বেশি মিষ্টি খেলেই কি টাক পড়ে? চিনি খাওয়ার সঙ্গে চুল পড়ার আসল সম্পর্ক কী
মিষ্টি খেতে ভালোবাসেন? মাঝে মধ্যে রসগোল্লা, সন্দেশ বা কেক খেলেই টাক পড়ে যাবে—বিষয়টি এমন নয়। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত চিনি বা চিনিযুক্ত পানীয় খাওয়ার অভ্যাস চুল পড়ার ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বেশি পরিমাণে চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণের সঙ্গে পুরুষদের টাক পড়ার ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করেনি যে চিনি খেলেই টাক পড়ে।
গবেষকেরা ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১ হাজার ২৮ জন পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, যারা সপ্তাহে সাতবারের বেশি চিনিযুক্ত পানীয় পান করতেন, তাদের পুরুষদের সাধারণ টাক বা অ্যান্ড্রোজেনেটিক অ্যালোপেশিয়ার ঝুঁকি কম চিনিযুক্ত পানীয় পান করা ব্যক্তিদের তুলনায় বেশি ছিল। তবে গবেষণাটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক হওয়ায় চিনি খাওয়াই টাক পড়ার সরাসরি কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
কেন মিষ্টি বেশি খেলে চুল পড়ার সমস্যা বাড়তে পারে?
ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স
অতিরিক্ত চিনি খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এমন খাবার খাওয়ার অভ্যাস থাকলে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিতে পারে। একে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। এ ধরনের বিপাকীয় পরিবর্তন চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে চিনির কারণে মাথার ত্বকের রক্তনালি সরাসরি সংকুচিত হয়ে চুল পড়ে—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ
অতিরিক্ত চিনি ও চিনিযুক্ত খাবার দীর্ঘমেয়াদে শরীরে বিপাকীয় সমস্যা ও প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। এসব পরিবর্তন চুলের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চিনি খাওয়ার কারণে প্রদাহ তৈরি হয়ে সরাসরি চুলের গোড়া দুর্বল হয়—এমন সরাসরি কারণ-ফল সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
চুল পড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হরমোন ও বংশগতির প্রভাব। বিশেষ করে পুরুষদের বংশগত টাক পড়ার ক্ষেত্রে ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন বা ডিএইচটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত চিনি খাওয়া বিপাকীয় ও হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে চিনি সরাসরি ডিএইচটির মাত্রা বাড়িয়ে টাক তৈরি করে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
চুলের স্বাভাবিক জীবনচক্রেও বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। চুলের বৃদ্ধি, বিশ্রাম এবং ঝরে পড়ার এই চক্র বিভিন্ন হরমোন, বয়স, পুষ্টি, মানসিক চাপ ও অন্যান্য শারীরিক অবস্থার কারণে বদলে যেতে পারে।
পুষ্টির ঘাটতি
মিষ্টিজাতীয় খাবারে সাধারণত ক্যালোরি বেশি থাকলেও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে অতিরিক্ত মিষ্টি খাওয়ার কারণে যদি পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ কমে যায়, তাহলে আয়রন, জিঙ্কসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে। এসব পুষ্টির ঘাটতি চুল পড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু মিষ্টি কমানো নয়, সুষম খাবার খাওয়াও চুলের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রেই নয়, চিনিযুক্ত পানীয় ও চুল পড়ার সম্পর্ক নিয়ে তরুণ নারীদের ওপরও গবেষণা হয়েছে। ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ১ হাজার ১৬৯ নারীর ওপর করা একটি গবেষণায় সপ্তাহে সাতবারের বেশি চিনিযুক্ত পানীয় পান করা বা সপ্তাহে বেশি পরিমাণে এসব পানীয় গ্রহণের সঙ্গে চুল পড়ার বেশি ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এই সম্পর্ক নিশ্চিত করতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
ফলমূলের প্রাকৃতিক চিনি নিয়ে অবশ্য একই কথা প্রযোজ্য নয়। গোটা ফলে চিনি থাকার পাশাপাশি ফাইবারসহ নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। মূল উদ্বেগ বেশি পরিমাণে যোগ করা চিনি ও চিনিযুক্ত পানীয় নিয়ে।
তাই মাঝে মধ্যে মিষ্টি খেলে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। তবে নিয়মিত অতিরিক্ত মিষ্টি, মিষ্টিযুক্ত পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমানো ভালো। চুল অতিরিক্ত পড়তে থাকলে শুধু চিনি খাওয়াকে দায়ী না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ চুল পড়ার পেছনে বংশগতি, হরমোন, পুষ্টির ঘাটতি, মানসিক চাপসহ নানা কারণ থাকতে পারে।