পেটের মেদ কমাতে চিয়া সিড নাকি তোকমা—কোনটি বেশি কার্যকর?
ওজন কমাতে চাইলে অনেকেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় চিয়া সিড বা তোকমা যোগ করেন। দেখতে প্রায় একই রকম হওয়ায় অনেকেই মনে করেন, দুটি বীজের কাজও এক। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। কোনোটিই সরাসরি পেটের মেদ গলিয়ে দেয় না। তবে সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে খেলে দুটিই ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে কাজের ধরন ভিন্ন। তাই আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী কোনটি বেশি উপকারী, তা জানা জরুরি।
চিয়া সিডে রয়েছে প্রচুর দ্রবণীয় আঁশ, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড এবং উদ্ভিজ্জ প্রোটিন। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এটি জেলির মতো স্তর তৈরি করে, যা খাবার হজমের গতি কমায় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভূতি দেয়।
'দ্য জার্নাল অব নিউট্রিশন'-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের খাদ্যতালিকায় আঁশের পরিমাণ বেশি, তাদের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। পাশাপাশি ক্যালোরি নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস মেনে চলতেও সুবিধা হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় আরও দেখা গেছে, চিয়া সিড খুব দ্রুত ওজন কমায় না। তবে নিয়মিত খেলে কোমরের মাপ কিছুটা কমতে পারে। অর্থাৎ শরীরের মধ্যভাগে জমে থাকা চর্বি কমাতে এটি কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু চিয়া সিড খেয়েই পেটের মেদ কমানো সম্ভব নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের সঙ্গে এটি যুক্ত করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
অন্যদিকে তোকমা, যা তুলসি বীজ নামেও পরিচিত, এতে প্রচুর খাদ্য আঁশ রয়েছে। পানিতে ভিজিয়ে রাখলে এটি খুব দ্রুত ফুলে যায়। 'ফুডস' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, তোকমা বীজের ৩০ শতাংশের বেশি অংশই খাদ্য আঁশ। এই আঁশ হজমের গতি কমিয়ে দ্রুত পেট ভরা অনুভূতি তৈরি করে। ফলে ক্ষুধা কমে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
হজমস্বাস্থ্যবিষয়ক আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, অম্বল, গ্যাস, পেট ফাঁপা ও খাবারের পর ভারী লাগার সমস্যা কমাতে তোকমা উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় মানুষ যেটিকে পেটের মেদ মনে করেন, সেটি আসলে গ্যাস বা পেট ফাঁপার কারণে হয়ে থাকে। তোকমা সরাসরি চর্বি পোড়ায় না। তবে এটি হজমে স্বস্তি দেয় এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে।
চিয়া সিড ও তোকমার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো কাজের ধরনে। চিয়া সিড ধীরে ধীরে কাজ করে। এটি দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে, বিপাকক্রিয়াকে সহায়তা করে এবং সময়ের সঙ্গে কোমরের মাপ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্যদিকে তোকমা দ্রুত কাজ করে। এটি দ্রুত ক্ষুধা কমায়, পেট ফাঁপা ও অম্বল কমাতে সাহায্য করে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
দুটি বীজেরই সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এতে থাকা দ্রবণীয় আঁশ, যা ওজন নিয়ন্ত্রণ ও অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনটি খাবেন, তা নির্ভর করবে আপনার প্রয়োজনের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে ওজন ও পেটের মেদ কমানোর পাশাপাশি বিপাকক্রিয়া ভালো রাখতে চাইলে চিয়া সিড কিছুটা বেশি উপকারী হতে পারে।
অন্যদিকে যদি আপনার পেট ফাঁপা, অম্বল বা অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাস থাকে, তাহলে তোকমা ভালো বিকল্প হতে পারে।
অনেক পুষ্টিবিদ আবার দুটি বীজ পালা করে খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ এগুলো একে অপরের বিকল্প নয়, বরং ভিন্ন ভিন্নভাবে শরীরকে উপকার করে।
বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিন ১ থেকে ২ চা-চামচ চিয়া সিড বা তোকমা পানিতে ভিজিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন। এগুলো লেবুর পানি, স্মুদি বা দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায়। তবে শুকনো অবস্থায় কখনোই খাওয়া উচিত নয়।
এ ছাড়া এগুলোকে মূল খাবারের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে চিয়া সিড বা তোকমা—কোনোটিই সরাসরি পেটের মেদ কমায় না। তবে দুটিই ভিন্ন উপায়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে পেটের মেদ কমানোর ক্ষেত্রে পুষ্টিগুণের কারণে চিয়া সিড কিছুটা এগিয়ে থাকতে পারে। আর দ্রুত ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, অম্বল ও পেট ফাঁপার সমস্যা কমাতে তোকমা বেশি কার্যকর। তবে সবচেয়ে ভালো ফল পেতে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পরিমিত খাবার এবং সক্রিয় জীবনযাপনের কোনো বিকল্প নেই।