৩০ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫১

দিনে কতটি ডিম খাওয়া উচিত? জানুন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

ডিম   © সংগৃহীত

ডিম নিয়ে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই নানা বিতর্ক রয়েছে। একসময় অনেকে মনে করতেন, ডিমে কোলেস্টেরল বেশি থাকায় এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার বর্তমানে অনেকেই ডিমকে সবচেয়ে পুষ্টিকর খাবারের একটি হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে—প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি ঠিক? কুসুম খাওয়া উচিত, নাকি ফেলে দেওয়া ভালো? সিদ্ধ ডিম কি ভাজা ডিমের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর? আর দিনে কতটি ডিম খাওয়া নিরাপদ?

আপনিও যদি ডিম খেতে পছন্দ করেন, তাহলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার ভিত্তিতে জেনে নিন ডিম খাওয়ার সঠিক নিয়ম।

ডিমের স্বাস্থ্য উপকারিতা কী?

ডিমকে পুষ্টির ভাণ্ডার বলা হয়। কারণ একটি বড় ডিমে প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিডই রয়েছে। তাই ডিমকে ‘সম্পূর্ণ প্রোটিন’ বলা হয়।

এ ছাড়া ডিমে রয়েছে কোলিন, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি–১২, সেলেনিয়াম এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি, যা শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে ভূমিকা রাখে।

পুষ্টিবিদ শালিনী সুধাকর বলেন, অনেকেই ডিমের কুসুম ফেলে দেন। কিন্তু এটি ঠিক নয়। তিনি পুরো ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেন। কারণ কুসুমে ভিটামিন এ, ডি, ই এবং বি–১২সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান থাকে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, ডিমে থাকা কোলিন, লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন মস্তিষ্ক ও চোখের সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দিনে কতটি ডিম খাওয়া উচিত?

সবার জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তবে পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।

পুষ্টিবিদ ডা. রূপালি দত্তের মতে, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক একজন মানুষ সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন প্রতিদিন একটি করে ডিম খেতে পারেন।

শিশুরা সাধারণত প্রতিদিন একটি ডিম খেতে পারে। এটি তাদের শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে সহায়তা করে।

তবে যাদের হৃদ্‌রোগ রয়েছে বা এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাদের ডিম খাওয়ার পরিমাণ নির্ধারণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে তাদের জন্য আলাদা খাদ্য পরিকল্পনা করা হতে পারে।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের গবেষণাও বলছে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন একটি সম্পূর্ণ ডিম হৃদ্‌স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

ডিম খাওয়ার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উপায় কোনটি?

ডিম কীভাবে রান্না করছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পুষ্টিবিদ শালিনী সুধাকরের মতে, সিদ্ধ, পোচ বা অল্প তেলে স্ক্র্যাম্বল করা ডিম সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। কারণ এসব পদ্ধতিতে অতিরিক্ত তেল বা চর্বি ব্যবহার করতে হয় না।

তিনি কুসুম না ফেলে পুরো ডিম খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ ভিটামিন ও পুষ্টি উপাদান কুসুমেই থাকে।

ডিমের সঙ্গে সবজি, ওটস বা পূর্ণ শস্যজাতীয় খাবার খেলে খাবারটি আরও সুষম হয়। এতে শরীর প্রয়োজনীয় আঁশও পায়, যা ডিমে থাকে না।

বিশেষজ্ঞরা কাঁচা ডিম না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ রান্না করা ডিমের প্রোটিন শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে এবং খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিও কমে যায়।

ডিম কি সত্যিই হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর?

অনেক বছর ধরে শুধু কোলেস্টেরল বেশি থাকার কারণে ডিমকে হৃদ্‌স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বলা হতো।

তবে নতুন গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়।

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন প্রমাণ ধারাবাহিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে শর্ত হলো, ডিমকে অবশ্যই একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে খেতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ডিমের সঙ্গে কী খাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সবজি ও পূর্ণ শস্যের সঙ্গে ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যকর। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত মাংস, পরিশোধিত শর্করা বা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারের সঙ্গে ডিম খেলে সেই সুবিধা পাওয়া যায় না।

অতিরিক্ত ডিম খেলে কি সমস্যা হতে পারে?

যেকোনো স্বাস্থ্যকর খাবারের মতো ডিমও পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত।

অতিরিক্ত ডিম খেয়ে যদি অন্য প্রোটিনের উৎসগুলো এড়িয়ে যান, তাহলে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি প্রোটিন খেয়ে যদি পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাবার না খাওয়া হয়, তাহলে অনেকের পেট ফাঁপা বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা হতে পারে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিম খেলে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল এবং মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে এইচডিএল বা ভালো কোলেস্টেরলের মাত্রাও বাড়তে পারে। তবে সবার শরীর একইভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা শুধু একটি খাবারের ওপর নির্ভর না করে পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেন।

সব মিলিয়ে ডিম অত্যন্ত পুষ্টিকর একটি খাবার। এতে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি শরীরের প্রয়োজনীয় অনেক ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের জন্য এটি নিয়মিত খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে।

তবে শুধু দিনে কতটি ডিম খাচ্ছেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়। ডিম কীভাবে রান্না করছেন, কীসের সঙ্গে খাচ্ছেন এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস কতটা সুষম—এসব বিষয়ও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, ডিম নিয়ে অযথা ভয় পাওয়ার চেয়ে পরিমিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই সবচেয়ে ভালো।