০১ নভেম্বর ২০২৬, ২১:২৩

ফেসবুকে কেন এত আলোচনা, কে এই আবু বকর?

আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করা পাকিস্তানের জনপ্রিয় অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকী  © টিডিসি ফটো

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক খুললেই চোখে পড়ছে এক তরুণের ছবি। কখনো তাকে নিয়ে প্রশংসা, কখনো মজার মিম, আবার কখনো আদর্শ জীবনসঙ্গী হিসেবে তার সঙ্গে বাস্তব জীবনের মানুষের তুলনা। নাম তার আবু বকর। পাকিস্তানি ধারাবাহিক ‘দার-ই-নাজাত’-এর এই চরিত্রটি এখন বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের আলোচনার কেন্দ্রে।

নেটিজেনদের অনেকে তাকে বলছেন ‘জাতীয় ক্রাশ’। কেউ কেউ আবার মজা করে বলছেন, বাস্তব জীবনে একজন আবু বকর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তবে শুধু বাংলাদেশেই নয়, পাকিস্তান ও ভারতের দর্শকদের মধ্যেও চরিত্রটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয়ও চরিত্রটি নিয়ে মন্তব্য করেছেন।

কিন্তু কে এই আবু বকর? কী এমন আছে তার মধ্যে, যার কারণে একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকের কাল্পনিক চরিত্র বাস্তব জীবনের মানুষের আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে?

আবু বকর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার সিদ্দিকী। ‘দার-ই-নিজাত’ ধারাবাহিকটি লিখেছেন উমেরা আহমেদ এবং পরিচালনা করেছেন সাকিব খান। এতে জারিয়াব চরিত্রে অভিনয় করেছেন দুরে ফিশান সেলিম। নাটকের গল্পে আবু বকর ও জারিয়াবের সম্পর্কের নানা দিক দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

কেন এত পছন্দের আবু বকর?

আবু বকরকে দর্শকদের কাছে আলাদা করে তুলেছে তার ব্যক্তিত্ব। পর্দায় তাকে দেখা যায় শান্ত, ধৈর্যশীল, দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল একজন মানুষ হিসেবে। অন্যের ভুল সহজে মেনে নেওয়া, পরিস্থিতি বুঝে কথা বলা এবং কঠিন সময়েও নিজের আচরণে সংযম বজায় রাখার মতো বৈশিষ্ট্য তাকে দর্শকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

বিশেষ করে জারিয়াবের সঙ্গে তার আচরণ দর্শকদের নজর কেড়েছে। সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা মানসিক সংকটের মুহূর্তেও আবু বকর যেভাবে ধৈর্য ও সহমর্মিতা দেখায়, তা অনেক দর্শকের কাছে আদর্শ জীবনসঙ্গীর প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কের জটিলতা, প্রতারণা, অবিশ্বাস ও মানসিক দূরত্ব নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যায়। এর বিপরীতে আবু বকরের মতো একটি চরিত্রের উপস্থিতি দর্শকদের কাছে যেন ভিন্ন ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করেছে। ফলে নাটকের বিভিন্ন দৃশ্যের ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবে।

চরিত্রটি কি বাস্তবেই এতটা নিখুঁত?

আবু বকরকে নিয়ে দর্শকদের প্রশংসার পাশাপাশি প্রশ্নও উঠেছে। অনেকের কাছে চরিত্রটি এতটাই ভালো যে বাস্তব জীবনে এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। কেউ কেউ তাকে অবাস্তব কিংবা অতিরিক্ত আদর্শায়িত চরিত্র হিসেবেও দেখছেন।

এমন সমালোচনার জবাব দিয়েছেন নাটকটির লেখক উমেরা আহমেদ। তার প্রশ্ন, মানুষের মধ্যে দয়া, সহমর্মিতা, ক্ষমা ও অন্যের ভুল উপেক্ষা করার মতো সাধারণ মানবিক গুণাবলি থাকলে সেগুলোকে অবাস্তব মনে হবে কেন? সমাজে কি এসব গুণের চর্চা এতটাই কমে গেছে যে পর্দায় দেখলেও মানুষ বিশ্বাস করতে পারছে না?

