২৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:০৫

টানা এক মাস প্রতিদিন ডিম খেলে শরীরে যেসব পরিবর্তন আসে

ডিম  © সংগৃহীত

সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, শস্য ও প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার গুরুত্ব সবারই জানা। তবে একটি সুষম খাদ্য শুধু ফল ও সবজির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করতে উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আর সেই তালিকায় অন্যতম সহজলভ্য ও পুষ্টিকর খাবার হলো ডিম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিমিত পরিমাণে নিয়মিত ডিম খাওয়ার অভ্যাস শরীরের নানা উপকারে আসতে পারে।

অনেকেই জানেন, ডিম প্রোটিনের উৎকৃষ্ট উৎস। তবে টানা অন্তত এক মাস প্রতিদিন একটি ডিম খেলে শরীরে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত ডিম খেলে শরীর প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পায়, যা সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি এটি শরীরকে আরও কর্মক্ষম ও সতেজ রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ডিমকে অনেক সময় ‘প্রকৃতির মাল্টিভিটামিন’ বলা হয়। কারণ একটি ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি ভিটামিন এ, ডি, ই, বি২ (রিবোফ্লাভিন), বি৫, বি৬, বি১২, ফলেট, বায়োটিন, কোলিন, সেলেনিয়াম, আয়োডিন, ফসফরাস, আয়রন ও জিঙ্কসহ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় বহু পুষ্টি উপাদান থাকে। এসব উপাদান শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

একটি বড় ডিমে সাধারণত প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন থাকে। এতে থাকা নয়টি অপরিহার্য অ্যামিনো অ্যাসিড শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না। তাই এগুলো খাবারের মাধ্যমেই গ্রহণ করতে হয়। এই অ্যামিনো অ্যাসিডগুলো শরীরের কোষ গঠন, টিস্যু মেরামত এবং পেশির বৃদ্ধি ও পুনর্গঠনে সহায়তা করে।

নিয়মিত ডিম খাওয়ার ফলে পেশি শক্তিশালী রাখতে সহায়তা মিলতে পারে। যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বা শারীরিক পরিশ্রম বেশি করেন, তাদের জন্য ডিম একটি আদর্শ প্রোটিনের উৎস। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশির ক্ষয় রোধেও পর্যাপ্ত প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ডিমে থাকা কোলিন মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পুষ্টি উপাদান। এটি স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সহায়তা করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গর্ভাবস্থায় ভ্রূণের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশেও কোলিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এছাড়া ডিমে থাকা লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামের দুটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুটি উপাদান বয়সজনিত দৃষ্টিশক্তি হ্রাস এবং ছানি পড়ার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।

ডিমে থাকা ভিটামিন ডি শরীরে ক্যালসিয়াম শোষণে সহায়তা করে। এর ফলে হাড় ও দাঁত মজবুত রাখতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক মানুষের শরীরে ভিটামিন ডির ঘাটতি থাকে। সেক্ষেত্রে ডিম খাদ্যতালিকায় রাখলে অতিরিক্ত উপকার পাওয়া যেতে পারে।

ডিমে থাকা ভিটামিন এ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, ত্বক সুস্থ রাখতে এবং চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখে।

অনেকেই মনে করেন, নিয়মিত ডিম খেলে শরীরে কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত পরিমাণে ডিম খাওয়া রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় না। বরং অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী এইচডিএল (HDL) কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়তে পারে। তবে যাদের পারিবারিকভাবে কোলেস্টেরলজনিত সমস্যা রয়েছে বা চিকিৎসকের বিশেষ পরামর্শ রয়েছে, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী ডিম খাওয়া উচিত।

ডিম দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতেও সহায়তা করে। এতে ক্ষুধা কম লাগে এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমতে পারে। এ কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া ব্যক্তিদের জন্যও ডিম উপকারী হতে পারে, যদি এটি সুষম খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত শরীরচর্চার সঙ্গে যুক্ত থাকে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ডিমে থাকা প্রোটিন শরীরে ধীরে ধীরে হজম হয়। ফলে দীর্ঘ সময় শক্তি পাওয়া যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করতে পারে।

এছাড়া ডিমে থাকা বি-ভিটামিনগুলো শরীরে খাদ্যকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সাহায্য করে। ভিটামিন বি১২ রক্তকণিকা তৈরিতে এবং স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বিজ্ঞানভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণা এবং যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন, মায়ো ক্লিনিক ও ইউএসডিএ (যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ)-এর তথ্য অনুযায়ী, সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে ডিম একটি নিরাপদ ও অত্যন্ত পুষ্টিকর খাবার। সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে নিয়মিত ডিম খাওয়া শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পূরণে সহায়তা করতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দেন, কোনো একক খাবারই সুস্বাস্থ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। ডিমের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি, মাছ, ডাল এবং নিয়মিত শরীরচর্চা—এসবের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে একটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। যারা কিডনি রোগ, গুরুতর লিভারের সমস্যা বা বিশেষ খাদ্যনিয়ন্ত্রণে রয়েছেন, তাদের নিয়মিত ডিম খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।