বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের কাছে চুয়েট শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি, ভিসির দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিতের দাবি
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সুশাসন, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির একদল সাধারণ শিক্ষার্থী। এতে নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলমের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করা, চলমান অস্থিরতা নিরসন এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) চট্টগ্রাম নগরীর এম এম আলী রোডে অবস্থিত জেলা শিল্পকলা একাডেমির মুক্তমঞ্চে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা শাখার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এ স্মারকলিপি দেওয়া হয়। ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। প্রধান বক্তা ছিলেন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ভূমি মন্ত্রণালয় ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এমপি।
স্মারকলিপিতে চুয়েটের গত ১৭ বছরের প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্রভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত ও প্রশাসনিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি নবনিযুক্ত উপাচার্যের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বাধাগ্রস্ত করতে একটি মহলের অস্থিতিশীলতা ও ‘মব-সংস্কৃতি’ সৃষ্টির অপচেষ্টার অভিযোগ করা হয়।
এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো দাবি-দাওয়া ও ভিন্নমত প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম এবং প্রচলিত আইনের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে উপাচার্যের স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। স্মারকলিপিতে চুয়েটকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কেন্দ্র হওয়া থেকে রক্ষা, শিক্ষা ও গবেষণার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং উপাচার্যের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব সুসংহত করতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও উপ-উপাচার্যরা স্মারকলিপির বিষয়ে একাত্মতা প্রকাশ করেন। প্রধান অতিথি রুহুল কবির রিজভী ও প্রধান বক্তা প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন চুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রশাসনিক গতিশীলতা ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তারা।
এ বিষয়ে চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন এবং চুয়েটে সুশাসন পুনর্বহালের দাবিতে আয়োজিত জাসাসের বিশেষ সমাবেশে প্রধান অতিথি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর কাছে আমরা কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থী স্মারকলিপি দিয়েছি।’
চলমান আন্দোলন ও প্রশাসনিক অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রভাব সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অনেক শিক্ষার্থীর মূল্যবান একাডেমিক সময় নষ্ট হয়েছে। সেশনজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। অথচ এ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো দায় নেই।
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘আমরা চাই, প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলম স্যার যেন তাঁর দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক। আমরা কারও সঙ্গে বিরোধ চাই না। চুয়েটে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হোক, শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আসুক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ক্ষতির অবসান ঘটুক—এটাই আমাদের চাওয়া।’
তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী তাঁদের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলমকে নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির আশ্বাস দিয়েছেন।
এদিকে চুয়েটে কর্মরত এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলমকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেওয়ার পর থেকে তার নিয়োগ কিংবা ক্যাম্পাসে যাওয়ার বিষয়ে তার কোনো দ্বিমত, আপত্তি বা বিরোধিতা নেই। একইভাবে সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনের বিরোধিতাকারী চুয়েট কর্মকর্তা সমিতির কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও অতীতে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না, বর্তমানেও নেই।
তিনি বলেন, ‘আমি কোনোভাবেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন বিপন্ন হওয়ার পক্ষে নই। বরং শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে শ্রেণি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে, কোনো ধরনের সেশনজটের শিকার না হয় এবং তাদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই আমার একান্ত প্রত্যাশা।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলম যাতে নির্বিঘ্নে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক, একাডেমিক ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেন, সে জন্য শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিক সহযোগিতা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থাকা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন ওই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আসন্ন স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন, নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা নির্ধারণ এবং চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য আর্থিক দায়বদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ জড়িত। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব অপরিহার্য কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে একই ধরনের অবস্থানের কথা জানিয়েছেন চুয়েট শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাও উপাচার্য অধ্যাপক ড. শরীফুল আলমকে ক্যাম্পাসে এসে প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।