`লন্ডন চলে গেলে তুমি তো উন্নত জীবন পেতে কিন্তু যাওনি'— সুমনকে নিয়ে জয়ের দীর্ঘ স্ট্যাটাস
মৃত্যুর আগে অর্থ তীব্র কষ্টে ছিলেন শামস সুমন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে এমনটায় জানিয়েছেন সহশিল্পী শাহরিয়ার নাজিম জয়। আজ বুধবার (১৮ মার্চ) নিজ ভেরিফায়েড আইডিতে এক দীর্ঘ স্ট্যাটাসে স্মরণ করেছেন তিনি সুমনের সঙ্গে তার স্মৃতিময় সময়গুলো।
জয় লেখেন, জানিনা মরে গেলে মৃত মানুষের সাথে দেখা হয় কিনা? নাকি অপেক্ষা করতে হয় আখেরাতের ময়দানের জন্য। সেটাও যদি হয় তাও তো অন্তত আরো ১০০ হাজার বছরের চেয়ে কমে না। যতটুকু জানি সেখানেও কেউ কাউকে চিনতে পারবেনা। সবাই ছুটোছুটি করতে থাকবে। যার যার আমল নিয়ে। তারপর নির্ধারিত হবে কারো জন্য বেহেশত কারো জন্য দোযখ। তাহলে সুমন ভাই তোমার সাথে তিন মিনিট দাড়িয়ে একটু সুখ দুঃখের কথা বলার সুযোগ কি আর হবে? নাকি এই যে সেদিন তিন দিন আগে কিংবা এর আগের প্রতিদিন বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বসে বসে যে কথাগুলো বলেছিলাম সে কথাগুলি ইহকাল এবং পরকালের জন্য তোমার আমার শেষ কথাই ছিল।
সম্পর্কের শুরুর কথা জানিয়ে জয় লেখেন, তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম শাহবাগে পিজি হাসপাতালের সামনে। মহিলা সমিতিতে তোমার মঞ্চ নাটকের বলিষ্ঠ অভিনয় শুদ্ধ কণ্ঠস্বর আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই সময় আমি নাট্য জনে সাধারণ নাট্যকর্মী হিসেবে ছিলাম। একটা জনপ্রিয় মঞ্চনাটকে নাট্যজন তোমাকে টাকার বিনিময়ে চরিত্রের রূপায়ণের জন্য ডাকতেন কারণ ওই চরিত্রে তুমি ছিলে অপরিহার্য। আমি ভাবতাম সকলে টাকা খরচ করে অভিনয় করে অথচ তোমাকে টাকা দিয়ে অভিনয় করায় কত বড় অভিনেতা তুমি। তারপর ধীরে ধীরে তোমার সাথে নাটকের অভিনয় দেখা হয় বন্ধুত্ব হয়। বয়সে ছোট হলেও তুমি বন্ধুত্ব করে নাও আমার সাথে।
দেশের বাইরে কাজের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি লেখেন, আমরা একবার ইন্দোনেশিয়া যাই ফ্লোরিং করে একসাথে দুজন ঘুমাই। একটা বিশেষ কারণে দুইজন দু'পাশ থেকে মুখ ঘুরিয়ে একসাথে হেসে দেই কারণ দুজনের মনেই একটা বিষয় কাজ করছিল সেই বিষয়টা না হয় নাই বললাম। শুধু তুমি আর আমি তা । বিশাল বড় স্ক্রিপ্ট এবং ক্যারেক্টার বিপুল রায়হানকে প্লেনের ভিতরে কনভিন্স করে ছোট করে ফেলি তুমি এবং আমি কারণ বিদেশে অভিনয়ে যেন আমাদের প্রেসার না পরে আমরা যেন অল্প কাজ করে বেশি আনন্দ করতে পারি। তারপর ঢাকায় টেলিভিশন নাটকে যেখানে তুমি সেখানে আমি। এত এত নাটক একসাথে করেছি প্রায়ই তুমি বলতে আমরা একজন মরলে আরেকজনকে দেখা যাবে। কারণ সব কাজই একসাথে সেই ২০০০ সাল থেকে ২০০৪-৫ পর্যন্ত।
শেষের দিকে সুমন হতাশার কথা বলতেন জানিয়ে জয় লেখেন, আমি তোমাকে সাহস দেওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করতাম। এবং বুঝাতে চেষ্টা করতাম তুমি জীবনটাকে এত হালকা ভাবে নিচ্ছ কেন তুমি সিরিয়াস হচ্ছো না কেন তুমি কাজের প্রতি আরো বেশি ডেডিকেটেড হচ্ছ না কেন আমার এই কেনর উত্তর তুমি শুধু হাসি দিয়েই উড়িয়ে দিতে। তারপর তোমার ব্যক্তিগত জীবনের টানা পূরণের গল্প। আমাকে সব খুলে বলেছিলে। আমি বুঝতে পারছিলাম না কেন তুমি টানা পড়েনথেকে বের হতে পারছ না। তুমি আমাকে বলেছ তুমি চেষ্টা করছো কিন্তু পারছ না। কিন্তু না পারতে পারতে মানসিক চাপ নিতে নিতে তুমি যে চোখের সামনে এভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে আমি অনুমান করলেও এটা নিয়ে কখনো গভীরভাবে ভাবি নি।
