১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৪৬

একেকটি মৃত্যু, একেকটি স্বপ্নের সমাপ্তি—১০ মাসে ৭ শিক্ষার্থীকে হারাল শাবিপ্রবি

প্রাণ হারানো সাত শিক্ষার্থী  © টিডিসি সম্পাদিত

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায় (শাবিপ্রবি) যেন থামছেই না শোকের মাতম। একের পর এক উদীয়মান শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুতে থমকে গেছে পুরো ক্যাম্পাস। চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের মোট ৭ জন শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পরপর এসব প্রাণহানির ঘটনায় সহপাঠী, শিক্ষক ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

​বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দশ মাসে পানিতে ডুবে ৩জন, সড়ক দুর্ঘটনায় ২জন, অসুস্থ হয়ে ১জন এবং বিষপানে ১জন শিক্ষার্থী মারা গেছেন।

বিষপানে প্রাণ গেল বাঁধনের
প্রেমঘটিত কলহের জেরে কীটনাশক পান করে চিকিৎসাধীন থাকা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর রাতে বিষপান করেন তিনি। ঘটনার ৯ দিন পর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ​মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ৩টায় মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইকবাল আহমেদ সিদ্দিকী।​

নিহত শিক্ষার্থীর নাম শাহরিয়ার বাঁধন (২১)। তিনি রসায়ন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার স্থায়ী ঠিকানা চুয়াডাঙ্গা জেলায়।

অসুস্থ হয়ে মারা যায় জিসান
গতকাল (১২ অক্টোবর) অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইইই বিভাগের ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন ইইই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় সাদমান
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদমান রহমান। শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন তপোবন আবাসিক এলাকার সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। 

নিহত শিক্ষার্থীর বাড়ি রাজবাড়ীর মধ্য ভবানীপুর এলাকায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন টিলারগাঁও এলাকার একটি মেসে থাকতেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষে মোটরসাইকেলে করে মদিনা মার্কেট এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন সাদমান। পথে স্পিডব্রেকারের কাছে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা লাগে। পরবর্তীতে তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রতন
এর আগে এ বছরের শুরুর দিকে ফেব্রুয়ারি মাসে মর্মান্তিক মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন গণিত বিভাগের ২০২১ -২২ সেশনের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রতন।

সুইমিংপুলে ঝরে দীপাঞ্জনের প্রাণ
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের চৌকিদিখি এলাকার ‘ব্রিটানিয়া সুইমিং পুলে’ সাঁতার কাটতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সহপাঠী সূত্রে জানা যায়, ওইদিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে সহপাঠীরা তাকে দ্রুত উদ্ধার করে নগরের দরগাহ গেট এলাকার নূরজাহান হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। 

বিছানাকান্দির স্রোতে তলিয়ে যান শান্ত 
গত ১৫ মে সিলেটের বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র বিছানাকান্দিতে ঘুরতে গিয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ হারান পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত বণিক (২২)। ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী বাজার এলাকার সন্তান শান্ত। ঘটনার দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে তিন বন্ধু মিলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ড সংলগ্ন জলাশয়ে গোসলে নামেন তারা। একপর্যায়ে পানির তীব্র স্রোত ও গভীরতায় তলিয়ে যান শান্ত। স্থানীয়রা চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হওয়ার পর রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তার নিথর দেহ উদ্ধার করে।

লালাখালে সলিল সমাধি মুসআব আমীনের
চলতি বছরের শুরুতেই প্রথম ট্র্যাজেডির শিকার হয় শাবিপ্রবি পরিবার। গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের লালাখালে ঘুরতে গিয়ে গোসলে নেমে প্রাণ হারান ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুসআব আমীন। মুসআব সাঁতার জানতেন না। নিহত মুসআব আমীন এবং শান্ত বণিক দুইজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।

এসব মৃত্যুর ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনায় আমরা দ্রুত সাড়া দিয়েছি তাদেরকে বাঁচানোর জন্য কিন্তু মৃত্যু অনিশ্চিত। একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। অদম্য মেধাবীদের হারানো শাবিপ্রবির অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।