০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৯

চুয়েট কর্মকর্তা সমিতির সভাপতির বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ

ভুক্তভোগী কর্মকর্তা ইয়াসির আরাফাত  © সংগৃহীত

চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি সৈয়দ মো. ইকরাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার, বক্তব্য প্রদানে বাধা এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র অ্যাকাউন্টস অফিসার ইয়াসির আরাফাত বৃহস্পতিবার উপাচার্যের কাছে দেওয়া লিখিত অভিযোগে এসব বিষয় উল্লেখ করে নিরপেক্ষ তদন্ত, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রশাসনিক সুরক্ষা দাবি করেন।

অভিযোগে বলা হয়, গত ২৮ অক্টোবর ইউজিসির তদন্ত কমিটির সভা শুরুর আগে সভাপতি সৈয়দ মো. ইকরাম সবার সামনে তর্জনী উঁচিয়ে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং আসন ছেড়ে যেতে বলেন। পরে সাধারণ সম্পাদক মো. মকবুল হোসেন তাকে বক্তব্য দিতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন তাকে সতর্ক করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, সাধারণ সম্পাদক মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে আগেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, হুমকি ও অশালীন ভাষায় গালাগালির অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের কারণে তিনি গত তিন মাস ধরে নিজ দপ্তরে প্রবেশ করতে পারছেন না বলেও লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি ইকরাম সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক সায়েমের ভাগনে উল্লেখ করে অভিযোগে বলা হয়, পারিবারিক সম্পর্ক ও প্রাতিষ্ঠানিক পদের সুবাদে তিনি প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। এ ছাড়া, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নকালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক তদবির করার দাবি করা হয়। চলমান ছাত্র আন্দোলনে উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ সব বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাকাউন্টস অফিসার ইয়াসির আরাফাত বলেন, ৩০ ঘণ্টার নিজের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে তিনি বলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। আমার অফিসের সময় সকাল ৯টা। ১২ অক্টোবর তারিখে স্যার উপাচার্য দপ্তরে প্রবেশ করলে অনেক কর্মকর্তার ন্যায় আমিও উপাচার্য স্যারের দপ্তরে গিয়েছিলাম।  সকাল ১১.৪৫ পযর্ন্ত  বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ স্বাভাবিক ছিল ১২.০০ ঘটিকার পরে মহামাণ্য রাষ্ট্রপতি আদেশ ও সরকারের আদেশ অমান্য করে একটি মহল ও কিছু শিক্ষার্থী পরিকল্পিতভাবে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার লক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ উত্তপ্ত করে এবং এক পর্যায়ে আমরা অবরুদ্ধ হয়ে প‌ড়ি। আ‌মি বা‌হির হ‌তে চাইলেও বা‌হির হওয়ার সুযোগ ছিল না। ভি‌সি ম‌হোদয়ের এমন প‌রি‌স্থি‌তিতে আ‌মি নি‌জে‌কে বা‌হির হওয়ার কথা চিন্তাও কর‌তে পা‌রি নাই। স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে এভাবে রেখে চলে আসা মান‌বিক ন‌য়। সরকারও আমাকে প্রশ্ন করতে পারত, আমি তার সঙ্গে থাকার পর তাকে রেখে চলে গেলাম কেন। তখন সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমার জন্য কঠিন হতো। মান‌বিক ও নৈতিক জায়গা থেকে আমি মনে করেছি, স্যারের সঙ্গে থাকা এবং সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শেষ পর্যন্ত তার পাশে থাকাই আমার দায়িত্ব।’

তিনি বলেন, এর মধ্যে ফুল নিয়ে আসার যে প্রক্রিয়ার কথা বলেছিলাম, সে সময়ও তাদের আসতে দেওয়া হয়নি। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে ফুল নিয়ে আসার দৃশ্যের ফুটেজ দেখানো হয়েছিল বলে মনে পড়ে। আটক অবস্থায় আমরা বি‌শ্রি ভাষায় গালাগা‌লিসহ বি‌ভিন্ন শ্লোগান শুন‌তে পাই। সারারাত মানবেতর পরিস্থিতিতে কাটাতে হয়েছে। আমাদের খাবার আনতে দেয়া হয়নি এবং  খাবার পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছিল না। এমনকি লুঙ্গি ও গামছা আনতে দেয়া হয়নি। পানি, বিদ্যুৎসহ নাগরিক মৌলিক চাহিদা ছাড়াই বিভীষিকাময় রাতসহ ৩০ ঘন্টা কাটাতে হয়েছে। আমা‌দের‌কে কাহা‌রো পক্ষ থে‌কে কোনো সহযোগিতা করা হয়নি। এক কথায়, আমাদের কোনো ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়নি। রাত ১১টার দিকে পুলিশ আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসে। আমরা সেই খাবার খাই। এরপর সকাল হয়। আমাদের গোসলসহ কোনো প্রয়োজনীয় সুবিধা ছিল না।