জয় আরও লেখেন, তোমার জীবন থেকে যা শিখলাম পৃথিবীতে তুমি যত কাজ করো না কেন যত সম্মান অর্জন করো না কেন তোমার যা টাকা লাগবে তা যদি তোমার কাছে না থাকে তাহলে তুমি সত্যিই মানসিক চাপে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাবে। আমি জানি তোমার বেলায় তাই হয়েছে।। বাচ্চাদের জন্য তোমার অনেক চিন্তা ছিল। তাদের ভবিষ্যতের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তুমি তা জোগাড় করতে পারছিলে না। তোমার ফ্যামিলির লন্ডনে থাকে তারা চেয়েছিল তুমি লন্ডন চলে যাও। কিন্তু তুমি দেশ ছেড়ে যাবে না। এই নিয়েছিল এক বিশাল দ্বন্দ্ব। সবাই চলে গেল। তুমি একা রয়ে গেলে রেডিও ভূমিতে এবং মাতৃভূমিতে। তোমার বয়সে পুরুষ একা থাকতে পারে না। থাকবেই বা কেন একা থাকার জন্য তো সে জীবনের শুরুতে সংসার শুরু করেনি। একা থাকার জন্য সে সমস্ত রোজগার সংসারের জন্য ব্যয় করেনি।
তিনি আরও লেখেন, সবাই সবার ভবিষ্যতের জন্য উন্নত জীবনের জন্য যার যার গন্তব্যে চলে গেছে আর তুমি তাদের সবকিছু দিয়ে একা একা সেক্রিফাইস করেছ। খাবার অসুবিধা লোকের অসুবিধা টাকার অসুবিধা এত অসুবিধা লিয়ে ৬০ বছর বয়সে বাচাকি সম্ভব? না সুমন ভাই। সম্ভব না। কারো কোন দোষ নেই ভাবীরও নেই বাচ্চাদেরও নেই তোমারও নেই। দোষ তোমার ভাগ্যের। দোষ তোমার দেশ প্রেমের। লন্ডন চলে গেলে তুমি তো অনেক উন্নত জীবন পেতে কিন্তু যাওনি এখানে এই মাটিতে এই বাতাসে তুমি থাকতে চেয়েছো। এখানেই থাকলে এখানেই মরলে। মাতৃভূমি রেডিও ভূমি এরপর মাটির ভূমি। সেখানেই তুমি ঘুমাও ভাই। তোমার আর কোন দায়িত্ব নাই। আর আসতে হবে না চ্যানেল আই এ। আর ফিরতে হবে না ঘরে। আর কোন টেনশন করতে হবে না। টাকার কথা ভাবতে হবে না।
জয় লিখেছেন, তোমার জীবন থেকে আমি শিখলাম জীবন ছোট। এক মুহূর্ত নষ্ট করা যাবে না। এক মুহূর্ত নিজেকে কষ্ট দেওয়া যাবে না। জীবনের প্রয়োজনের যে টাকা সেই টাকার জোগাড় অবশ্যই করে রাখতে হবে এর কোন বিকল্প নাই। তোমার মত সকলের প্রিয় আমি হতে পারব না সেই সমর্থ্য আমার নাই কিন্তু তোমার মত নিজেকে কষ্ট আমি দেবো না। বুঝে গেছি ভাই। তুমি বুঝিয়ে গেছো নিজেকে কষ্ট দেওয়া ঠিক না। সুমন ভাই তোমার দেওয়া ডায়েরিটা এখনো আমার গাড়িতে। সপ্তাহখানেক আগে উপহার দিয়েছিলে। আমি তোমাকে কিছুই দিতে পারলাম না।
সুমনকে হিডেন সুপারস্টার সম্বোধন করে জয় আরও লিখেছেন, আমার ২৮ বছরের ক্যারিয়ার জীবনে তুমি আমার অমর সঙ্গী। বাকি জীবন ছায়া হয়ে পাশে থেকো। অন্ধকারে কিংবা আলোতে যখন নিজের সাথে নিজে কথা বলি তখন তোমায় ডাকবো তুমি এসে কথা বলে যেও। ভাই আমার চ্যানেল আইতে বাইরে হাঁটতে খুব কষ্ট হবে। প্রতিটি হাটার সাথে তুমি জড়িয়ে ছিলে। তোমার রুমে যেতে খুব কষ্ট হবে। হয়তো যাবোই না আর কখনো। তবে সুমন ভাই তোমার মৃত্যুর পর কিন্তু তুমি অনেক সম্মান পেয়েছো। ফেসবুক খোলা যাচ্ছে না শুধু তোমার সংবাদ। তুমি না বলতে তুমি খুবই এভারেজ কিন্তু কই সুমন ভাই আমার তো মনে হচ্ছে একজন সুপারস্টারের মৃত্যু হয়েছে। তুমি একজন হিডেন সুপারস্টার। তুমি বেঁচে থাকতে আমি তা বুঝি নাই। হে সুপারস্টার মহান আল্লাহ তোমার আত্মাকে শান্তিতে রাখুক। ঘুমাইয়া থাকো ভাই। আরামে নিশ্চিন্তে।
গতকাল মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সন্ধ্যা ৬টা ৪৩ মিনিটে একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান নব্বই দশকের অভিনেতা শামস সুমন। তার বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। খবরটি ছড়িয়ে পড়তেই শোকের মাতম ওঠে বিনোদন অঙ্গনে।
তার অভিনীত চলীচ্চত্র হলো- 'মন জানেনা মনের ঠিকানা' (২০১৬), 'কক্সবাজারে কাকাতুয়া' (২০১৬), 'চোখের দেখা' (২০১৬), 'প্রিয়া তুমি সুখী হও' (২০১৪), 'আয়না কাহিনী' (২০১৩), 'বিদ্রোহী পদ্মা' (২০০৬), 'জয়যাত্রা' (২০০৪), 'নমুনা' (২০০৮), 'হ্যালো অমিত' (২০১২) ও 'জয়যাত্রা' (২০০৪)।
২০০৮ সালে 'স্বপ্নপুরণ' চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে সেরা অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান শামস সুমন।