ওজন কমাতে চান? নিয়মিত পান করুন এই ৮ স্বাস্থ্যকর পানীয়
ওজন কমাতে শুধু কম খাওয়াই যথেষ্ট নয়, সঠিক পানীয় বেছে নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার পাশাপাশি কিছু পানীয় ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করতে পারে। এসব পানীয় শরীরের বিপাকক্রিয়া (মেটাবলিজম) বাড়াতে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ কমাতে সাহায্য করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি, কফি, আদা চা, উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত পানীয় এবং আরও কয়েকটি স্বাস্থ্যকর পানীয় নিয়মিত পান করলে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হতে পারে। তবে এগুলো কোনো জাদুকরী সমাধান নয়। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও সক্রিয় জীবনযাত্রার অংশ হিসেবে এগুলো সবচেয়ে ভালো ফল দেয়।
১. গ্রিন টি
গ্রিন টি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্বাস্থ্যকর পানীয়গুলোর একটি। এতে রয়েছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং বিভিন্ন উপকারী উদ্ভিজ্জ যৌগ, যা ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রিন টি নিয়মিত পান করলে শরীরের ওজন ও অতিরিক্ত মেদ কমতে পারে। ১৪টি গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যারা ১২ সপ্তাহ ধরে উচ্চমাত্রার গ্রিন টি পান করেছেন, তারা অন্যদের তুলনায় গড়ে ০.২ থেকে ৩.৫ কেজি পর্যন্ত বেশি ওজন কমিয়েছেন।
এর প্রধান কারণ গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেচিন নামের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি শরীরের চর্বি পোড়াতে এবং মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করে।
মাচা (ম্যাচা) গ্রিন টির একটি বিশেষ ধরন। এতে সাধারণ গ্রিন টির তুলনায় বেশি ক্যাটেচিন থাকে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ৩ গ্রাম মাচা গ্রহণ করেছেন, তারা ব্যায়ামের সময় বেশি চর্বি পোড়াতে সক্ষম হয়েছেন।
এ ছাড়া গ্রিন টিতে থাকা ক্যাফেইন শক্তি বাড়ায়, ব্যায়ামের সক্ষমতা উন্নত করে এবং ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করে। নিয়মিত গ্রিন টি পান করলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও কিছু ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করতে পারে।
২. কফি
কফি শুধু ঘুম দূর করতেই নয়, ওজন কমাতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কফিতে থাকা ক্যাফেইন শরীরের মেটাবলিজম বাড়ায়, ক্যালরি খরচ বৃদ্ধি করে এবং ক্ষুধা কিছুটা কমাতে সাহায্য করে।
৩৩ জন স্থূলকায় প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশি ক্যাফেইনযুক্ত কফি পান করেছেন, তারা অন্যদের তুলনায় কম ক্যালরি গ্রহণ করেছেন।
আরও কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাফেইন শরীরের চর্বি পোড়ানোর হার বাড়াতে সাহায্য করে। দীর্ঘমেয়াদে যারা ওজন কমিয়ে তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন, তাদের মধ্যে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় গ্রহণের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল।
৩. ব্ল্যাক টি
গ্রিন টির মতো ব্ল্যাক টিতেও এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ব্ল্যাক টি প্রস্তুতের সময় চা পাতাকে বেশি সময় অক্সিজেনের সংস্পর্শে রাখা হয়। ফলে এর রং গাঢ় হয় এবং স্বাদও আরও তীব্র হয়।
এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও অন্যান্য পলিফেনল ক্যালরি গ্রহণ কমাতে, চর্বি ভাঙতে এবং অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
১১১ জন মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা তিন মাস ধরে প্রতিদিন তিন কাপ ব্ল্যাক টি পান করেছেন, তাদের ওজন ও কোমরের মাপ অন্যদের তুলনায় বেশি কমেছে।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্ল্যাভোনয়েডসমৃদ্ধ খাবার ও পানীয় বেশি গ্রহণকারী নারীদের শরীরের মেদ ও পেটের চর্বি তুলনামূলক কম ছিল।