তিনি বলেন, ‘এভাবে মানবেতর পরিস্থিতিতে থাকার একপর্যায়ে ভিসি স্যার নিজেও অসুস্থতার কথা জানান এবং সরকারের সহযোগিতা চান। পরে সরকারের সহায়তায় রাত আটটার দিকে আমাদের সেখান থেকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

নিজের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও হুমকির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার সহকর্মীরা আমাকে ইতিবাচক বা নেতিবাচক—কোনো ধরনের উল্লেখযোগ্য বার্তা দেননি। তবে আমাকে চুয়েট অফিসার এসোসিয়েশন হোয়াটস এ্যাপ গ্রুপের  সদস্য  বাতিল করা হয়েছে। এই বিষয়ে জানতে চাইলে অফিসার এসোসিয়েশন সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কল দিলে কল রিসিভ করেননি।আমি চুয়েট উপাচার্য স্যারের সাথে ছিলাম। উপাচার্য স্যারের সাথে আটকা পড়া সবাইকে একসাথে সরকারের সহযোগিতায় ১৩ অক্টোবর রাত ৮ ঘটিকায় আমাদের বের করা হয় এবং বের করার সময় চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার  এবং জেলা সি‌ভিল সার্জেন্ট, চুয়েট উপ-রেজিস্ট্রার নজরুল ইসলাম এর উপস্থিতিতে  অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা সকল‌কে চেক আপ সম্পন্ন হয় ও সংবাদকর্মীদের উপ‌স্থি‌তি‌তে আমা‌দের বের করা হয়। আমরা সক‌লে শা‌রীরীকভা‌বে দূর্বল এবং মান‌ষিকভা‌বে বিপর্যস্থ অবস্থায় ছিলাম।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি যদি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে অবস্থান করে রাষ্ট্রের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে থাকি, তাহলে সেটি কীভাবে অপরাধ হয়? এ কারণে যদি আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের প্রচার চালানো হয়, তাহলে এ বিষয়ে রাষ্ট্র বা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলে আমি মনে করি। আমাকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে অনলাইন মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়েছে এবং অনেকে তা জানতে পেরেছেন।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ক্ষুদ্র কর্মকর্তা হিসে‌বে  দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, সরকার যখন যাকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ করবে রাষ্ট্রের আইন ও সরকারের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাকে রিসিভ ও সর্বাত্নক সহযোগিতা করা আমাদের দা‌য়িত্ব ও কর্তব্য। আমরা প্রজাত‌ন্ত্রের কর্মচা‌রী। ম‌নে রাখা উ‌চিৎ, উপাচার্য হি‌সে‌বে ব্যক্তি কো‌নো মূখ্য বিষয় ন‌হে। পরিশেষে, সরকারের কাছে কোনো দাবি আছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কাছে আমার বিনীত আবেদন ও দাবি হলো, জনস্বার্থে বুয়েট ব্যতীত অন্য তিনটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত মোট জনবলের ৫ শতাংশ কর্মকর্তার আন্তঃবদলির ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইউজিসি গঠিত চুয়েটের সংকট নিরসনবিষয়ক কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বুয়েট বাদে বাকি তিনটি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে আন্তঃবদলির জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপন (এসআরও) জারি করা যেতে পারে। এসআরও অনুযায়ী এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে সরকার জনস্বার্থে কর্মকর্তাদের বদলি করতে পারবে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুকূল  পরিবেশ সৃষ্টি হবে এবং সরকার যেকোনো সংকট সহজে মোকাবিলা করতে পারবে।”

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি সৈয়দ মো. ইকরাম ও সাধারণ সম্পাদক মো. মকবুল হোসেনকে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।