২৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৫

টানা একমাস লবঙ্গ খেলে শরীরে যেসব পরিবর্তন ঘটে

লবঙ্গ   © সংগৃহীত

রান্নাঘরের পরিচিত একটি মসলা লবঙ্গ। তবে এটি শুধু খাবারের স্বাদ ও সুগন্ধ বাড়ায় না, নিয়মিত ও পরিমিত পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখলে শরীরের জন্যও নানা উপকার বয়ে আনতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, লবঙ্গে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমানো, যকৃতের সুরক্ষা এবং হাড়ের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লবঙ্গ কোনো রোগের ওষুধ নয়। এটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

লবঙ্গ হলো চিরসবুজ লবঙ্গ গাছের শুকনো ফুলের কুঁড়ি। এর বৈজ্ঞানিক নাম Syzygium aromaticum। বাজারে এটি গোটা ও গুঁড়া—উভয় রূপেই পাওয়া যায়। মাংসের বিভিন্ন পদ, কারি, কেক, কুকিজ, গরম পানীয় ও নানা ধরনের রান্নায় লবঙ্গ বহুল ব্যবহৃত হয়। সুগন্ধি মসলা হিসেবে পরিচিত হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাতেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

১. গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের উৎস

লবঙ্গে রয়েছে খাদ্যআঁশ, ভিটামিন ও বিভিন্ন খনিজ উপাদান। অল্প পরিমাণ লবঙ্গও খাবারের স্বাদ বাড়ানোর পাশাপাশি কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে।

প্রায় ২ গ্রাম বা ১ চা-চামচ গুঁড়া লবঙ্গে রয়েছে—

ক্যালরি: ৬
কার্বোহাইড্রেট: ১ গ্রাম
খাদ্যআঁশ: ১ গ্রাম
ম্যাঙ্গানিজ: দৈনিক চাহিদার প্রায় ৫৫ শতাংশ
ভিটামিন কে: দৈনিক চাহিদার প্রায় ২ শতাংশ

ম্যাঙ্গানিজ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে এবং হাড় মজবুত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে লবঙ্গ সাধারণত খুব অল্প পরিমাণে খাওয়া হয়। তাই ম্যাঙ্গানিজ ছাড়া অন্য পুষ্টি উপাদানের বড় উৎস হিসেবে একে বিবেচনা করা যায় না।

২. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ

লবঙ্গে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে। এগুলো শরীরের অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেস দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

এতে থাকা ‘ইউজেনল’ নামের যৌগটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। তাই অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে লবঙ্গও খাদ্যতালিকায় রাখলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে।

৩. যকৃতের সুস্থতায় সহায়ক হতে পারে

২০২২ সালের একটি প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, লবঙ্গের নির্যাস বিষাক্ত রাসায়নিক থিওঅ্যাসিটামাইডের কারণে হওয়া যকৃতের ক্ষতি কমাতে সাহায্য করেছে।

গবেষকদের মতে, লবঙ্গে থাকা ইউজেনল এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে মানুষের ওপর এখনো পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। আবার অতিরিক্ত মাত্রায় লবঙ্গ বা লবঙ্গের নির্যাস গ্রহণ করলে উল্টো যকৃতের ক্ষতির ঝুঁকিও থাকতে পারে।

৪. ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, লবঙ্গের তেল ক্যানসারের বিরুদ্ধে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।

বিশেষ করে ইউজেনলে ক্যানসার প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। পরীক্ষাগারের গবেষণায় দেখা গেছে, এটি স্তন ক্যানসারের কোষ ধ্বংসে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বেশি মাত্রায় ইউজেনল বিষাক্ত হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত লবঙ্গের তেল গ্রহণ করলে যকৃতের ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। তাই মানুষের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৫. ব্যাকটেরিয়া দমনে সাহায্য করতে পারে

লবঙ্গে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বা জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটি কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

নিয়মিত দাঁত ব্রাশ করা এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পাশাপাশি লবঙ্গ মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও সহায়ক হতে পারে।

৬. রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে

লবঙ্গে থাকা কিছু উপাদান রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।

২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সুস্থ—উভয় ধরনের মানুষই ৩০ দিন প্রতিদিন ২৫০ মিলিগ্রাম লবঙ্গের নির্যাস গ্রহণের পর খাবারের পর রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা কম পেয়েছেন।