৪. পানি
পানি সবচেয়ে সহজ, সস্তা এবং কার্যকর স্বাস্থ্যকর পানীয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করলে শরীর সুস্থ থাকে, পাশাপাশি ওজন কমানোর প্রক্রিয়াও সহজ হয়। খাবারের আগে পানি পান করলে পেট ভরা অনুভূতি তৈরি হয়। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমে।
৪৮ জন স্থূলকায় ব্যক্তির ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কম ক্যালরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি প্রতিবার খাবারের আগে ৫০০ মিলিলিটার পানি পান করেছেন, তারা ১২ সপ্তাহে অন্যদের তুলনায় ৪৪ শতাংশ বেশি ওজন কমিয়েছেন।
এ ছাড়া ঠান্ডা পানি পান করলে শরীর সেটিকে উষ্ণ করতে অতিরিক্ত ক্যালরি ব্যয় করে। ফলে বিশ্রামরত অবস্থাতেও কিছুটা বেশি ক্যালরি খরচ হয়।
৫. অ্যাপল সিডার ভিনেগার ড্রিংক
অ্যাপল সিডার ভিনেগারে থাকা অ্যাসিটিক অ্যাসিড ওজন নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে।
এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করতে, মেটাবলিজম বাড়াতে, ক্ষুধা কমাতে এবং শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
১৪৪ জন স্থূল প্রাপ্তবয়স্কের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ৩০ মিলিলিটার ভিনেগারযুক্ত পানীয় পান করেছেন, তাদের শরীরের ওজন, কোমরের মাপ এবং পেটের মেদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে অ্যাপল সিডার ভিনেগার অম্লীয় হওয়ায় অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়। এটি দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই পরিমিত পরিমাণে পান করা এবং পরে পরিষ্কার পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নেওয়া ভালো।
৬. আদা চা
আদা বহু বছর ধরে রান্না ও প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আদা ক্ষুধা কমাতে, দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে এবং মেটাবলিজম বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
১০ জন স্থূলকায় পুরুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, সকালে গরম পানিতে ২ গ্রাম আদার গুঁড়া মিশিয়ে পান করলে তারা বেশি সময় তৃপ্ত অনুভব করেছেন এবং ক্ষুধাও কম লেগেছে।
এ ছাড়া আদা চা শরীরের খাদ্য হজম ও শোষণে প্রয়োজনীয় শক্তির পরিমাণও বাড়াতে পারে, যা ওজন কমাতে সহায়ক।
৭. উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত পানীয়
উচ্চ-প্রোটিনযুক্ত পানীয় ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে খুবই কার্যকর।
প্রোটিন শরীরে এমন কিছু হরমোনের মাত্রা বাড়ায়, যা ক্ষুধা কমায়। একই সঙ্গে এটি ক্ষুধা বাড়ানো হরমোন ঘেরলিনের মাত্রা কমিয়ে দেয়।
৯০ জন স্থূলকায় মানুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ২৩ সপ্তাহ ধরে প্রতিদিন ৫৬ গ্রাম হুই প্রোটিন গ্রহণ করেছেন, তারা অন্যদের তুলনায় প্রায় ২.৩ কেজি বেশি চর্বি কমিয়েছেন।
হুই, মটরশুঁটি কিংবা শণ থেকে তৈরি প্রোটিন পাউডার দিয়ে সহজেই স্বাস্থ্যকর শেক বা স্মুদি তৈরি করা যায়।
৮. সবজির জুস
ফলের জুসে অনেক সময় অতিরিক্ত প্রাকৃতিক চিনি থাকলেও সবজির জুস ওজন কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা কম-ক্যালরিযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি কম-সোডিয়ামযুক্ত সবজির জুস পান করেছেন, তারা অন্যদের তুলনায় বেশি ওজন কমিয়েছেন।
এ ছাড়া তারা বেশি পরিমাণে সবজি খেয়েছেন এবং কার্বোহাইড্রেট গ্রহণও কমিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সবজির জুসের চেয়ে পুরো সবজি খাওয়াই বেশি উপকারী। কারণ জুস তৈরির সময় অনেক ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়।