আন্তর্জাতিক ম্যাপিং পুরস্কারে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ইয়ুথম্যাপার্সের তিন অর্জন
আন্তর্জাতিক ‘ওপেন ম্যাপিং উইমেন অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এ তিনটি পুরস্কার অর্জন করেছে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) শিক্ষার্থীদের সংগঠন ইয়ুথম্যাপার্স অ্যাট বিএমইউ। পুরস্কারের ‘ওপেন ম্যাপিং কমিউনিটি অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে সংগঠনটি। একই বিভাগে ‘উইমেন-ফোকাসড প্রজেক্ট অব দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে সংগঠনটির ‘নারী-স্বস্তি মানচিত্র’ প্রকল্প দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে। এ ছাড়া ‘ওপেন ম্যাপিং এমার্জিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন সংগঠনটির সদস্য শানজি রহমান।
হিউম্যানিটারিয়ান ওপেনস্ট্রিটম্যাপ টিম (হট) আয়োজিত এ পুরস্কার উন্মুক্ত মানচিত্রায়ন ও মানবিক কার্যক্রমে নারীদের নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপেনস্ট্রিটম্যাপ ও হট কমিউনিটির নারী ম্যাপার, সংগঠন এবং নারী নেতৃত্বাধীন উদ্যোগগুলো এ পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়।
‘ওপেন ম্যাপিং এমার্জিং স্টার অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জনকারী শানজি রহমান ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের শুরুর সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মানবিক ও কমিউনিটিভিত্তিক ম্যাপিং কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ঢাকার ২৯টি বস্তি এলাকায় পরিচালিত ‘ঢাকা থ্রাইভ: ট্রান্সফরমিং আরবান রেজিলিয়েন্স থ্রু জিওস্পেশিয়াল ইনোভেশন’ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল তার। প্রকল্পটির আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থান, গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও অবকাঠামোর তথ্য সংগ্রহ এবং সড়ক পর্যায়ের ছবি ম্যাপিং করা হয়। অবদানের দিক থেকে তিনি ছিলেন প্রকল্পটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবদানকারী।
এ ছাড়া নারীদের জন্য নিরাপদ ও ব্যবহার উপযোগী গণশৌচাগারের তথ্য সহজলভ্য করতে নেওয়া ‘নারী-স্বস্তি মানচিত্র’ প্রকল্পের নেতৃত্ব দেন শানজি। তাঁর তত্ত্বাবধানে দলের সদস্যরা ঢাকার মিরপুর এলাকার বিভিন্ন গণশৌচাগারের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও নারীদের ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাই করে তথ্য সংগ্রহ করেন।
শানজি রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক এ স্বীকৃতি পেয়ে তিনি আনন্দিত ও গর্বিত। বৈশ্বিক পরিসরে বিশ্ববিদ্যালয়কে তুলে ধরতে পারাকে বড় সম্মান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারীদের নিরাপদ স্যানিটেশনের জন্য ‘নারী-স্বস্তি’, উপকূলীয় প্রান্তিক নারীদের নিয়ে ‘হাররাইজ’ এবং ইয়ুথম্যাপার্স বিএমইউর মানবিক মানচিত্রায়ন কার্যক্রম তাঁকে এ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। এ অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়র শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং ভবিষ্যতে তাঁরা সংগঠনটির কার্যক্রম আরও এগিয়ে নেবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
‘ওপেন ম্যাপিং কমিউনিটি অব দ্য ইয়ার’ বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করা ইয়ুথম্যাপার্স অ্যাট বিএমইউ ২০২৪ সাল থেকে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, তরুণদের নেতৃত্ব বিকাশ, নারী ম্যাপারদের সম্পৃক্ততা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মানচিত্রায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে তাদের ৩০ সদস্যের মধ্যে ১১ জন নারী। ২০২৫ সালে ২২ সদস্যের মধ্যে ৮ জন এবং ২০২৪ সালে ২৪ সদস্যের মধ্যে ১০ জন নারী ছিলেন। নারীদের ধারাবাহিক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে সংগঠনটি ‘উইমেন সার্টিফিকেশন অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করে।
এবার দ্বিতীয় স্থান অর্জন করা ‘নারী-স্বস্তি মানচিত্র’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ঢাকার নারীদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহার উপযোগী গণশৌচাগারের তথ্য সহজলভ্য করা। প্রকল্পের আওতায় মিরপুরের ২, ৬, ৭, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর এলাকায় সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কোবো টুলবক্সের মাধ্যমে শৌচাগারগুলোর পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, সাবান ও টিস্যুর প্রাপ্যতা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার সুবিধা এবং নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থার বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা হয়।
সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল মানচিত্র। এতে শৌচাগারগুলোর অবস্থা তিনটি রঙে চিহ্নিত করা হয়েছে। সবুজ রঙে ভালো ও ব্যবহার উপযোগী, নীল রঙে মাঝারি মানের এবং লাল রঙে অপেক্ষাকৃত খারাপ অবস্থায় থাকা শৌচাগারগুলো দেখানো হয়েছে। ফলে নারীরা আশপাশের গণশৌচাগারের অবস্থান ও ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে আগেই ধারণা নিতে পারবেন।
এ উদ্যোগের মাধ্যমে নগর পরিকল্পনায় নারীবান্ধব অবকাঠামোর প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে সংগঠনটি। ভবিষ্যতে মিরপুরের বাইরে পুরো ঢাকা মহানগরীতে এ মানচিত্র সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। পাশাপাশি নারীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও নিরাপদ জনপরিসরের তথ্যও এতে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এ অর্জনকে সংগঠনের সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন ইয়ুথম্যাপার্স অ্যাট বিএমইউর সভাপতি আবু সাইদ আল-ইমাম। তিনি বলেন, হিউম্যানিটারিয়ান ওপেনস্ট্রিটম্যাপ টিমের এ আয়োজনে কমিউনিটি বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন তাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। নারী নেতৃত্ব, ‘নারী-স্বস্তি’ প্রকল্প এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় তরুণদের তথ্যনির্ভর কাজ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
এ অর্জন প্রতিটি সদস্যের নিরলস পরিশ্রমের ফসল। বৈশ্বিক এ স্বীকৃতি নারীবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গঠনে তাঁদের আরও অনুপ্রেরণা জোগাবে।