আরেকটি প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, লবঙ্গে থাকা ‘নিগ্রিসিন’ নামের যৌগ কোষে রক্তের শর্করা প্রবেশ বাড়ায়, ইনসুলিন নিঃসরণ বৃদ্ধি করে এবং ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষের কার্যকারিতা উন্নত করে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এসব উপকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৭. হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করতে পারে

হাড়ের ঘনত্ব কমে গেলে অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি বাড়ে। এতে হাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।

প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউজেনল হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এছাড়া লবঙ্গে থাকা ম্যাঙ্গানিজ হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

৮. পাকস্থলীর আলসার কমাতে সাহায্য করতে পারে

কিছু প্রাণীভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, ইউজেনল পাকস্থলীর আলসার নিরাময়ে সহায়ক হতে পারে।

পাকস্থলীর আলসার হলো পাকস্থলী, ডুওডেনাম বা খাদ্যনালির ভেতরের আবরণে তৈরি হওয়া ক্ষত।

পরীক্ষাগারের গবেষণায় আরও দেখা গেছে, লবঙ্গের তেল হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি (এইচ. পাইলোরি) ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়া আলসার এবং কিছু ক্ষেত্রে পাকস্থলীর ক্যানসারেরও কারণ হতে পারে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

লবঙ্গের সম্ভাব্য পা র্শ্বপ্রতিক্রিয়া
অল্প পরিমাণে লবঙ্গ খাওয়া

স্বাভাবিক পরিমাণে লবঙ্গ খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। রান্নায় ব্যবহৃত পরিমাণ অধিকাংশ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়।

তবে গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের ক্ষেত্রে বেশি পরিমাণে লবঙ্গ খাওয়ার নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাই রেসিপিতে যতটুকু ব্যবহার করা হয়, ততটুকুই খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

লবঙ্গের তেল খাওয়া

লবঙ্গের তেলে ইউজেনলের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই এটি মুখে খাওয়া নিরাপদ নয়, বিশেষ করে শিশুদের জন্য।

অল্প পরিমাণ লবঙ্গের তেলও খিঁচুনি, যকৃতের ক্ষতি, শরীরে তরলের ভারসাম্যহীনতা এবং রক্তক্ষরণের মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।

ত্বকে ব্যবহার

লবঙ্গের তেল বা লবঙ্গের নির্যাসযুক্ত ক্রিম ত্বকে ব্যবহার সাধারণত নিরাপদ।

তবে মাড়িতে সরাসরি লবঙ্গের তেল লাগালে জ্বালাপোড়া বা ক্ষতি হতে পারে।

ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া

যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা ডায়াবেটিসের ওষুধ গ্রহণ করেন, তাদের সতর্ক থাকতে হবে। কারণ লবঙ্গে থাকা ইউজেনল এসব ওষুধের কার্যকারিতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

লবঙ্গ ব্যবহারের সেরা উপায়

লবঙ্গের তেল ব্যবহার করতে চাইলে—

স্প্রে বা ডিফিউজারে ব্যবহার করতে প্রতি আউন্স পানিতে ১০–১৫ ফোঁটা মেশানো যেতে পারে।
ত্বকে ব্যবহার করতে নারকেল তেলের মতো বাহক তেলের সঙ্গে ১০–১৫ ফোঁটা মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষেত্রে আরও কম ব্যবহার করা উচিত।
দাঁতের ব্যথায় তুলায় অল্প মিশ্রণ নিয়ে ব্যথার দাঁতে লাগানো যেতে পারে। তবে মাড়িতে না লাগানোই ভালো।
রান্নায় লবঙ্গের ব্যবহার

স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে লবঙ্গ খাওয়াই সবচেয়ে ভালো।

গুঁড়া লবঙ্গ সহজেই বিভিন্ন খাবারে ব্যবহার করা যায়। যেমন—

মাংসের বিভিন্ন পদ
কারি
চাটনি
কুমড়ার স্যুপ
ভুট্টার বড়া
বেক করা ফল
কেক ও কুকিজ
গরম মসলাযুক্ত পানীয়
লবঙ্গ ফুটিয়ে পানি খাওয়ার উপকারিতা

অনেকে লবঙ্গ দিয়ে চা তৈরি করে পান করেন। কয়েকটি গোটা লবঙ্গ ৫ থেকে ১০ মিনিট ফুটিয়ে সহজেই লবঙ্গের চা বানানো যায়।

ঐতিহ্যগতভাবে বমিভাব কমানো এবং শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ বা হাঁপানির কিছু উপসর্গ উপশমে লবঙ্গ ব্যবহার করা হলেও, মানুষের ক্ষেত্রে এসব উপকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।