যবিপ্রবির সেই ‘কালো রাত’: মুখোশধারীদের হামলা-লুট, ৯ বছরেও হয়নি বিচার
২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১১টার সময় যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবির) প্রধান ফটকের সামনে হঠাৎ ৩-৪টি কালো মাইক্রোবাস এসে দাঁড়ায়। এরপর কিছু কালো মুখোশধারী লোক গাড়ি থেকে নেমে ফটকে থাকা দুই আনসার সদস্যকে মারধর করে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। তার কিছুক্ষণের মধ্যে বোমা ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে যবিপ্রবির শহীদ মসিয়ূর রহমান (শ.ম.র) হল।
তারপরেই যবিপ্রবিতে নেমে আসে এক কালো রাত। ইতিহাসের পাতায় লেখা হয় যবিপ্রবিতে ছাত্র রাজনীতির দুই গ্রুপের কোন্দলে ঘটা আবাসিক হল ডাকাতি নামে এক কালো অধ্যায়। ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী ও নিরাপত্তাকর্মীদের দেওয়া তথ্য মতে জানা যায়, তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান ও তার অনুসারীসহ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন বহিরাগত সন্ত্রাসী মুখে মাস্ক ও কালো কাপড় বেঁধে হাতে আগ্নেয়াস্ত্রসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তারা শ.ম.র হলে প্রবেশ করে। প্রবেশ করেই প্রথমে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি চালায় তারা। এরপর একে একে হলের অন্তত ৫০টি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের লকড় ভেঙে তারা সংগ্রহ করতে থাকে ল্যাপটপ, ফোন এবং নগদ অর্থ। প্রায় তিন শতাধিক ফোন, এক শতাধিক ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে তখন। এই লুট ও ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ৪১ লক্ষ টাকা।
শুধু এই লুটপাটেই ক্ষান্ত হয়নি তারা। লুটপাটের জন্য আবাসিক হলে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতনও করেছেন তারা। এ সময় গুরুতর আহত হন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন শাখা সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ ৩০ থেকে ৪০ জন সাধারণ শিক্ষার্থী। তৎকালীন সময়ে এফএমবি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, তাকে লোহার পাইপ দিয়ে অমানবিকভাবে পিটিয়ে পায়ের হাড় সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেয়। তখন বাঁচার জন্য অনেকেই লুঙ্গি পরে খালি গায়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়েছিল। এতে আহত হয়েছিল অনেকেই। অনেকে আবার হল থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল শিক্ষক ডরমেটরিতে।
ঘটনার সূত্রপাত
জানা যায়, তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি সুব্রত বিশ্বাস ও সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসানের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় গ্রুপ (লবিং) পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। কমিটির শুরু থেকেই সুব্রত ও শামীম যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাইফুর রহমানের গ্রুপের অনুসারী ছিলেন। পরে ২০১৭ সালের প্রথম দিকে শামীম হাসান কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় লবিং পরিবর্তন করে এমপি কাজী নাবিল ও কেন্দ্রীয় সাবেক ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেনের অনুসারী হন। ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুপক্ষের মধ্যে সৃষ্টি হয় দ্বন্দ্ব। এছাড়াও জানা যায়, তৎকালীন টেন্ডারের টাকার ভাগকে কেন্দ্র করে তারা দুই গ্রুপে বিভক্ত হয় এবং পরে স্থানীয় রাজনৈতিক এক নেতার সহযোগিতায় সুব্রত গ্রুপ শামীম গ্রুপকে ক্যাম্পাস ছাড়া করে। পরবর্তীতে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার ও ছাত্রহল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শামীম গ্রুপ হলে এ আক্রমণ চালায়।
তৎকালীন প্রশাসনের পদক্ষেপ
হলে আক্রমণ ও ডাকাতির অভিযোগে ৭ জন শিক্ষার্থীকে সাময়িক বহিষ্কার পাশাপাশি তাদের ও অজ্ঞাত ৩০-৪০ জনের নামে মামলা করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
তবে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সাময়িক বহিষ্কারের পর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর শাস্তির মুখোমুখি হননি।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী ও আহত শিক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হলেও, সেই টাকা আবার লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি সুব্রত বিশ্বাসসহ কমিটির অন্যান্য সদস্যের বিরুদ্ধে। ভুয়া আহত শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরি করে তারা এ ক্ষতিপূরণ লুট করেন বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির একজন সদস্য বলেন, এত বড় একটা ঘটনার বিচার হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার ক্ষমতায় থাকায় এসব ফ্যাসিস্ট দোসরদের বিচার হয়নি।
ডাকাতির বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছিলেন ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান। তিনি বলেছিলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের কোনো কিছুই লুট বা ছিনতাই করি নাই, আমরা যদি এমন কিছু করে থাকতাম তাহলে ওখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসহ পুলিশ বাহিনী উপস্থিত ছিল, তারা নিশ্চয় আমাদের এমন কিছু করতে দিত না। আর কারও কোনো কিছু লুট বা ছিনতাই হলে তারা থানায় অভিযোগ জানাবে, আমার জানামতে আমাদের বিরুদ্ধে কেউ থানায় এমন অভিযোগ জানাই নাই।
তৎকালীন শ.ম.র হল প্রভোস্ট ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ঐ দিন আমি ঢাকায় ছিলাম, হলে শামীমদের উপস্থিতির বিষয়ে আমি অবগত ছিলাম না। ঘটনার পরে ক্ষতিগ্রস্ত আনুমানিক ৯০/৯৫ জনকে তাদের আবেদনের সাপেক্ষে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অন্যান্য কাগজপত্র দেখে নিয়ম মেনেই সহায়তা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক শেখ মিজানুর রহমান বলেন, ঘটনার রাতে আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে আমি জানতে পেরে সেখানে উপস্থিত হই এবং জানতে পারলাম ছাত্রলীগের সুব্রত গ্রুপ বের হয়ে গেছে এবং শামীম গ্রুপ হল দখলে নিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেছিলেন, এটা ঘটেছে ছাত্র রাজনীতির অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে। আগে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে হল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে পরবর্তীতে ঐ গ্রুপ আবার হলের দখল নিতে চেয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো দোষ ছিল না। ঘটনার পরবর্তীতে একমাস আমি ছাত্রদের ফ্রি খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম ও আর্থিক ক্ষতিপূরণও দিয়েছিলাম।
এ বিষয়ে যবিপ্রবির বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত। পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন ও মামলার কাগজপত্রগুলো দেখতে হবে। সবকিছু জেনে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।