২ শিক্ষার্থীর সংগ্রাম থেকে জন্ম নেওয়া গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত আড়াই হাজার শিক্ষার্থী ও গবেষক
গবেষণার প্রতি আগ্রহ ছিল, কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনার অভাব ছিল বড় বাধা। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কোন সফটওয়্যার বা টুলস শিখতে হবে, কীভাবে গবেষণাপত্র লিখতে ও প্রকাশ করতে হয়- এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিজেদেরই শিখতে হয়েছে অনেক কিছু। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণার পথ সহজ করার উদ্যোগ নেন দুই তরুণ। তাঁদের হাত ধরে শুরু হওয়া ইনোভেটিভ রিসার্চ সেন্টার (আইআরসি) এখন প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী ও গবেষকের একটি নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
গবেষণায় আগ্রহী তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিতে সহায়তা করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এরই ধারাবাহিকতায় গত ৯ অক্টোবর ঢাকার নিকুঞ্জ-২ এলাকায় আইআরসির প্রথম ঢাকা শাখার উদ্বোধন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের শুরুতে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী আকিব হাসান দীপু এবং মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসানের হাত ধরে আইআরসির যাত্রা শুরু হয়।
শিক্ষার্থী হিসেবে গবেষণায় যুক্ত হতে গিয়ে তাঁরা উপলব্ধি করেন, অনেকের আগ্রহ ও সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা, তথ্য এবং হাতে-কলমে শেখার সুযোগের অভাবে গবেষণার শুরুতেই বাধার মুখে পড়তে হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁরা এমন একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যেখানে শিক্ষার্থীরা গবেষণার মৌলিক বিষয় থেকে শুরু করে আধুনিক গবেষণাপদ্ধতি পর্যন্ত শেখার সুযোগ পাবে।
আইআরসির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আকিব হাসান দীপু বলেন, আমরা যখন গবেষণা শুরু করতে চেয়েছি, তখন অনেক কিছুই খুঁজে খুঁজে নিজেদের শিখতে হয়েছে। সেই কষ্টটা আমরা জানি। তাই ঠিক করেছিলাম, যে পথে আমরা হোঁচট খেয়েছি, পরের প্রজন্মের জন্য সেই পথটা সহজ করে দেব।
বড় পুঁজি কিংবা প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো ছাড়াই শুরু হওয়া এই উদ্যোগের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, গবেষক, শিক্ষক ও পেশাজীবীরা।
আইআরসির কার্যক্রমের মূল দর্শন হলো, শুধু গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত গবেষণাদক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা। স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা যেন গবেষণার পদ্ধতি বুঝতে পারেন, বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারেন, গবেষণা প্রকল্পে অংশ নিতে পারেন এবং দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে পারেন- সেই লক্ষ্যেই সাজানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম।
সরকারি, বেসরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গবেষণা সহকারী, শিক্ষক এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ও বায়োটেকনোলজি খাতের পেশাজীবীরাও প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন।
আইআরসির প্রধান একাডেমিক কর্মকর্তা ও প্রশিক্ষক সাব্বির আহমেদ বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু একজন শিক্ষার্থীকে কোর্স করানো নয়; বরং এমনভাবে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা, যেন সে নিজে শেখার পাশাপাশি অর্জিত জ্ঞান অন্যদেরও শেখাতে পারে।
গবেষণার প্রশিক্ষণে আর্থিক সীমাবদ্ধতা যেন বড় বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সে লক্ষ্যেও কাজ করছে আইআরসি। প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে অন্তত একটি বিনামূল্যের গবেষণা কর্মশালা আয়োজনের চেষ্টা করে। এসব কর্মশালায় গবেষণায় নতুনদের জন্য প্রাথমিক ধারণা, গবেষণার কাজ শুরুর পদ্ধতি এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
পাশাপাশি বায়োইনফরমেটিক্স, কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, কম্পিউটার-এইডেড ড্রাগ ডিজাইন (সিএডিডি), নেটওয়ার্ক ফার্মাকোলজি, আরএনএ সিকুয়েন্স বিশ্লেষণ, মলিকুলার ডায়নামিক্স, মাল্টি-ওমিক্স এবং ওষুধ আবিষ্কারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স, ইন্টার্নশিপ ও কর্মশালা পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া গবেষণা পদ্ধতি, গবেষণায় পাইথনের ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক লেখালেখি ও গবেষণাপত্র প্রকাশনা এবং উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
বাংলা ভাষায় গবেষণাবিষয়ক শিক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি পূরণে আইআরসি প্রকাশ করেছে ‘দি ফিউচার ইজ বিইনফরমেটিক্স ’ ও ‘গবেষণার ক্যানভাস’ নামে দুটি বই। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য, জটিল গবেষণাবিষয়ক ধারণাগুলো সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে নতুনদের শেখার পথ আরও সহজ করা।
##তরুণদের হাত ধরে গড়ে উঠছে গবেষণাভিত্তিক নেটওয়ার্ক
দুই শিক্ষার্থীর উদ্যোগে শুরু হওয়া আইআরসির কার্যক্রম এখন একটি বৃহত্তর সাংগঠনিক কাঠামো পেয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ১০ সদস্যের মূল দলের পাশাপাশি রয়েছে গবেষণা দল, অপারেশনস অ্যাসোসিয়েটস এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাস সমন্বয়কারীরা।
প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাকিবুল হাসান বলেন, আমরা চাই একজন শিক্ষার্থী আইআরসি-এ এসে শুধু একটি কোর্স শেষ করবে না, বরং নিজেকে একজন আত্মবিশ্বাসী গবেষক হিসেবে গড়ে তুলবে।
তাঁদের মতে, গবেষণার দক্ষতা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের জন্য নয়; বরং দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, নতুন উদ্ভাবন এবং জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে গত ৯ অক্টোবর ঢাকার নিকুঞ্জ-২ এলাকায় আইআরসির প্রথম ঢাকা শাখার উদ্বোধন করা হয়। নতুন শাখার মাধ্যমে গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
ভবিষ্যতে ইনোভেটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে তোলার লক্ষ্যও রয়েছে আইআরসির। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের জন্য হাতে-কলমে গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং গবেষণার বিভিন্ন পদ্ধতি সরাসরি অনুশীলনের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আইআরসির প্রতিষ্ঠাতারা মনে করেন, গবেষণার প্রশিক্ষণকে কেবল কোর্স শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা যেন নতুন গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ভবিষ্যতে ওষুধ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতিতে অবদান রাখতে পারেন, সেই পরিবেশ গড়ে তোলাই তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।
আকিব হাসান দীপু বলেন, আমাদের সবচেয়ে বড় ইচ্ছা হলো অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং এমন কিছু রেখে যাওয়া, যা প্রতিনিয়ত মানুষের উপকারে আসবে। আজ যে শিক্ষার্থী আমাদের কাছে গবেষণা শিখছে, কাল সে হয়তো এমন কোনো ওষুধ বা আবিষ্কারের অংশ হবে, যা হাজারো মানুষের জীবন বাঁচাবে। সেটাই আমাদের আসল সাফল্য।
নিজেদের শেখার পথে পাওয়া প্রতিবন্ধকতাকে অন্যদের জন্য সুযোগ তৈরির প্রেরণায় রূপ দিয়েছেন এই দুই তরুণ। আইআরসির উদ্যোগের মধ্য দিয়ে তাঁরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন, যারা গবেষণায় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতেও অবদান রাখবে।