সকালে কফি পান কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? জানুন বিশেষজ্ঞের মতামত
সকালের এক কাপ কফি অনেকের কাছেই দিনের শুরু করার অনিবার্য অভ্যাস। তবে এই অভ্যাস শুধু ঘুম কাটাতেই নয়, যকৃতের সুস্থতা রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ সেথি। দীর্ঘ চিকিৎসা-অভিজ্ঞতা ও গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বলেছেন, পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত কফি পান করলে যকৃতের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমতে পারে এবং লিভারের কার্যকারিতাও ভালো থাকতে পারে।
বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষের দিন শুরু হয় এক কাপ কফি দিয়ে। অনেকের কাছে সকালে কফি পান করা শুধু একটি অভ্যাসই নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। জনপ্রিয়তার কারণে এই অভ্যাসটি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও জনপ্রিয় সংস্কৃতিতেও প্রায়ই আলোচনায় আসে।
কিন্তু প্রতিদিন সকালে কফি পান করা কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী?
এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট ডা. সৌরভ সেথি। তিনি ভারতের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস), হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। গত ৩১ জুলাই নিজের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, সকালে এক কাপ কফি পান করা যকৃতের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে উপকারী অভ্যাসগুলোর একটি।
দুই দশকেরও বেশি সময়ের চিকিৎসা-অভিজ্ঞতায় ১০ হাজারের বেশি লিভার স্ক্যান পর্যালোচনা করার পর তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তিনি চারটি কারণ তুলে ধরে ব্যাখ্যা করেছেন কেন প্রতিদিন সকালে কফি পান করা উপকারী হতে পারে।
প্রথমত, কফি যকৃতকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
ডা. সৌরভ সেথি বলেন, ‘যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে কফি অন্যতম সেরা পানীয়। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত কম হতে পারে।’
লিভার সিরোসিস এমন একটি অবস্থা, যেখানে দীর্ঘদিনের ক্ষতির কারণে যকৃতে স্থায়ী দাগ বা ক্ষত তৈরি হয়। অতিরিক্ত মদ্যপান, দীর্ঘমেয়াদি হেপাটাইটিস বি বা সি সংক্রমণ এবং ফ্যাটি লিভার রোগ এর প্রধান কারণ। এ অবস্থায় যকৃত স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না এবং একবার গুরুতর ক্ষতি হলে তা পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না।
দ্বিতীয়ত, নিয়মিত কফি পান লিভারের এনজাইমের মাত্রা উন্নত করতে পারে।
ডা. সেথির মতে, লিভারের এনজাইমগুলো শরীরের বিপাকক্রিয়া, বিষাক্ত পদার্থ অপসারণ এবং খাবার হজমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, লিভারের প্রধান এনজাইমগুলো হলো অ্যালানিন ট্রান্সঅ্যামিনেজ (ALT), অ্যাসপার্টেট ট্রান্সঅ্যামিনেজ (AST), গামা-গ্লুটামাইল ট্রান্সফারেজ (GGT) এবং অ্যালকালাইন ফসফাটেজ (ALP)।
তিনি বলেন, ‘নিয়মিত কফি পান করলে ALT ও AST-এর মাত্রা কমতে দেখা যায়। এই দুটি লিভারের কার্যকারিতা মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।’
তৃতীয়ত, কফি ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে। এই রোগে অ্যালকোহল পান না করলেও যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমে।
ডা. সেথি বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি তিনজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত। কফি এমন কয়েকটি পানীয়ের একটি, যার উপকারিতার পক্ষে শক্তিশালী ও ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।’
চতুর্থত, শুধু সাধারণ কফিই নয়, ক্যাফেইনবিহীন কফিও উপকারী হতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, কফির সব উপকারিতা শুধু ক্যাফেইনের কারণে পাওয়া যায়। তবে ডা. সেথির মতে, এই ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়।
তিনি বলেন, ‘সাধারণ কফির পাশাপাশি ক্যাফেইনবিহীন (ডিক্যাফ) কফিও একই ধরনের স্বাস্থ্যগত উপকার দিতে পারে।’
তার ভাষায়, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, কফির সুরক্ষামূলক প্রভাবের বড় অংশ আসে পলিফেনল নামের উদ্ভিজ্জ যৌগ থেকে, শুধু ক্যাফেইন থেকে নয়। এমনকি ডিক্যাফ কফি পানকারীদের ক্ষেত্রেও লিভারের এনজাইমের একই ধরনের ইতিবাচক উন্নতি দেখা গেছে।’
ডা. সৌরভ সেথির মতে, পরিমিত পরিমাণে প্রতিদিন সকালে কফি পান করা যকৃতের সুস্থতা বজায় রাখতে কার্যকর একটি অভ্যাস হতে পারে। তবে যাদের বিশেষ স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্যাফেইন গ্রহণ সীমিত রাখতে হয়, তাদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে কফি পান করা উচিত।