২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৫:০৫

অব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্নতায় বিপর্যস্ত গোবিপ্রবির বিজয় দিবস হল

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) বিজয় দিবস হলে নানা অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতা ও আবাসন সংকটে দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন আবাসিক শিক্ষার্থীরা। ওয়াশরুমে দরজা ও আলোর সংকট, অধিকাংশ বেসিন অকেজো, ড্রেনে জমে থাকা নোংরা পানি, মশার উপদ্রব, গণরুমে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, নিম্নমানের খাবার এবং ঝুঁকিপূর্ণ রিডিংরুমসহ নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও পড়াশোনা। এসব সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ থাকলেও হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে বলে দাবি তাদের।

হলের বিভিন্ন তলায় সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতি পাটাতনের দুই পাশে প্রায় ১০টি করে বেসিন থাকলেও সচল রয়েছে মাত্র দুই থেকে তিনটি। ওয়াশরুম ও বাথরুমের অনেক দরজা ও লাইট অকেজো। কোথাও দরজা ও আলোর ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী। ফলে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

হলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, দায়িত্ব পালনকালে নিরাপত্তাকর্মীদের একাংশকে দাবা ও লুডু খেলতে কিংবা ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে দেখা যায়। রাতের দায়িত্ব পালনের সময়ও যথাযথ সতর্কতা বজায় রাখা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া হলের পাঁচতলা পর্যন্ত কুকুরের অবাধ বিচরণ এবং ডাস্টবিনের ময়লা মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ায় পরিবেশ আরও নোংরা হচ্ছে।

ড্রেনের ময়লা ও মশার উপদ্রবে স্বাস্থ্যঝুঁকি 
হলের ভেতরে পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে নোংরা পানি ও আবর্জনা জমে রয়েছে। দীর্ঘদিনের ময়লা, পলিথিন ও বর্জ্য থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এতে মশার উপদ্রব বেড়েছে এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে হলের একজন শিক্ষার্থী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বলেও তারা জানিয়েছেন।

আবাসিক শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘এই হলে শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো কোনো ব্যবস্থা নেই। বাথরুম ও ওয়াশরুমে দরজা নেই, পর্যাপ্ত লাইটও নেই। বেসিনগুলোর অধিকাংশই ঠিকমতো কাজ করে না। একজন বেসিন ব্যবহার করলে অন্যদের অপেক্ষা করতে হয়। পাঁচতলা পর্যন্ত কুকুর ঘুরে বেড়ায় এবং ডাস্টবিনের ময়লা মেঝেতে ছড়িয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। হল কর্তৃপক্ষের উচিত এসব বিষয়ে তদারকি করা এবং শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করা।’

গণরুমে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ শিক্ষার্থী 
হলের গণরুমগুলোর পরিবেশ নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত আলো ও ফ্যানের ব্যবস্থা না থাকায় গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। একাধিক বেড পাশাপাশি লাগিয়ে সীমিত জায়গায় ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে। কোনো কোনো ২৫ থেকে ৩০ জনের ধারণক্ষমতার কক্ষে ৬০ থেকে প্রায় ১০০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী বসবাস করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গণরুমে সর্বোচ্চ ৩০ জনের থাকার উপযোগী জায়গায় ৬০ জনের বেশি শিক্ষার্থী বসবাস করছেন। হলের আসন বণ্টনের সময় গণরুমে থাকা শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, দুপুরের অবশিষ্ট খাবার রাতে পরিবেশন করা হয় এবং খাবারের মানের তুলনায় দাম বেশি। মাছের দাম ৫০ টাকার কম না হওয়ায় তা অনেক শিক্ষার্থীর নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

খাবারের মান ও দাম নিয়ে অভিযোগ 
হলের ডাইনিংয়ের খাবারের মান, মূল্য ও পরিবেশন নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় দুপুরের অবশিষ্ট খাবার রাতের খাবার হিসেবে পরিবেশন করা হয়। খাবারের মান সন্তোষজনক না হলেও দাম তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে মাছের দাম অন্তত ৫০ টাকা হওয়ায় সীমিত সামর্থ্যের শিক্ষার্থীদের জন্য নিয়মিত খাবার কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবাসিক শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘হলের ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত নোংরা। ড্রেনে ময়লা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং মশার উপদ্রব বাড়ছে। গণরুমের পরিবেশও খুব খারাপ। ডাইনিংয়ের খাবারের মান নিম্ন হওয়ায় শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো খেতে পারছেন না। দুপুরের খাবার রাতে পরিবেশন করা হয়। মাছের দামও শিক্ষার্থীদের নাগালের বাইরে। হলের প্রভোস্টের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করা হোক।’

ঝুঁকিপূর্ণ রিডিংরুমে ব্যাহত পড়াশোনা
হলের রিডিংরুমেও রয়েছে নানা সমস্যা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস ও ফ্যানের ব্যবস্থা নেই। দেয়াল থেকে বালু ও পলেস্তারা খসে পড়ছে, যা বইপত্র ও শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। জানালার গ্রিল ভেঙে যাওয়ায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া জানালার পাশে টয়লেটের ম্যানহোল বা ড্রেন থাকায় জানালা খুললে দুর্গন্ধ রিডিংরুমে ছড়িয়ে পড়ে।

বসার আসন সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে জায়গা না পেয়ে ফিরে যেতে হয়। কাঠের চেয়ারের পরিবর্তে প্লাস্টিকের চেয়ার ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ইংরেজি বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুল লতিফ বলেন, ‘রিডিংরুমে বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। কক্ষের পরিবেশও অগোছালো। দেয়াল থেকে বালু খসে পড়ে আমাদের বই-খাতা নষ্ট হচ্ছে। পাশের জানালার গ্রিল খুলে পড়ছে এবং ড্রেন থেকে দুর্গন্ধ আসে। এতে আমাদের পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। আমরা চাই, হল প্রশাসন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক।’

এসব বিষয়ে বিজয় দিবস হলের প্রভোস্ট রবিউল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন আগে হলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তিনি একটি সভা করেছেন। ড্রেনের ময়লা ও জলাবদ্ধতার বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তবে খাবারের উচ্ছিষ্ট পানির লাইনে ফেলার কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরও কিছুটা দায় রয়েছে বলে মনে করেন প্রভোস্ট।

গণরুমের সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেখানে শিক্ষার্থীরা নিয়মশৃঙ্খলা মেনে না চলায় পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। লাইট ও ফ্যানের সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে তেমন অভিযোগ না আসায় সেগুলো মেরামত করা হয়নি। ছুটির পর সরেজমিনে গিয়ে সমস্যাগুলো পর্যালোচনা করা হবে।

রিডিংরুমের দেয়াল থেকে বালু খসে পড়া এবং জানালার গ্রিল ভেঙে যাওয়ার অভিযোগও তার কাছে আসেনি বলে জানান তিনি। ছুটির পর সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রভোস্ট।

ডাইনিংয়ে মাছের দাম প্রসঙ্গে রবিউল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা চাইলে ছুটির পর ডাইনিং পরিচালকের সঙ্গে আলোচনা করে মাছের দাম কমানোর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। বেসিন ও দরজা মেরামতের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব কাজ ব্যয়বহুল হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন। এ ছাড়া হলের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।