০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪২

ছুটির বিকেলে গোবিপ্রবি ক্যাম্পাসে বসে শিশুদের পাঠশালা

সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাঠশালা  © টিডিসি সম্পাদিত

শুক্রবার বিকেল। সপ্তাহজুড়ে ক্লাস, পরীক্ষা আর নানা ব্যস্ততায় মুখর থাকা গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (গোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে এদিন তুলনামূলক নীরবতা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকাটিও প্রায় ফাঁকা। তবে বিকেল গড়াতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। একে একে সেখানে আসতে শুরু করে একদল শিশু। কারও হাতে খাতা-কলম, কেউ এসেছে বন্ধুদের সঙ্গে। তাদের ঘিরে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী।

কেউ পড়াচ্ছেন বাংলা, কেউ শেখাচ্ছেন সংখ্যা। পড়ার ফাঁকে চলছে গল্প, হাসি আর খেলাধুলা। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে ব্যস্ত থাকলেও ছুটির বিকেলে তাদের পরিচয় বদলে যায় তারা হয়ে ওঠেন শিশুদের শিক্ষক, বন্ধু ও আপনজন।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কাম ফর রোড চাইল্ড (সিআরসি) এর উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় নিয়মিত চলছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের এই পাঠশালা। সংগঠনটির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে পরিচালিত হাতেখড়ি স্কুল এ শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হয়।

প্রতি শুক্রবার ও শনিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে এই পাঠশালা। বর্তমানে এখানে প্রায় ৬৫ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। তাদের পাঠদান করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ জন শিক্ষার্থী।

শুধু বই-খাতা নিয়ে পড়াশোনাতেই সীমাবদ্ধ নয় এই পাঠশালা। শিশুদের বই, খাতা, কলম, ব্যাগসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়। নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। মেধাক্রম অনুযায়ী দেওয়া হয় পুরস্কারও। শিশুদের পড়াশোনায় আগ্রহ বাড়াতে বিভিন্ন সময় খাবারের আয়োজন করা হয়।

পাঠদানের পাশাপাশি শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজনীয় সূরা, দোয়া, মাসলা-মাসায়েলসহ দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় নানা বিষয় শেখানো হয়। সংগঠনটির সদস্যদের ভাষ্য, পাঠশালায় আসার পর অনেক শিশুই এখন নিজের নাম লিখতে পারে, বাংলা বর্ণমালা ও সংখ্যা চিনতে পারে এবং প্রয়োজনীয় কিছু দোয়া বলতে পারে।

শিশু শিক্ষার্থী সুমনের কাছে এই পাঠশালা যেন আপন একটি জায়গা। তিনি বলেন, ‘ভাইয়া ও আপুরা আমাদের বড়দের সম্মান করতে, সত্য কথা বলতে এবং নিয়মিত পড়াশোনা করতে শেখান। আমি প্রতি শুক্রবার ও শনিবার এখানে পড়তে আসি। সবাই আমাদের অনেক আদর করে।’

আরেক শিক্ষার্থী রোজা জানায়, ‘এখানে এসে আমি অ, আ, ই, ঈ শিখেছি। এখন আমি নিজের নাম লিখতে পারি। আপু ও ভাইয়ারা খুব সুন্দর করে পড়ান।’

স্কুলশিক্ষার্থী জান্নাতুল মাওয়ারও বদলে গেছে অনেক কিছু। তিনি বলেন, ‘আমি আগে কিছুই পারতাম না। এখন বাংলা অক্ষর শিখেছি, দোয়া শিখেছি এবং নামাজের অনেক কিছু জানতে পেরেছি।’

শিশুদের ভালোবাসায় খুঁজে পান প্রশান্তি 
পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হালিমা ইসলাম মিফতা এবারই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সিআরসির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা তার কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ কিছু।

হালিমা বলেন, ‘আমি পড়াতে গেলে দূর থেকেই তারা যেভাবে দৌড়ে আসে, মনে হয় যেন আমি তাদের কাছে খুব মূল্যবান কেউ। কখনো এখান-সেখান থেকে ফুল কুড়িয়ে এনে আমার হিজাবের পিনে গুঁজে দেয়। এই ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো আমাকে এমন এক প্রশান্তি দেয়, যা অন্য কোথাও কখনো পাইনি। শিশুদের জন্য কিছু করতে গিয়ে আমিও ভালোবাসা ও মানবিকতার অনেক কিছু শিখছি। আমি চাই, প্রতিটি শিশু শিক্ষা, ভালোবাসা ও অধিকার নিয়ে বেড়ে উঠুক এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাক।’

সংগঠন থেকে হয়ে ওঠে ভালোবাসার জায়গা 
সিআরসির সভাপতি রিফাতুল ইসলাম রিফাতের কাছেও সংগঠনটি এখন শুধু একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নাম নয়; বরং জীবনের একটি অংশ।

তিনি বলেন, ‘কিছু সংগঠন শুধু সংগঠন হয়ে থাকে না, ধীরে ধীরে জীবনের একটি অংশ হয়ে যায়। আমার কাছে সিআরসি ঠিক তেমনই। শুরুতে এটিকে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে দেখেছিলাম। সময়ের সঙ্গে এখানে পেয়েছি একদল মানুষ, যাদের সঙ্গে কাজ করতে করতে সম্পর্কটা দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে।’

রিফাতুল ইসলাম বলেন, ‘সিআরসি আমাকে শিখিয়েছে, ছোট ছোট ভালো কাজও কারও জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে মূল্যবান হয়ে থাকবে সিআরসির শিশুদের সঙ্গে কাটানো সময়, তাদের হাসি ও ছোট ছোট স্বপ্ন।’

পাঠশালার বাইরেও নানা উদ্যোগ 
শিশুদের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের আনন্দ ও প্রয়োজনের কথাও বিবেচনায় নেয় সংগঠনটি। ঈদে নতুন পোশাক দেওয়া, রমজানে ইফতার, জাতীয় ও বিশেষ দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন আয়োজনের পাশাপাশি মেডিকেল ক্যাম্প এবং বৃদ্ধাশ্রমে কার্যক্রম পরিচালনা করেন সংগঠনের সদস্যরা।

সিআরসির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য কাজ করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। শিক্ষার আলো প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। মানবিক সমাজ গঠনে সবার অংশগ্রহণ জরুরি।’

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দাও সংগঠনটির কার্যক্রমকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই শিশুদের পড়াচ্ছেন। এতে শিশুদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে এবং শিক্ষার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।

যেভাবে শুরু 
২০১৮ সালের ৩ মার্চ গোবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে সিআরসির যাত্রা শুরু হয়। পরে ২০১৯ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এরপর থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি।

শুক্রবার বিকেল হলে আবারও শহীদ মিনার এলাকায় বসবে সেই পাঠশালা। শিশুরা আসবে খাতা-কলম হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আসবেন তাদের পড়াতে। কেউ শেখাবে বর্ণমালা, কেউ সংখ্যা; কেউ হয়তো পড়ার ফাঁকে শুনবে কোনো শিশুর ছোট্ট গল্প।

ক্লাস শেষে কেউ খেলবে, কেউ গল্প করবে। তারপর সন্ধ্যা নামলে যে যার মতো ফিরে যাবে। কিন্তু ছুটির দিনের এই কয়েক ঘণ্টা হয়তো শিশুদের কাছে হয়ে থাকবে পুরো সপ্তাহের অপেক্ষার সময় আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে, ভালোবাসা ও মানবিকতার পাঠ নেওয়ার এক বিশেষ বিকেল।