২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৬

পিএইচডি করতে অক্সফোর্ডে যাচ্ছেন মাভাবিপ্রবির শিক্ষার্থী 

বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী মোহাম্মদ উজ্জ্বল  © টিডিসি ফটো

মানিকগঞ্জের বেংরোয়া গ্রামের মেঠোপথ থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর পথচলা। সেই পথ পেরিয়ে বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী মোহাম্মদ উজ্জ্বল হোসেন এবার পাড়ি জমাচ্ছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী স্যার পিটার জে. র‍্যাটক্লিফের গবেষণাগারে পিএইচডি করার সুযোগসহ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণার প্রস্তাব পেয়েও তিনি বেছে নিয়েছেন অক্সফোর্ডকে। কারণ, তাঁর গবেষণার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে জীববিজ্ঞানের জটিল সমস্যার সমাধান করা।

উজ্জ্বলের অক্সফোর্ডের পিএইচডি বা ডি.ফিল গবেষণার বিষয় হবে জীবাণুর জিনোমিক্স, ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তন এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অর্থাৎ জীবাণুরোধী ওষুধের বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে কাজ করবেন তিনি। এসব জটিল জীববৈজ্ঞানিক সমস্যা বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গভীর শিক্ষণপ্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করবেন তিনি।

গবেষণাটি অক্সফোর্ডের প্রায় ২০০ কোটি টাকা সমমূল্যের একটি বৃহৎ গবেষণা প্রকল্পের অংশ। এতে তিনটি মহাদেশের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক গবেষণা হবে বলে জানা গেছে।

গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক গবেষণার অঙ্গনে
উজ্জ্বল হোসেনের শিক্ষাজীবনের শুরু মানিকগঞ্জের বেংরোয়া গ্রামে। পরে পাকুটিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে পড়াশোনা শেষে ভর্তি হন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও দিকনির্দেশনায় গবেষণার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহ তাঁকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণার পরিসরে নিয়ে যায়।

বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির (এনআইবি) বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন উজ্জ্বল। জিনোম বিশ্লেষণ, ব্যাকটেরিয়াল জিনোমিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণাপদ্ধতি দেশের সরকারি গবেষণা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার কাজেও সক্রিয় তিনি।

বাংলাদেশে বায়োইনফরমেটিক্স তুলনামূলকভাবে নতুন একটি গবেষণাক্ষেত্র। সরকারি পর্যায়ে এ বিষয়ে গবেষণা শুরু ও এর বিকাশে উজ্জ্বলের ভূমিকা রয়েছে।

অক্সফোর্ডে এর আগেও গবেষণা
উজ্জ্বলের জন্য অক্সফোর্ড একেবারে নতুন কোনো জায়গা নয়। পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ২০২২ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

তাঁর থিসিস গবেষণা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েলকাম সেন্টার ফর হিউম্যান জেনেটিকসে। সেখানে অধ্যাপক মিলোসেভিচের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করেন তিনি। তাঁর গবেষণা-সংশ্লিষ্ট দুই সুপারভাইজরের একজন ছিলেন নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। সেই আন্তর্জাতিক গবেষণার পরিবেশ তাঁর ভবিষ্যৎ গবেষণার লক্ষ্যকে আরও বিস্তৃত করে।

দেশে বায়োইনফরমেটিক্সের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা
আন্তর্জাতিক গবেষণার পাশাপাশি দেশে বায়োইনফরমেটিক্সের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও কাজ করেছেন উজ্জ্বল। ২০২০ সালে তিনি প্রকাশ করেন ‘গবেষণায় বায়োইনফরমেটিক্স’ বইটি। বাংলা ভাষায় বায়োইনফরমেটিক্স বিষয়ে প্রকাশিত প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি হিসেবে এটি পরিচিত।

তাঁর কাছ থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী বায়োইনফরমেটিক্স, আর প্রোগ্রামিং ও পাইথন প্রোগ্রামিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও বিভিন্ন পেশাজীবীসহ কয়েকশ মানুষও তাঁর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

দেশে বায়োইনফরমেটিক্সের নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ভূমিকা রেখেছে।

আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও স্বীকৃতি
গবেষণার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সম্মেলনেও অংশ নিয়েছেন উজ্জ্বল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও হংকংয়ে গবেষণা উপস্থাপন এবং বৈজ্ঞানিক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন তিনি। পেয়েছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কারও।

এ ছাড়া কর্মস্থল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজির বিজ্ঞানীদের ভোটে জাতীয় শুদ্ধাচার পুরস্কারও অর্জন করেছেন তিনি।

একাধিক সুযোগের মধ্যে অক্সফোর্ড
পিএইচডির জন্য অক্সফোর্ডে যাওয়ার আগে উজ্জ্বলের সামনে ছিল একাধিক সুযোগ। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের একটি আইভি লিগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি গবেষণার প্রস্তাব পেয়েছিলেন।

তবে গবেষণার পরিবেশ, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং নিজের গবেষণার লক্ষ্য বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত অক্সফোর্ডকেই বেছে নেন তিনি।

এরপরও তাঁর সামনে ছিল আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত—নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীর গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ নাকি নিজের পছন্দের গবেষণাক্ষেত্র।

নোবেলজয়ীর ল্যাবে সুযোগ, তবু অন্য পথ
২০১৯ সালে অক্সিজেন সংবেদনের আণবিক প্রক্রিয়া আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পাওয়া অধ্যাপক স্যার পিটার জে. র‍্যাটক্লিফের গবেষণাগার থেকে পিএইচডির জন্য সবুজ সংকেত পেয়েছিলেন উজ্জ্বল।

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর গবেষণাগারে কাজ করার সুযোগ যে কোনো তরুণ গবেষকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু উজ্জ্বলের নিজের গবেষণার আগ্রহ ছিল অন্য জায়গায়।

পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার পাশাপাশি জীববিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতের জীববিজ্ঞান ও জীবপ্রযুক্তি গবেষণায় এসব প্রযুক্তি বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

দীর্ঘ চিন্তাভাবনার পর তাই নিজের আগ্রহ ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার লক্ষ্যকেই অগ্রাধিকার দেন তিনি।

জীবাণুর জিনোম ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স নিয়ে গবেষণা
অক্সফোর্ডে উজ্জ্বলের গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র হবে জীবাণুর জিনোমিক্স, ব্যাকটেরিয়ার বিবর্তন এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। এসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গভীর শিক্ষণপ্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে কাজ করবেন তিনি।

তাঁর গবেষণাটি অক্সফোর্ডের প্রায় ২০০ কোটি টাকা সমমূল্যের একটি বড় গবেষণা প্রকল্পের অংশ। এতে তিনটি মহাদেশের গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতামূলক গবেষণা পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে।

লক্ষ্য শুধু নিজের গবেষণা নয়
অক্সফোর্ডে পিএইচডি শেষ করাই উজ্জ্বলের শেষ লক্ষ্য নয়। গবেষণা শেষে দেশে ফিরে জাতীয় পর্যায়ে জিনোমিক তথ্য-অবকাঠামো গড়ে তুলতে চান তিনি। একই সঙ্গে সরকারি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বায়োইনফরমেটিক্সের ব্যবহার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যও রয়েছে তাঁর।

নিজের গবেষণার পথ বেছে নেওয়ার বিষয়ে উজ্জ্বল হোসেন বলেন, ‘নোবেলজয়ীর গবেষণাগারে সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। তবে তাঁর বিশ্বাস, যে গবেষণাক্ষেত্রের প্রতি মানুষের গভীর আগ্রহ থাকে, সেই ক্ষেত্রেই সে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের গবেষণাকে এগিয়ে নিতে চান না; বাংলাদেশের বায়োইনফরমেটিক্সের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বিশ্বমানের গবেষণার জন্য প্রস্তুত করতে চান।’

মানিকগঞ্জের বেংরোয়া গ্রামের শিক্ষাজীবন থেকে অক্সফোর্ডের গবেষণাগার—উজ্জ্বল হোসেনের পথচলায় এবার যুক্ত হচ্ছে নতুন অধ্যায়। আন্তর্জাতিক গবেষণার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশে ফিরে জীববিজ্ঞান, জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স গবেষণাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নিয়েই শুরু হচ্ছে তাঁর নতুন যাত্রা।