নাটকটির অভিনেত্রী নাদিয়া আফগানও চরিত্রটির পক্ষে কথা বলেছেন। তার মতে, আবু বকর ও তার মায়ের মতো মানুষ বাস্তবেও আছেন। নিজের সংসারের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানিয়েছেন, তার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির মানুষের মধ্যেও এমন সুন্দর আচরণের প্রতিফলন রয়েছে।

আবু বকরের মধ্যেও আছে দুর্বলতা

দর্শকদের চোখে আদর্শ মানুষ হয়ে উঠলেও আবু বকর যে ত্রুটিহীন নয়, সেটি জানিয়েছেন খোদ অভিনেতা শেহরিয়ার মুনাওয়ার। সম্প্রতি বিবিসি এশিয়ান নেটওয়ার্কে হারুন রশিদের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি চরিত্রটির কিছু দুর্বল দিক তুলে ধরেছেন।

অভিনেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আবু বকর একজন ‘পিপল প্লিজার’। অর্থাৎ অন্যকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের ইচ্ছা ও প্রয়োজনকে অনেক সময় উপেক্ষা করে। অন্যকে না বলতে তার সমস্যা হয়। পাশাপাশি তার মধ্যে রয়েছে ‘সেভিয়ার কমপ্লেক্স’ বা অন্যকে রক্ষা করার অতিরিক্ত প্রবণতা।

শেহরিয়ার জানান, আবু বকরের বেড়ে ওঠা ও মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা তার এই মানসিকতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। সব সময় অন্যের পাশে থাকা এবং অন্যকে সাহায্য করাকে সে নিজের দায়িত্ব মনে করে।

অভিনেতা আরও জানান, জারিয়াবের প্রতি আবু বকরের ভালো লাগা নাটকের গল্পে যতটা পরে প্রকাশ পেয়েছে, তার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল আরও আগে থেকেই। চরিত্রটির বিভিন্ন আচরণ ও সংলাপে তিনি সেই ভালো লাগার ইঙ্গিত রেখেছিলেন।

আবু বকরকে নিয়ে বাংলাদেশের তারকাদেরও আলোচনা

চরিত্রটি নিয়ে বাংলাদেশের দর্শকদের আগ্রহ এতটাই বেড়েছে যে বিষয়টি নজরে এসেছে দেশের বিনোদন অঙ্গনের পরিচিত মুখদেরও। সম্প্রতি উপস্থাপক ও অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় ফেসবুকে আবু বকরকে নিয়ে একটি মন্তব্য করেছেন।

তিনি লিখেছেন, ‘পাকিস্তানের নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র আবু বকরকে ঢাকার রাস্তায় ছেড়ে দিলে সে কতটা ধৈর্যশীল এবং ভালো তার পরীক্ষা হয়ে যেত। ক্যামেরার সামনে তো ভালোর অভিনয় করাই যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।’

জয়ের এই মন্তব্যেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার যানজট ও দৈনন্দিন জীবনের নানা পরিস্থিতির সঙ্গে আবু বকরের ধৈর্যশীলতার তুলনাটি অনেকের কাছে মজার মনে হয়েছে।

সব মিলিয়ে আবু বকর এখন শুধু একটি নাটকের চরিত্র নয়, বরং সম্পর্ক, ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও জীবনসঙ্গীর প্রত্যাশা নিয়ে নতুন করে আলোচনার উপলক্ষ হয়ে উঠেছে। তবে দর্শকদের এই মুগ্ধতার মধ্যেও একটি প্রশ্ন থেকে যায়—আবু বকরের মতো মানুষ কি সত্যিই বাস্তব জীবনে বিরল, নাকি আমরা চারপাশের মানুষের ভালো দিকগুলো দেখার অভ্যাসই হারিয়ে ফেলছি?