনের খাবারে ডাল থাকলে একসঙ্গে মেলে পুষ্টি ও প্রোটিন। তবে সব ডালে প্রোটিনের পরিমাণ এক নয়। সাধারণ কিছু ডালের মধ্যে মাসকলাই ও মসুর ডালে প্রোটিন সবচেয়ে বেশি। তাই প্রোটিনের ঘাটতি পূরণে কোন ডাল এগিয়ে, আর প্রতিদিনের পাতে কোনটি রাখা ভালো—তা জানতে ডালের পুষ্টিগুণের পার্থক্য জানা জরুরি।
প্রোটিনসমৃদ্ধ, সাশ্রয়ী এবং প্রতিদিনের খাবারের পরিচিত একটি পদ হলো ডাল। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও ডাল বেশ সমৃদ্ধ। তবে সব ধরনের ডালে সমান পরিমাণ প্রোটিন থাকে না। তাই প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে কোন ডাল বেছে নেওয়া ভালো, সেটি জানা গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় উপমহাদেশে খাবারের অন্যতম প্রধান অংশ ডাল। কর্মব্যস্ত দিনের সাধারণ ডাল-ভাত হোক কিংবা বিশেষ দিনের মজাদার ডাল মাখনি—বিভিন্ন ধরনের ডাল মানুষের উদ্ভিদভিত্তিক প্রোটিনের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস। তবে সব ডালের পুষ্টিগুণ এক নয়। প্রতি ১০০ গ্রামে কিছু ডালে অন্যগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি প্রোটিন থাকে। তাই পুরো খাদ্যাভ্যাসে বড় কোনো পরিবর্তন না এনে প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে চাইলে কয়েক ধরনের ডাল বিশেষভাবে বেছে নেওয়া যেতে পারে।
কোন ডালে সবচেয়ে বেশি প্রোটিন?
২০২৩ সালে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন মাইক্রোবায়োলজি’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের ডালের পুষ্টিগুণ তুলনা করা হয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা ডালে প্রোটিনের পরিমাণ ছিল—
মাষকলাই ডাল: ২৫.২১ গ্রাম প্রোটিন
মসুর ডাল: ২৪.৬৩ গ্রাম প্রোটিন
মুগ ডাল: ২৩.৮৬ গ্রাম প্রোটিন
রাজমা: ২২.৫৩ গ্রাম প্রোটিন
ছোলার ডাল: ২০.৪৭ গ্রাম প্রোটিন
তালিকার শীর্ষে থাকা মাসকলাই ডাল ও মসুর ডালের মধ্যে প্রোটিনের পার্থক্য খুবই কম। তাই প্রোটিনের দিক থেকে এই দুটি ডালকে প্রায় সমানভাবে এগিয়ে রাখা যায়। এর পরেই রয়েছে মুগ ডাল। ছোলার ডালও ভালো প্রোটিনের উৎস হলেও শীর্ষের ডালগুলোর তুলনায় এতে কয়েক গ্রাম কম প্রোটিন থাকে।
মাসকলাই ও মসুর ডাল নিয়ে পুষ্টিবিদদের মত
শুধু প্রোটিনের পরিমাণ নয়, শরীরে ডাল কীভাবে কাজ করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অন্ত্র ও হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আলকা বিজয়নের মতে, মসুর ডাল ও মাষকলাই ডাল শরীরে ভিন্নভাবে কাজ করে।
তার মতে, মসুর ডালের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা শরীরের পিত্তের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং লিভারের কার্যকারিতায় সহায়তা করতে পারে। তিনি প্রতিদিনের খাবারে অড়হর ডাল পরিবর্তে মসুর ডাল খাওয়ার পরামর্শ দেন। তার দাবি, অতিরিক্ত অড়হর ডাল খেলে শরীরে বাতের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে এবং অন্ত্র, চুল ও ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, মসুর ডাল কিডনিতে পাথর এবং অনিয়মিত মাসিকের মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে মাষকলাই ডাল বেশিরভাগ ডালের তুলনায় ভিন্নভাবে কাজ করে। ডা. বিজয়নের মতে, এটি শরীরে আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত শুষ্কতা তৈরি করে না। হাড়ের বিভিন্ন সমস্যা, যেমন অস্টিওপোরোসিস ও অস্টিওআর্থ্রাইটিসের ক্ষেত্রে তিনি মাষকলাই ডাল খাওয়ার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি এটি মলের পরিমাণ স্বাভাবিক রাখতে এবং রক্তপ্রবাহ ভালো রাখতেও সহায়তা করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
দুটি ডালই পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হলেও শরীরে তাদের প্রভাব আলাদা। তাই ব্যক্তির প্রয়োজন ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে কোন ডাল বেশি উপযোগী হবে, তা ভিন্ন হতে পারে।
শুধু ডাল খেলেই কি পর্যাপ্ত প্রোটিন পাওয়া যায়?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রোটিন থাকা ডালও একা ‘সম্পূর্ণ প্রোটিন’ নয়।
প্রোটিন ২০ ধরনের অ্যামিনো অ্যাসিড দিয়ে তৈরি। এর মধ্যে ৯টি অ্যামিনো অ্যাসিড শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। খাবারের মাধ্যমে এসব অ্যামিনো অ্যাসিড গ্রহণ করতে হয়।
ডাল লাইসিনের ভালো উৎস হলেও এতে মেথিওনিনের পরিমাণ কম থাকে। অন্যদিকে চাল ও গমে মেথিওনিন প্রচুর থাকলেও লাইসিনের পরিমাণ কম।
এ কারণেই ভারতীয় খাবারে ঐতিহ্যগতভাবে ডালের সঙ্গে কোনো না কোনো শস্যজাতীয় খাবার রাখা হয়। যেমন—ডাল-ভাত, ডাল-রুটি, খিচুড়ি কিংবা ডাল-ঢোকলি। এটি শুধু খাবারের প্রচলিত ধরন নয়; এর পেছনে পুষ্টিগত কারণও রয়েছে।
ডাল ও চাল বা গম একসঙ্গে খেলে একটি খাবারে যে অ্যামিনো অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে, অন্যটি তা পূরণ করে। ফলে দুটি অসম্পূর্ণ প্রোটিন একসঙ্গে মিলে শরীরের জন্য আরও সম্পূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড সরবরাহ করতে পারে।
কোন ডাল বেছে নেবেন?
আপনি যদি বেশি প্রোটিন পেতে চান, তাহলে মাষকলাই ডাল বেছে নিতে পারেন। সাধারণ ডালের মধ্যে এতে সবচেয়ে বেশি বা প্রায় সর্বোচ্চ পরিমাণ প্রোটিন থাকে। এ ছাড়া মাষকলাই ডাল দিয়ে ডাল মাখনি, ইডলি ও দোসার মতো বিভিন্ন খাবার তৈরি করা যায়।
অন্যদিকে মসুর ডালও প্রোটিনের দিক থেকে প্রায় একই পর্যায়ে রয়েছে। এটি দ্রুত রান্না হয় এবং স্বাদও তুলনামূলকভাবে হালকা। তাই দ্রুত তৈরি করা যায় এমন খাবারের জন্য মসুর ডাল ভালো বিকল্প হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রোটিনের পরিমাণকে অগ্রাধিকার দিলে সাধারণভাবে খাওয়া ডালগুলোর মধ্যে মাষকলাই ডাল ও মসুর ডাল তালিকার শীর্ষে রয়েছে। তবে শুধু ডাল খাওয়ার বদলে এর সঙ্গে চাল, গম বা মিলেটের মতো শস্যজাতীয় খাবার যোগ করলে শরীর আরও ভারসাম্যপূর্ণ অ্যামিনো অ্যাসিড পায়। ফলে ডাল একা খাওয়ার তুলনায় এমন সমন্বিত খাবার পুষ্টির দিক থেকে বেশি কার্যকর।