২৪ অক্টোবর ২০২৬, ২১:৪২

টেসলার উড়ন্ত রোডস্টার প্রকল্পে কাজ করেছেন বুয়েট শিক্ষার্থী তারেক সরোয়ার

বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী তারেক সরোয়ার   © টিডিসি ফটো

বিশ্বখ্যাত বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার আলোচিত রোডস্টারের নতুন মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষার্থী তারেক সরোয়ার। ২০২৩ সালে টেসলায় ইন্টার্নশিপ করার সময় তিনি গাড়িটির আন্ডারবডি বা নিচের অংশের স্থায়িত্ব ও কার্যক্ষমতা মূল্যায়নের দায়িত্বে ছিলেন।

দীর্ঘ তিন বছর পর সম্প্রতি গাড়িটির পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ্যে আসার পর প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন তিনি। বর্তমানে তারেক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিমান ইঞ্জিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান হানিওয়েলে কর্মরত রয়েছেন।

তারেক সরোয়ার বুয়েটের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী। ২০২৩ সালে টেসলায় ইন্টার্নশিপ করার সময় তিনি রোডস্টারের নতুন মডেল তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে যুক্ত হন। গাড়িটির আন্ডারবডি তৈরির প্রচলিত পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে একে একটিমাত্র অংশ হিসেবে ঢালাই করার উদ্যোগে কাজ করেন তিনি।

সাধারণত গাড়ির নিচের অংশ বা আন্ডারবডি একাধিক স্টিল শিট কিংবা ধাতব পাত জোড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। তবে টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের লক্ষ্য ছিল এই প্রচলিত পদ্ধতি বদলে পুরো আন্ডারবডি একটিমাত্র অংশ হিসেবে ঢালাই করা। বড় আকারের একটি যন্ত্রাংশ একবারে ঢালাই করা ছিল প্রকৌশলগতভাবে অত্যন্ত কঠিন কাজ।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেসলা বিশেষ ধরনের অ্যালুমিনিয়াম অ্যালয় উদ্ভাবন করে। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর প্রতিষ্ঠানটি প্রতি পাঁচ সেকেন্ডে একটি করে আন্ডারবডির একক অংশ তৈরির পদ্ধতি আয়ত্ত করে। তারেকের ভাষ্যমতে, পুরো উত্তর আমেরিকায় এত বড় একটি অংশ একবারে ঢালাই করার আর কোনো পূর্ববর্তী দৃষ্টান্ত নেই।

এই জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় তারেক সরোয়ারের মূল দায়িত্ব ছিল বিভিন্ন তীব্র আবহাওয়ায় গাড়িটির আন্ডারবডির দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্ষমতা মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করা। সময়ের সঙ্গে উপাদানটির স্থায়িত্ব, আচরণ এবং কার্যক্ষমতা কেমন থাকবে, তা বিশ্লেষণ করাই ছিল তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তার এই মূল্যায়ন থেকে পাওয়া ফলাফল পরবর্তী সময়ে যন্ত্রাংশটির চূড়ান্ত নকশা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে গাড়ির আন্ডারবডি তৈরির এই জটিল প্রকৌশল প্রক্রিয়ায় তারেকের কাজ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৩ সালে প্রকল্পটিতে কাজ করার প্রায় তিন বছর পর সম্প্রতি গাড়িটির পূর্ণাঙ্গ রূপ প্রকাশ্যে আসে। এরপর প্রকল্পে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন তারেক। তার এই অভিজ্ঞতা বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের কাজের সুযোগ ও অবদানের বিষয়টিও সামনে এনেছে।

প্রকৌশলজগতের বড় কোনো উদ্ভাবনের পেছনে শুধু দৃশ্যমান নকশাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উপাদানবিজ্ঞান, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অসংখ্য কারিগরি সিদ্ধান্ত। বুয়েটের ম্যাটেরিয়ালস অ্যান্ড মেটালার্জিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অর্জিত ধাতব পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও স্থায়িত্ববিষয়ক জ্ঞান তারেককে আধুনিক গাড়ি নির্মাণশিল্পের এই কঠিন প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করেছে।

টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা তারেকের পেশাগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই প্রকল্পে তার দায়িত্ব দেখিয়েছে, গাড়ি নির্মাণের মতো উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে উপাদানের স্থায়িত্ব ও কার্যক্ষমতা যাচাই কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিশ্বমানের প্রকৌশল প্রকল্পে বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণের বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌর শহরের আবু তাহের ও ছাহেরা আক্তার রুমা দম্পতির বড় ছেলে তারেক সরোয়ার। তার বেড়ে ওঠা ও স্থায়ী নিবাস ঢাকার উত্তরায়। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক তারেক ২০১৬ সালে কম্পিউটার প্রকৌশলী সুমাইয়া আফরিনকে বিয়ে করেন।

টেসলার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল প্রকল্পে কাজ করার অভিজ্ঞতায় গর্বিত তারেকের পরিবারও। বুয়েটের সাবেক এই শিক্ষার্থীর পেশাগত যাত্রা বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাতে কাজ করার সম্ভাবনার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে।