২ বছরের কম বয়সী শিশুদের চিনি কম খাওয়ালে ব্রেইন ভালো হয়, বলছে গবেষণা
জীবনের প্রথম দুই বছরে শিশুদের কম চিনি খাওয়ানো হলে ভবিষ্যতে তাদের মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ভালো থাকতে পারে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু দুই বছর বয়সের আগ পর্যন্ত কম চিনি খেয়েছে, তাদের পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক কম ছিল। তবে গবেষকরা বলছেন, এটি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিলেও সরাসরি কারণ-ফল প্রমাণ করে না। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের একটি বিশেষ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সে সময় দেশটিতে চিনির রেশনিং ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার পর মানুষের খাদ্যতালিকায় হঠাৎ করেই চিনির পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়।
গবেষণার ফল বলছে, যারা চিনির রেশনিং চলাকালে, বিশেষ করে দুই বছর বয়সের আগ পর্যন্ত বড় হয়েছে, তাদের মধ্যে পরবর্তী জীবনে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৩ শতাংশ কম ছিল।
এটি প্রথম গবেষণা নয়, যেখানে জীবনের প্রথম এক হাজার দিনকে ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের খাদ্যব্যবস্থার পরিবর্তনকে ‘প্রাকৃতিক পরীক্ষা’ হিসেবে ব্যবহার করে এ বিষয়ে একাধিক গবেষণা চালিয়ে আসছেন।
১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যে চিনির রেশনিং শেষ হওয়ার পর একজন মানুষের দৈনিক চিনি গ্রহণের পরিমাণ গড়ে প্রায় ৪১ গ্রাম (প্রায় ১০টি চিনির কিউব) থেকে বেড়ে ৮০ গ্রামে (প্রায় ২০টি চিনির কিউব) পৌঁছে যায়।
আগের গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, রেশনিং শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত চিনি গ্রহণের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ইউকে বায়োব্যাংক প্রকল্পে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন চীনের গুয়াংজুর হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকরা।
তারা চিনির রেশনিং শেষ হওয়ার আগে ও পরে জন্ম নেওয়া শিশুদের তথ্য তুলনা করেন। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা দুই বছর বয়স পর্যন্ত রেশনিংয়ের সময় বড় হয়েছে, তাদের ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি ২৩ শতাংশ কম ছিল। পাশাপাশি তাদের ক্ষেত্রে গড়ে আড়াই বছর পরে ডিমেনশিয়া শনাক্ত হয়েছে।
গবেষক জিয়াঝেন ঝেং বলেন, ‘আমাদের গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, জীবনের একেবারে শুরুর দিকে চিনি সীমিত রাখলে দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকার হতে পারে।’
এই গবেষণার ফলাফল নিউরোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
তবে ঝেং সতর্ক করে বলেন, ‘চিনি আসলেই এই প্রভাব ফেলছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।’
স্বাধীন অলাভজনক গবেষণা নেটওয়ার্ক কোক্রেনের এভিডেন্স প্রোডাকশন অ্যান্ড মেথডস ডিরেক্টরেটের মেথডস সাপোর্ট ইউনিটের প্রধান র্যাচেল রিচার্ডসন বলেন, ‘তারা হয়তো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ের সন্ধান পেয়েছেন।’
তবে তিনি যোগ করেন, ‘এটিকে এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ বলা যাবে না, যা দেখায় শৈশবে বেশি চিনি খাওয়াই সরাসরি ডিমেনশিয়ার কারণ।’
রিচার্ডসন বলেন, গবেষণাটির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে অংশগ্রহণকারীরা বাস্তবে কতটুকু চিনি খেতেন, তা জানা যায়নি। শুধু জানা গেছে, তারা চিনির রেশনিং চলাকালে নাকি পরে জন্মেছিলেন।
তার ভাষায়, ‘এই গবেষণার তথ্য ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকে জন্ম নেওয়া মানুষের ওপর ভিত্তি করে। তাই বর্তমান সময়ের শিশুদের ক্ষেত্রে এটি কতটা প্রযোজ্য, তা সীমিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সে সময় শিশুদের কঠিন খাবার খাওয়ানো বর্তমানের তুলনায় অনেক আগে শুরু হতো। ফলে শিশুদের প্রাথমিক পুষ্টি আজকের তুলনায় ভিন্ন ছিল।’
অ্যাস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসির অধ্যাপক ইয়ান মেইডমেন্ট বলেন, ‘এটি একটি আকর্ষণীয় ধারণা। এটি আলোচনা এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। তবে আমার মতে, আরও শক্ত প্রমাণ প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রায় ৮০ বছর আগের একটি ঘটনার সঙ্গে বর্তমানের স্বাস্থ্যগত অবস্থার সম্পর্ক স্থাপন করতে গেলে আরও অনেক বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে।’
আলঝেইমার্স রিসার্চ ইউকের গবেষক ডা. সারা রদ্রিগেজ বলেন, ‘এটি একটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা ছিল—এ বিষয়টি মনে রাখা জরুরি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের গবেষণা খাদ্যাভ্যাস ও ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্ক দেখাতে পারে। তবে এটি প্রমাণ করতে পারে না যে কম চিনি খাওয়ালে সরাসরি ডিমেনশিয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করা সবচেয়ে ভালো উপায়। আর ইতিবাচক পরিবর্তন আনার জন্য কখনোই দেরি হয়ে যায় না।’