শুধু অ্যাটেনডেন্সের জন্যই ক্লাসে আসেন মাভাবিপ্রবির ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী, শেখার আগ্রহ মাত্র ৪ শতাংশের
বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসে আসার মূল উদ্দেশ্য জ্ঞান অর্জন ও নতুন কিছু শেখা। তবে সেই উদ্দেশ্য থেকে শিক্ষার্থীদের কতটা বিচ্যুতি ঘটছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের একটি অনলাইন সমীক্ষা। সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী শুধু অ্যাটেনডেন্স নিশ্চিত করার জন্য ক্লাসে আসেন। বিপরীতে, মাত্র ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে আসার কারণ হিসেবে শেখার উদ্দেশ্যকে উল্লেখ করেছেন।
সম্প্রতি মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক গ্রুপে চালানো এক সমীক্ষা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সমীক্ষায়, ‘আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করতে আসেন কেন?’ প্রশ্নের জবাবে সর্বোচ্চ ২৫৩টি ভোট পড়েছে ‘অ্যাটেন্ডেন্সের জন্য’। যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৭১ শতাংশ। অন্যান্য অপশনগুলোর মধ্যে ‘বন্ধুদের সাথে দেখা করতে’ ৯ শতাংশ, ‘অ্যাটেনডেন্স এর জন্য ও স্যাররা কি পড়ায় জানার জন্য কারণ ঐখান থেকেই প্রশ্ন করবে’ ৬ শতাংশ এবং ‘শিখতে’, ‘পছন্দের মানুষকে দেখতে’ ও ‘অবসর সময় কাটানোর জন্য’ প্রতিটি অপশনে ৪ শতাংশ করে ভোট পড়েছে। এছাড়া ব্যবহারকারীদের যুক্ত করা অপশনগুলোর মধ্যে ‘শিখাতে’ ১ শতাংশ, ‘ধৈর্য বাড়ানোর জন্য’ ১ শতাংশ।
সমীক্ষার এ ফলাফল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান- ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির আগে এমন ধারণা ছিল যে এখানে ক্লাসগুলো হবে ভিন্নরকম। অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারব। অনেক ইন্টার্যাক্টিভ হবে ক্লাসগুলো। শিক্ষকরাও অনেক এনার্জিটিক হবে। অনেক কিছু নিয়ে কাজ হবে, গবেষণা হবে। কিন্তু ভর্তি হয়ে ক্লাস করার পর দেখলাম চিত্র একেবারে ভিন্ন। এখানে ক্লাস করা আর না করা আমার কাছে একই কথা বলে মনে হয়। বেশিরভাগ শিক্ষকই ক্লাসে এসে সিলেবাস ওয়াইজ নির্ধারিত টপিকে তাদের তৈরি করা স্লাইডগুলো শো করেন যেটি খুবই বিরক্তিকর। স্লাইডগুলোর যুগোপযোগী নয়। এরপর সেই কন্টেন্ট থেকেই আবার পরীক্ষা নেওয়া হয়। এখানে নতুন করে জানার, প্রশ্ন করার জায়গা সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কিছু শিক্ষককে তো প্রশ্নও করা যায় না। আবার অনেকে ক্লাসের টাইমও মেইনটেইন করেন না। অহেতুক ক্লাস নেবার নাম নিয়ে বসিয়ে রাখেন। তবে হাতে গোনা দু- একজন শিক্ষক আছেন যারা দারুন পড়ান। বেসিক বুঝিয়ে পড়ান, বোঝানোর জন্য ভিডিও এনিমেশানের সহায়তা নেন। সবাই যদি এভাবে পড়াতেন তবে শিক্ষার্থীদের জন্যে অনেক উপকার হতো।’
শুভ নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় হলো শেখার জায়গা, নতুন করে ভাবার এবং সৃষ্টি করার জায়গা কিন্তু আমরা কি শিখছি? এমন শিক্ষা কার্যক্রমের কারণে একটা জাতি মেরুদণ্ডহীন হয়ে পড়ছে। ডিগ্রি ঠিকই অর্জিত হচ্ছে কিন্তু সেটি দেশ ও দশের কোনো উপকারে লাগছে না। দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শিক্ষার্থীরা এখন শুধু ঝিমায়, এর কারণ কি সেটা গুরুত্বের সাথে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনার পরিবেশ আরো আনন্দময় করে তুলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘একঘেয়ে সিলেবাস আর সেটার প্রেশার দিয়ে তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা এবং সম্ভাবনাকে দমিয়ে রাখা যাবে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতে এরকম নানা নেতিবাচক বিষয়গুলো বেশ ভালোভাবে জুড়ে বসেছে। এর দারুণ ফলাফলই হলো বেকারত্ব, ডিগ্রিধারী বেকার হওয়ার মতো অভিশাপ আর কি হতে পারে একটা মানুষের জীবনে? এ বিষয়গুলোকে হালকাভাবে নেওয়ার কারণেই অন্যদেশের তুলনায় আমরা জাতিগতভাবে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়ছি।’
বিষয়টি নিয়ে মাভাবিপ্রবির টেক্সটাইল বিভাগের প্রভাষক মো. তারেক রহমান বলেন, ‘আমার দৃষ্টিতে একটি বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন, শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাসে আসছেন, তার পাশাপাশি ক্লাসে এসে তাঁরা কী পাচ্ছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পাঠদান কতটা জীবনঘনিষ্ঠ, সময়োপযোগী, অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবভিত্তিক হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত আগ্রহ, একাডেমিক প্রস্তুতি, কর্মমুখী প্রত্যাশা এবং শিক্ষার প্রতি দায়বদ্ধতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থাৎ, এই সংকটের দায় এককভাবে শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌক্তিক হবে না।’
শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও পাঠদান পদ্ধতিতে পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, ‘আমার মতে, শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ বাড়াতে প্রথমেই ক্লাসকে কেবল সিলেবাস শেষ করার জায়গা থেকে বের করে জ্ঞান বিনিময়, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান ও নতুন ধারণা তৈরির জায়গায় পরিণত করতে হবে। পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে বাস্তব জীবনের, শিল্প-কারখানার এবং পেশাগত ক্ষেত্রের সম্পর্ক তুলে ধরতে হবে। প্রশ্ন করার স্বাধীনতা, আলোচনা, কেস স্টাডি, প্রেজেন্টেশন ও হাতে-কলমে শেখার সুযোগ বাড়াতে হবে।’
শিক্ষকদের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদেরও আত্মপর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। একজন শিক্ষক শুধু তথ্য উপস্থাপন করবেন না। বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে জানার কৌতূহল তৈরি করবেন। একই পাঠদান পদ্ধতি সব প্রজন্মের শিক্ষার্থীর জন্য সমান কার্যকর নাও হতে পারে। তাই সময়ের সঙ্গে পাঠদান কৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রেণিকক্ষ পরিচালনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।’
অন্যদিকে, শিক্ষার্থীদেরও নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এ শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদেরও বুঝতে হবে যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়। এটি নিজের চিন্তাশক্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও পেশাগত দক্ষতা গড়ে তোলার জায়গা। শুধু উপস্থিতি নিশ্চিত করা কিংবা পরীক্ষায় পাস করার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতি আগ্রহী হতে হবে।’