মর্টার তৈরির প্রতিযোগিতায় বিশ্বমঞ্চে ‘টিম চুয়েট সি’
সিমেন্ট, বালু, পানি, অ্যাডমিক্সচার ও সম্পূরক সিমেন্টীয় উপাদান নির্দিষ্ট অনুপাতে মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে মর্টার। তবে চ্যালেঞ্জ শুধু একটি মর্টার তৈরি করা নয়, সেটিকে হতে হবে একই সঙ্গে প্রবাহক্ষম, স্থিতিশীল, পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী। এই কঠিন সমন্বয়ের লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের একদল শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ‘টিম চুয়েট সি’।
লক্ষ্য শুধু একটি কার্যকর মর্টার তৈরি করা নয়। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে নিজেদের সক্ষমতার জানান দেওয়া এবং বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দলটি।
এই স্বপ্ন পূরণের মঞ্চ আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) কতৃক আয়োজিত ‘এসিআই মর্টার ওয়ার্কেবিলিটি কম্পিটিশন ২০২৬’। আগামী ১১ থেকে ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের আটলান্টার হিলটন হোটেলে অনুষ্ঠিত হবে এ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা।
বিশ্বের সেরা ৪০-এ চুয়েট
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে প্রথমে পার হতে হয়েছে কঠিন বাছাইপর্ব। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান থেকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জমা দেওয়া প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করে নির্বাচিত হয়েছে বিশ্বের সেরা ৪০টি দল। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে চুয়েটের ‘টিম চুয়েট সি’।
দলটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার- চুয়েটের অনুষদ উপদেষ্টা ও চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক জি এম সাদিকুল ইসলাম। দলের সদস্যরা হলেন খন্দকার ফাহাদ আলম, সুমাইয়া বিনতে মান্নান, তানজিম মোশাররাত হোসেন, স্বরূপ চন্দ্র মোদক, সানিউল হক, রূপম পোদ্দার, মো. সাইজউদ্দিন ফরহাদ এবং এস এম আমীর হামজা মাহমুদ মাহাদী।
তবে প্রতিযোগিতার মূল পর্বে দলের প্রতিনিধিত্ব করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন চারজন সদস্য—খন্দকার ফাহাদ আলম, সুমাইয়া বিনতে মান্নান, তানজিম মোশাররাত হোসেন ও স্বরূপ চন্দ্র মোদক। সেখানে তারা সরাসরি বিচারকদের সামনে উপস্থাপন করবেন নিজেদের গবেষণার ধারণা, ব্যবহৃত উপকরণ ও প্রস্তুতকৃত মর্টার।
নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে স্বরূপ চন্দ্র মোদক বলেন, ‘একাডেমিক পড়াশোনার চাপের পাশাপাশি নিয়মিত ল্যাবরেটরিতে সময় দেওয়া, একের পর এক পরীক্ষামূলক মিশ্রণ তৈরি করা এবং বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করতে গিয়ে অনেক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তবে যখন জানতে পারলাম আমাদের দল বিশ্বের সেরা ৪০টি দলের মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা প্রক্রিয়ার মতো জটিল ধাপগুলোও সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছি, তখন সব পরিশ্রমই সার্থক মনে হয়েছে। এখন যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ভালো কিছু করার এবং দেশের জন্য সম্মান বয়ে আনার আশা করছি।’
দলটির উপদেষ্টা জি এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৮ সালে এসিআই স্টুডেন্ট চ্যাপ্টার, চুয়েট প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছয়টি পুরস্কার অর্জন করেছে, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। তবে এসব সাফল্যই ছিল অনলাইনভিত্তিক প্রতিযোগিতায়। এবার আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত যে, আমাদের দল সরাসরি অংশগ্রহণের জন্য আটলান্টায় যাচ্ছে। আমরা আশা করি, অনলাইনভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোতে তারা যেমন সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, এবারও সরাসরি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তারা ভালো সাফল্য অর্জন করতে পারবে।’
ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা
প্রতিযোগিতায় মর্টারের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য মূল্যায়ন করা হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে প্রবাহক্ষমতা ও স্থিতিশীলতার ওপর। মূল্যায়নে মোট নম্বরের ৫০ শতাংশ বরাদ্দ প্রবাহক্ষমতার জন্য এবং ২০ শতাংশ স্থিতিশীলতার জন্য। এ ছাড়া কার্বন নিঃসরণের পরিমাণের জন্য ১০ শতাংশ, অর্থনৈতিক সাশ্রয়িতার জন্য ৫ শতাংশ এবং বাকি ১৫ শতাংশ নির্ধারিত হবে প্রতিবেদনের মানের ভিত্তিতে।
দলের সদস্যরা জানান, প্রবাহক্ষমতা ও স্থিতিশীলতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরি করাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মর্টারকে বেশি প্রবাহক্ষম করতে গেলে অনেক সময় এর স্থিতিশীলতা কমে যায়, আবার স্থিতিশীলতা বাড়াতে গিয়ে প্রবাহক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। তাই একটি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অন্যটির আপস না করে সর্বোত্তম সমন্বয় খুঁজে বের করাই ছিল মূল কাজ এই সমন্বয় খুঁজতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগারে চলেছে একের পর এক পরীক্ষামূলক মিশ্রণ। পরিবর্তন করা হয়েছে মিশ্রণের বিভিন্ন অনুপাত এবং পরীক্ষা করা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের অ্যাডমিক্সচার। প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে ধাপে ধাপে এগিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
পরিবেশগত প্রভাব কমাতে এবং মর্টারকে আরও ব্যয়সাশ্রয়ী করতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে সম্পূরক সিমেন্টীয় উপাদান ব্যবহারের ওপরও। অর্থাৎ কেবল কার্যকারিতার দিক থেকে নয়, পরিবেশ ও খরচ এই উভয় দিক বিবেচনায় নিয়েই তৈরি হয়েছে চূড়ান্ত মিশ্রণ।
কীভাবে যাচাই হবে মর্টার
প্রতিযোগিতার মূল পর্বে প্রবাহক্ষমতা যাচাই করা হবে এসিআই নির্ধারিত একটি বিশেষ ছাঁচের মাধ্যমে। মর্টার সেই ছাঁচ কত দ্রুত পূরণ করতে পারে, তার ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হবে এর প্রবাহক্ষমতা।
অন্যদিকে স্থিতিশীলতা যাচাইয়ে দেখা হবে তলানি জমা ও উপাদান পৃথকীকরণ। নির্দিষ্ট পরিমাণ মর্টার একটি পরিমাপক চোঙে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হবে মিশ্রণের উপাদানগুলো কতটা আলাদা হয়ে যায়। পৃথকীকরণ যত কম হবে, মর্টার তত বেশি স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হবে।
উল্লেখ্য, আমেরিকান কংক্রিট ইনস্টিটিউট (এসিআই) একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।যা কংক্রিট নির্মাণ ও ব্যবহারে বৈশ্বিক মানদণ্ড, কোড ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান তৈরি ও প্রচার করে থাকে। বর্তমানে বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশে ৩৫ হাজারের বেশি সদস্য নিয়ে কাজ করছে সংস্থাটি, যার সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগানে অবস্থিত।