০৩ মার্চ ২০২৬, ০০:৪৯

শীতের বিদায়, বসন্তের রঙিন আভা

বসন্তের রঙিন আবাহন  © টিডিসি ফটো

শীতের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিতে নেমেছে বসন্তের রঙিন আবাহন। সকালের নরম রোদ শীতের চুপিসারে বিদায়ের ঘোষণা দিচ্ছে। বাতাসে শীতের তীক্ষ্ণতার সরিয়ে এসেছে কোমল উষ্ণ ছোঁয়া। প্রকৃতির এই পরিবর্তনই জানাচ্ছে বসন্তের আগমনী সুর। ফাল্গুনের আগমন বয়ে আনছে নবজীবনের প্রতিধ্বনি।

শিমুল-পলাশের লাল ফুলে মনে হয়, বনে যেন আগুন লেগেছে। রক্তিম মনোলোভা শিমুল, গাছে গাছে নতুন পত্রপল্লব, আম্রকুঞ্জে কোকিলের ডাক—এ যেন বসন্তে বাংলার চিরচেনা চিত্র। গাছে গাছে ভ্রমরের গুঞ্জন, উড়ে বেড়ানো প্রজাপতির দল প্রকৃতিকে দিয়েছে অনন্যতা। কোকিলের কুহুতে দুলে ওঠে আম্রকুঞ্জ। তাই বলা হয়, ‘মহুয়ার ডালে ডালে গাহে কুহু কোয়েলা’।

প্রতিটি ঋতুই নিজস্ব মহিমায় ভরপুর। তবে বসন্তের রং ও গন্ধ মানুষের মনে এক বিশেষ গভীরতার জন্ম দেয়। মেঘের গায়ে রাঙা সূর্যের আবীর ছড়িয়ে পড়লে মনে জেগে ওঠে অব্যক্ত ভালোবাসা, অপ্রকাশিত অনুভূতির নীরব আলোড়ন। বসন্ত তাই কেবল প্রকৃতির পরিবর্তন নয়। এটি মনের ভেতরও এক নতুন জাগরণের নাম। 

বাংলা সাহিত্যে বসন্তের উপস্থিতি চিরন্তন। কবিরাও তাঁদের লেখায় বসন্তকে ঘিরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর রচনায় লাল–কমলা রঙের জোয়ার, কোকিলের ডাক আর দখিনা হাওয়ার মাদকতা নগরের পথে বসন্তের উপস্থিতি ছড়িয়ে দেয়। কাজী নজরুল ইসলাম-এর বসন্ত কেবল প্রকৃতির নয়; প্রেম, যৌবন, রঙ ও মুক্তির প্রতীক। তাঁর বসন্ত প্রাণোচ্ছ্বল, স্পন্দিত ও উদ্দাম। অন্যদিকে  জীবনানন্দ দাশ–এর কবিতায় বসন্ত শান্ত ও নিঃশব্দ, যেখানে শীতের কুয়াশা সরিয়ে রৌদ্রের কোমলতা ধরা দেয়। পল্লিকবি জসীমউদ্দীন–এর গ্রামবাংলার বসন্তে ধরা পড়ে ফল ধরার পূর্বাভাস—কাঁঠালের ডালে গুটি, আমগাছের মুকুল ও খোলা আকাশ। আর সুকান্ত ভট্টাচার্য–এর জাগরণী স্বরে শীতের জীর্ণতা সরিয়ে আসে নতুন দিনের চেতনা। তাঁর বসন্ত মানে শুধু পলাশ–শিমুল নয়; বরং সময়ের বিপ্লব, নতুন প্রজন্মের উত্থান।

শুধু গ্রামেই নয়, শহরেও বসন্ত আসে ধীরে, আপন ভঙ্গিতে। ব্যস্ত সড়কের ধারে কৃষ্ণচূড়ার ডালে কচি পাতা দোলে। কোথাও শিমুলের লাল পাপড়ি ফুটপাথ রাঙিয়ে রাখে। সেই পাপড়ির ওপর দিয়ে হেঁটে যায় অফিসফেরত মানুষ। ক্লান্ত পদক্ষেপের মাঝেও চোখে পড়ে বসন্তের রঙ। বারান্দার টবে ফোটা গাঁদা ও গোলাপ যেন নীল আকাশের নিচে ঋতু বদলের নীরব ঘোষণা। ছাদের বাগানে আমের মুকুলে জমে থাকে হালকা গন্ধ।

একদিন হঠাৎ টের পাওয়া যায় শীতের কুয়াশা সরে গেছে, আকাশ গভীর নীল। রোদে আর শীতের কাঁপুনি নেই। জানালার কাচ ভেদ করে রোদ ঘরের মেঝেতে সোনালি আভা ফেলে, পর্দার ফাঁক গলে সকালের আলো নরম নকশা আঁকে। বিকেলের দখিনা হাওয়ায় পার্কের বকুল ডালে দোল লাগে; দূরে কোকিলের ডাক ভেসে আসে, যদিও তা বাসের হর্ন আর রিকশার ঘণ্টায় মিলিয়ে যায়। তবু শহর জানে বসন্ত এসেছে। কংক্রিটের শহরও যেন একটু সবুজ, একটু রঙিন হয়ে ওঠে।

ঋতুর আগমনী দিনে শহরকে ঘিরে রাখা রঙিন সাজের রেশ এখনো ছড়িয়ে আছে। সামাজিক মাধ্যমে হলুদ শাড়ির ছবি ভেসে বেড়ায়, কারও আলমারিতে ভাঁজ করা পাঞ্জাবিতে রয়ে গেছে বসন্তের গন্ধ। উৎসবের মঞ্চ গুটিয়ে গেছে, তবু বাতাসে অল্পস্বল্প ভেসে থাকে গানের সুর।

নগরের বসন্ত ক্ষণিকের সাজ নয়। এটি অন্তরের গোপন জাগরণ। ধূসরতার আড়াল ভেদ করে নবপল্লবের মতোই সে জাগায় নতুন সম্ভাবনার আভাস। ঋতু বদলায়, মানুষ আবিষ্কার করে জীবনের নীরব রঙ।